আলজাজিরার কলাম/মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমানা পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল মার্কিন কংগ্রেসে কোন দলের কতটি আসন থাকবে বা কার রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, তা নির্ধারণের সাধারণ ক্ষমতার লড়াই নয়। বরং এই নির্বাচন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমানা, যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের এক ঐতিহাসিক ও চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আল জাজিরায় প্রকাশিত ওয়াশিংটনভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাইদ আরিকাতের নিবন্ধের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই নির্বাচনের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে মার্কিন সংবিধানের মৌলিক নীতি 'নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য' ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণের মধ্যে।
নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক চাপ ও হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ এবং সরকারি নেতৃত্বের জনগণের রায়কে শ্রদ্ধা জানানোর মানসিকতাই এই নির্বাচনের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
আইনি লড়াই ও বিচার বিভাগের প্রতিরোধ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসন দেশের নির্বাচন পরিচালনা পদ্ধতি ও ভোটাধিকার সংক্রান্ত বিধিবিধানকে নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার অনুকূলে পুনর্গঠন করার ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়েছে। তবে প্রশাসনিক এই পদক্ষেপগুলোকে বিচার বিভাগের তরফ থেকে অভূতপূর্ব আইনি প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
'ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিস'-এর প্রকাশিত পর্যালোচনার তথ্য থেকে জানা যায়, অন্তত ৩৪টি ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত নির্বাচনী সিদ্ধান্ত এবং ভোটারদের ব্যক্তিগত ও নিবন্ধনের তথ্য হস্তান্তরের দাবিকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বাতিল ঘোষণা করেছে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসব সিদ্ধান্ত বাতিলের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের প্রেসিডেন্টের আমলে নিযুক্ত বিচারকগণ যুক্ত ছিলেন, যার মধ্যে স্বয়ং ট্রাম্পের মেয়াদে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিচারকদের এই স্বাধীন ও দলীয় স্বার্থহীন অবস্থান প্রমাণ করে যে মার্কিন সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষায় বিচার বিভাগ এখনও এক শক্তিশালী সুরক্ষা প্রাচীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।
তবে এই বিচারিক ব্যবস্থার মধ্যে একটি দৃশ্যমান দুর্বলতাও রয়ে গেছে; বিচার বিভাগ সাধারণত প্রশাসন কর্তৃক কোনো ক্ষতিকর নীতি কার্যকর হওয়ার পরই হস্তক্ষেপ করে, যা নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে রাজ্যগুলোর প্রশাসন ও সাধারণ কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম আইনি অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
উদাহরণস্বরূপ, ক্যালিফোর্নিয়ায় অ-নাগরিক ভোটারের অভিযোগে আনুমানিক ২০,০০০ নিবন্ধিত ভোটারের ব্যালট আলাদা রাখার জন্য বিচার বিভাগের আবেদন আপিল আদালত খারিজ করে দিলেও মূল বিরোধটি অমীমাংসিত থেকে যায়।
গবেষকদের মতে, নির্বাচনী সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হলেও কোনো শক্ত প্রমাণ ছাড়া জালিয়াতির বানোয়াট অভিযোগ তুলে সাধারণ বৈধ নাগরিকদের ভোটাধিকার সংকুচিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের গভীর আস্থা বিনষ্ট করে।
কংগ্রেসের তদারকি ও সাংবিধানিক ভারসাম্য
বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট উভয় কক্ষেই শাসক দল রিপাবলিকানদের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সামান্য ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিদ্যমান। ফলে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ অর্জনের জোরালো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
যদি ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পায়, তবে রাষ্ট্রপতির একচ্ছত্র নির্বাহী ক্ষমতার ওপর বিরোধীদের আইনি তদন্ত ও তদারকির শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত সীমান্ত নীতি, অভিবাসন আইন বলবৎকরণ, নির্বাচনী বিধিবিধান এবং বিভিন্ন নির্বাহী আদেশের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখতে পারবে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের তলব করে সমন জারি করার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারলে রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন শীর্ষ সরকারি পদ ও বিচারক নিয়োগ আটকানো বা প্রভাবিত করার বড় সুযোগ তৈরি হবে। যদিও রাষ্ট্রপতির নিজস্ব ভেটো ক্ষমতা ও বিস্তৃত নির্বাহী কর্তৃত্বের কারণে কেবল কংগ্রেসের জয়ই ট্রাম্পের নীতিগুলোকে রাতারাতি উল্টে দিতে পারবে না, তবুও এই নির্বাচন প্রশ্ন তুলবে; আইনপ্রণেতারা দলীয় অন্ধ আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীন সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করবেন, নাকি দলীয় স্বার্থকে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ওপরে স্থান দেবেন।
ভোট-পরবর্তী সংঘাত ও গণতান্ত্রিক ঝুঁকি
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর গণনার পর্যায় থেকেই মার্কিন রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক আইনি ও রাজনৈতিক সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে। ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফলাফল গ্রহণে অস্বীকৃতি, জালিয়াতির ভিত্তিহীন অভিযোগ এবং জর্জিয়ার কর্মকর্তাদের ওপর ভোট 'খুঁজে' বের করার অনৈতিক চাপ মার্কিন ইতিহাসে এক বিতর্কিত নজির সৃষ্টি করেছিল, যার চূড়ান্ত করুণ পরিণতি হিসেবে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিল আক্রমণের ঘটনা ঘটে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে হয়তো সরাসরি এক দিনে বড় কোনো একক বিস্ফোরণ ঘটবে না; বরং ধাপে ধাপে সংঘটিত ধারাবাহিক প্রশাসনিক জটিলতা, ভোট গণনার আইনি বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা, নির্বাচন কর্মীদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগ এবং সাধারণ ভুলগুলোকে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিচারালয়ে আইনসম্মত চ্যালেঞ্জ জানানোর অধিকার প্রতিটি প্রার্থীর রয়েছে, তবে বিচারিক পরীক্ষা আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য বজায় রাখা অপরিহার্য।
বিচার বিভাগের সীমাবদ্ধতা ও ঐতিহাসিক রায়
বিগত কয়েকটি রায়ে বিচার বিভাগ সাংবিধানিক রক্ষাকবচ হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখলেও একা বিচার বিভাগ গোটা দেশের গণতন্ত্র রক্ষা করতে সক্ষম নয়। দেশের হাজার হাজার কাউন্টিতে সরাসরি ভোট পরিচালনা বা রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আদালতের নেই। একটি সচল ও সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন কংগ্রেসের তদারকি, নির্বাচন পরিচালকদের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক নেতাদের পরাজয় মেনে নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা।
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত ব্যালট কেবল কংগ্রেসের গাণিতিক আসনের হিসাব ঠিক করবে না, বরং বিশ্ববাসীকে দেখাবে মার্কিন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মূল নীতি ধরে রাখতে প্রস্তুত কি না। এই নির্বাচনের চূড়ান্ত বার্তা হলো; আমেরিকায় কোনো প্রেসিডেন্টই আইনের ঊর্ধ্বে নন, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার একক মালিক নয় এবং রাষ্ট্রের যেকোনো ক্ষমতার অনুশীলনই জবাবদিহিতার আওতাধীন।
লেখক সাঈদ আরিকাত ওয়াশিংটন-ভিত্তিক একজন সাংবাদিক।
