গার্ডিয়ানের কলাম / ইউরোপের ডানপন্থি থিংকট্যাংকগুলোতে কোটি কোটি ডলার পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

‘দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আগে খুব কমই দেখা গেছে’; ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে এই কথাটি লিখেছিলেন। তিনি অবশ্য নিজের প্রশাসনের কথা বলছিলেন না, বলেছিলেন ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের (ইউএসএআইডি) কথা। এরপরই প্রেসিডেন্ট লিখেছিলেন, ‘এটা বন্ধ করে দাও!’
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই (ইউএসএআইডি) কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অধিকাংশ কর্মীকে অনির্দিষ্টকালের প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়। এটাকে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
ইউএসএআইডি, ট্রাম্প প্রশাসন ও ডানপন্থি গণমাধ্যমের তোষামোদকারীরা যুক্তি দিয়েছিল, সংস্থাটি করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থ বিদেশে অর্থহীন প্রকল্পে অপচয় করছে। অথচ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিতে সেই অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে না।
ইউএসএআইডি বন্ধ করার আগে ফক্স নিউজসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কোনো প্রমাণ ছাড়াই একটি নির্লজ্জ মিথ্যা বারবার প্রচার করা হয়েছিল। তা হলো গাজায় নাকি কোটি কোটি ডলারের কনডম পাঠাতে অর্থ ব্যয় করছে।
এখন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির নামে যখন মানবিক সহায়তা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন কি করদাতাদের অর্থ দেশের ভেতরেই থাকছে?
বিপুল পরিমাণ অর্থ এখনও বিদেশে যাচ্ছে। তবে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষদের সহায়তা করার বদলে সেই অর্থ যাচ্ছে ইউরোপজুড়ে এমন সব থিংকট্যাংকের কাছে, যেগুলো প্রতিষ্ঠা করেছেন কোটিপতি ব্যক্তিরা এবং যাদের লক্ষ্য ট্রাম্পবাদকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া।
গত মাসে গার্ডিয়ান জানিয়েছিল, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর যুক্তরাজ্যের রক্ষণশীল সংগঠনগুলোকে ১২ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সমালোচকেরা এটিকে বিদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এর মধ্যে ৭ মিলিয়ন ডলার যাচ্ছে ‘৮৭৮’ নামের একটি সংগঠনের কাছে। এর সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হলেন সাবেক কনজারভেটিভ মন্ত্রী ও বর্তমানে টেলিভিশন উপস্থাপক জ্যাকব রিস-মগ। যার সম্পদের পরিমাণ ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। সংগঠনটি মার্চে যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত হয়েছে বলে মনে হয়।
তাদের ওয়েবসাইটে নিজেদেরকে ‘যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সভ্যতাগত অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করা একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ ও আমেরিকান থিংকট্যাংক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
লক্ষ্য যদি এতটাই অস্পষ্ট হয়, আর তার সঙ্গে যদি নতুন একটি সংগঠনে কয়েক মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন জড়িত থাকে, তাহলে বিষয়টি অদ্ভুত শোনাটাই স্বাভাবিক। কারণ বিষয়টি সত্যিই অদ্ভুত।
একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা গার্ডিয়ান-কে বলেছেন, স্বাভাবিক অর্থায়ন প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলোর কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
ইউরোপের বিভিন্ন সংগঠনকে আরও কয়েক মিলিয়ন ডলারের অনুদান দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে। এসব অর্থ দিয়ে এমন প্রকল্প নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা ইউরোপে ‘সভ্যতাগত আত্মবিশ্বাস’ তৈরি করবে এবং ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অভিবাসন, সেন্সরশিপ ও আইনি হয়রানি সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ’ মোকাবিলা করবে, সবকিছু ‘আমাদের অভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন, আইন ও পশ্চিমা ঐতিহ্যের’ সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।
এসব কথাবার্তা যদি অস্পষ্ট মনে হয়, তার কারণ সেটাই উদ্দেশ্য।
উদার গণতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করা জুসান্না ভেগ বলেছেন, এই অর্থায়নের আহ্বান প্রকাশের আগে দীর্ঘদিন ধরে সমমনা ইউরোপীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে সম্ভাব্য অর্থগ্রহীতাদের একটি তালিকাও ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে।
অর্থাৎ, এটি অনেকটা আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মতো।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মার্জ এসব অনুদানের পর জার্মানির নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন। আমার ধারণা, ট্রাম্প নিশ্চয়ই কথাটি খুব গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছেন!
লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসও এমন ‘জনশিক্ষা’ কর্মসূচির জন্য ৫ লাখ ডলার পর্যন্ত অনুদান দিচ্ছে, যেসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘অভিন্ন সভ্যতাগত মূল্যবোধ’ নিয়ে একটি ‘জাতীয় আলোচনা’ তৈরি করা।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে চলে যাওয়া এক কর্মকর্তা গার্ডিয়ানকে বলেছেন, এর উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে ‘এমএজিএ প্রচারণাকে সমর্থন করার জন্য যুক্তরাজ্য থেকে উৎপন্ন বয়ান তৈরি করা’।
এদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাট এমপি লিসা স্মার্ট ট্রাম্পের এমএজিএ অর্থকে ‘আমাদের গণতন্ত্রে হস্তক্ষেপ’ বলে অভিযুক্ত করেছেন।
সাধারণ ট্রাম্প সমর্থকরা এসব সম্পর্কে কী ভাবছেন?
