গার্ডিয়ানের কলাম/আমি স্বাধীনতা উপভোগ করছি, তারা আফগানিস্তানে ‘বন্দি’

আমার জন্মভূমি থেকে আসা গল্পের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আগে আমি ইনস্টাগ্রাম খুললেই দেখতাম আমার কাজিনরা ট্রেন্ডিং ভিডিওতে লিপ-সিঙ্ক করছে, গোলাপ বাগানে বা কোনো ক্যাফেতে পোজ দিচ্ছে; তারা তাদের জীবনের রেকর্ড রাখত।
আমি ব্রিটিশ-আফগান বন্ধুদের কাছে তাদের পূর্বপুরুষদের শহর ভ্রমণের গল্প এবং নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার আগ্রহ দেখতাম। আমি আফগানিস্তানের পপ তারকাদের নতুন মিউজিক ভিডিওর অপেক্ষায় থাকতাম, যা বিশ্বের সব বিয়েবাড়িতে বাজত। তখন আফগানিস্তান, তার সংস্কৃতি এবং মানুষকে কাছের মনে হতো।
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট রোববার রাতারাতি আফগানিস্তান ‘বিধ্বস্ত এবং পরিত্যক্ত’ হয়। আমি অবশিষ্ট মাস ফোনের দিকে তাকিয়ে কাটিয়েছি এবং প্রতিদিন তৈরি হওয়া হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলো পর্যবেক্ষণ করেছি, যেখানে মানুষ তথ্য ও সাহায্য চাইছিল এবং তাদের দেশ থেকে বের করে আনার জন্য আমার কাছে মিনতি করছিল, কারণ আমরা সবাই জানতাম কী আসতে চলেছে।
আমি কাবুল থেকে একজন বন্ধুকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী ছিলাম; তিনি একজন প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন এবং আমি যখনই আফগানিস্তানে যেতাম, সবার আগে তার বাড়িতে যেতাম। তার সঙ্গে আমাকে অত্যন্ত কঠিন ফোনালাপ করতে হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, ‘তুমি তোমার সন্তানদের বা স্বামীকে সঙ্গে আনতে পারবে না। আমি শুধু তোমার জন্য এটি করতে পারি।’
তিনি রাজি হতেন। আমি তাকে জানিয়েছিলাম যে তাকে আলবেনিয়া বা কাতারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও হয়তো বছরের পর বছর শরণার্থী শিবিরে থাকতে হবে এবং তিনি তাতেও রাজি হয়েছিলেন। তাকে বের করে আনার সবচেয়ে কাছাকাছি সুযোগ এসেছিল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন আমি তার জন্য একটি পাসপোর্টের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলাম, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তালেবানরা বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ শুরু করায় এবং দেশত্যাগে কড়াকড়ি আরোপ করায় তাকে আর বের করে আনা সম্ভব হয়নি।
আমাদের শেষ ফোনালাপটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম কঠিন মুহূর্ত; যে নারী সারাজীবন শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার কথা বলেছেন, তাকে আমাকে বলতে হয়েছিল, আমি তাকে উদ্ধারের চেষ্টা বন্ধ করতে যাচ্ছি। আমি অনুভব করলাম তার ‘মনোবল ভেঙে পড়ল’ যখন তার ভবিষ্যত তালিবান শাসনের কঠিন বাস্তবতায় বন্দি হয়ে গেল। তিনি অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে আমাকে বললেন যে, এটি তার ডায়াবেটিসের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে এবং তিনি আর কখনও কাজ করতে বা স্বাবলম্বী হতে পারবেন না। তারপর তিনি আমাকে একটি ভয়াবহ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এই জীবন চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে এখন মৃত্যুই কি শ্রেয় নয়?’
এটি ছিল আমার বন্ধুর জীবনে দ্বিতীয়বার তালেবান শাসনের অধীনে বাস করার অভিজ্ঞতা। আমাদের উভয়ের মধ্যে এক যন্ত্রণাদায়ক নীরবতা ছিল কারণ আমরা এক ধরণের ‘অসহায়ত্ব’ অনুভব করছিলাম যার সঙ্গে লাখ লাখ আফগান পরিচিত হতে যাচ্ছিলেন। তারপর থেকে আমাদের জীবন দুটি আলাদা জগতের মতো হয়ে গেছে। আমার জীবন কাজ, উৎসব আর ভ্রমণে ভরা, আর তার জীবন বোমা, ‘নৈতিকতা পুলিশ’ আর খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ। একে অপরের কষ্টের কথা ভেবে আমরা এখন নিজেদের জীবনের গল্প শেয়ার করতেও দ্বিধা বোধ করি।
তালেবান শাসনের অধীনে আফগানিস্তান ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে জীবন তাৎক্ষণিকভাবে বদলে গেছে। নারীদের ওপর এই পদ্ধতিগত আক্রমণের ফলে জাতিসংঘ ‘লিঙ্গ বৈষম্যমূলক বর্ণবাদ’-কে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়েছে। পশ্চিমারা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় যার বয়স ১৪ ছিল, এমন এক বন্ধু বলে, তার মা তাকে শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার বাবা তালিবানের নিয়মের সঙ্গে একমত এবং চান মেয়েটি যেন স্বামীর ওপর নির্ভরশীল হয়। মেয়েটির কাছে এটি নিজেকে ‘বিক্রি করে দেওয়ার মতো’ মনে হয় যা সে মেনে নিতে পারছে না।
আফগানিস্তানে কেবল লিঙ্গ যুদ্ধই চলছে না; ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান তার প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ ঘোষণা করে বিমান হামলা চালায়। এতে শত শত মানুষকে নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। এক কাজিন আমাকে কাবুলের নাগরিকদের ওপর এই বিমান হামলার চরম ভয়ের কথা বলেছিলেন, যেখানে তারা কেবল বিস্ফোরণের শব্দ আর আগুনের শিখা দেখছিলেন এবং প্রতি মুহূর্তে রকেট হামলার আতঙ্কে ছিলেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান ও পাকিস্তান থেকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো ৬০ লাখ শরণার্থী। আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে তালেবানের রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও জনসংখ্যার অর্ধেক চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হওয়া। মনে হচ্ছে আমার জন্মভূমির ক্ষেত্রে এমনকি ঈশ্বরও নির্দয়। আগে আফগানিস্তানে বীরত্বের গল্প, গণতন্ত্রের লড়াই বা শিল্পের চর্চা শোনা যেত, কিন্তু এখন সেখানে মানুষের জীবনে কেবল ‘দমবন্ধ’ অনুভূতি আর কষ্ট ছাড়া আর কিছু নেই।
তবে তালেবানরা চিরস্থায়ী নয়, তারা তাদের ইতিহাসে পশ্চিমা বাহিনীর উপস্থিতির অর্ধেক সময়ও ক্ষমতায় ছিল না। আফগানদের অবশ্যই তাদের গল্পগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হবে যাতে ভবিষ্যতে তারা নিজেদের পরিচয় আবার গড়ে তুলতে পারে। আমার জন্য এর অর্থ হলো একদিন সেই বন্ধুকে ফোন করে তার জীবন সম্পর্কে জানা এবং পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সেই ‘অসম্ভব কথোপকথনটি’ করা।
লেখক পরিচিতি
নিলুফার হেদায়াত একজন আফগান-ব্রিটিশ সাংবাদিক। ‘ইন রিয়েল লাইফ: দ্য গড থিভস’ প্রামাণ্যচিত্রের উপস্থাপক ও সহ-পরিচালক।