যে গড়পড়তা ট্রাম্প ভোটারকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তিনি ব্রিটেনের ‘জনশিক্ষা’ কর্মসূচিতে করদাতাদের অর্থ পাঠানো যে অর্থ দিয়ে দেশের ভেতরের অনুদান-সংকটে থাকা সরকারি স্কুলগুলোকে সাহায্য করা যেত এসব সম্পর্কে কী ভাবছেন?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: তারা এসব নিয়ে ভাবছেনই না।
আমি মোটামুটি নিশ্চিত, ফক্স নিউজ এর একজনও অন্ধ ভক্ত এই অনুদানগুলোর কথা জানেন না। তারা বরং অ্যান্থনি ফাউচি কিংবা খেলাধুলায় ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিয়ে উত্তেজিত হয়ে ব্যস্ত।
ট্রাম্প কেন মুক্ত গণমাধ্যমকে দুর্বল করার পেছনে এত শক্তি ব্যয় করেছেন, তার একটি কারণ আছে। কারণ মানুষকে মিথ্যা বলা এবং তাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া অনেক সহজ হয়, যখন আপনার কোটিপতি বন্ধুদের মালিকানাধীন গণমাধ্যম আপনার পক্ষে কাজ করে।
যুক্তরাজ্যে প্রকল্পগুলোর জন্য মার্কিন করদাতাদের ১২ মিলিয়ন ডলার পাঠানো সামগ্রিক বাজেটের তুলনায় হয়তো খুব বড় অঙ্ক নয়। গত সেপ্টেম্বরে পেন্টাগনের জন্য পিট হেগসেথ যে পরিমাণ রিব-আই স্টেকে খরচ করেছিলেন, তার চেয়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার কম।
আর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তুলনায় তো এটি সামান্যই। যে যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে পাঠানো এই অর্থ আরেক ধরনের যুদ্ধ প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
এসব বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়। বরং এগুলো দেখায়, কীভাবে কট্টর ডানপন্থা আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে এবং কীভাবে পশ্চিমা সভ্যতাকে “রক্ষা” করার অজুহাতে এমজিএজি আন্দোলনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা চলছে।
ট্রাম্প প্রশাসন তার আন্তর্জাতিক উদ্দেশ্য গোপন করেনি।
গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত নতুন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল-এ বলা হয়েছিল, ইউরোপ “সভ্যতাগত বিলুপ্তির” মুখোমুখি। এতে আরও বলা হয়, ইউরোপীয় দেশগুলোর ভেতরে “ইউরোপের বর্তমান গতিপথের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা” মার্কিন নীতির অংশ হওয়া উচিত।
অন্যভাবে বললে, এর অর্থ হলো ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী দল ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শক্তিশালী করা।
এটি অর্থের মাধ্যমে করা হচ্ছে, আবার সরাসরি সমর্থনের মাধ্যমেও।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইলন মাস্ক ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী আন্দোলনকে ব্যাপকভাবে প্রচার করেছেন।
আর গত বছর ওয়ারশতে অনুষ্ঠিত কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল একশন কনফারেন্স এ তৎকালীন মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোম প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক রীতিনীতি ভেঙে পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কারোল নাভরোকি-কে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আহ্বান জানান। নাভরোকি ট্রাম্পসুলভ “পোল্যান্ড প্রথম, পোলিশরা প্রথম” স্লোগান ব্যবহার করেছিলেন। তিনি অল্প ব্যবধানে জয়ী হন।
শেষ পর্যন্ত এমএজিএ-র সমস্যা কোথায়?
বিদেশের রাজনীতিতে এভাবে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ অবশ্যই উদ্বেগজনক।
তবে ইউরোপে এমএজিএ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে মার্কিন কট্টর ডানপন্থিরা হয়তো বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। কারণ তারা আগে আমেরিকার সমস্যাগুলো সমাধান করার বদলে এমএজিএ-কে বিশ্বব্যাপী ছড়ানোর কাজে ব্যস্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ ‘পশ্চিমা সভ্যতা রক্ষা’ করার এই অভিযানের চেয়ে অনেক বেশি চিন্তিত পেট্রোল ও মুদি পণ্যের দাম বহন করতে পারছে কি না, তা নিয়ে।
আর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং ট্রাম্পের ‘নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করব না’ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে ক্রমবর্ধমান খরচের বিষয়টি মেলানোও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
গত মাসে পলিটিকো-র এক জরিপে দেখা যায়, ট্রাম্পের এমএজিএ ঘাঁটির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মনে করে ইরানের যুদ্ধের খরচ সার্থক। মে মাসে এই হার ছিল অর্ধেক।
ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থকদের মধ্যেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পডকাস্টার জো রোগান, যিনি ট্রাম্পের একজন প্রভাবশালী সমর্থক ছিলেন, ইরান ইস্যুতে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে গত বছর বলেছিলেন, ‘আমি মানুষের সামর্থ্যের সমস্যা নিয়ে কথা শুনতে চাই না।’
কিন্তু প্রেসিডেন্ট, যিনি গত বছর আনুমানিক ২.২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন, তার উচিত এখন মানুষের কথা শোনা। গড়পড়তা ট্রাম্প ভোটার হয়তো জানেন না যে তার করের অর্থ দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু এমনকি এমএজিএ-র সবচেয়ে কট্টর সমর্থকের কাছেও এখন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাদেরই শেষ স্থানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
লেখক পরিচিতি
আরওয়া মাহদাউই হলেন দ্য গার্ডিয়ানের একজন কলামিস্ট এবং ‘স্ট্রং ফিমেল লিড’ বইটির রচয়িতা।
.png)




