Advertisement

সার্টিফিকেটের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ ভবিষ্যৎ

সিজিপিএ বাড়ছে, দক্ষতা কমছে
মীর হাসিব মাহমুদ
সার্টিফিকেটের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ ভবিষ্যৎ
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে এখন শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে, আর সিজিপিএর গড়ও বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ৩.৮০ বা ৪.০০ সিজিপিএ পাওয়া আর বিরল কিছু নয়। পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব জায়গাতেই ভালো ফলাফলকে সফলতার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে ধরা হচ্ছে। কিন্তু এই উজ্জ্বল ফলাফলের আড়ালে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দেশে শিক্ষিত তরুণ বাড়লেও দক্ষ জনশক্তি সেই অনুপাতে বাড়ছে না।

আজ বাংলাদেশের চাকরির বাজারে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় দুটি বিপরীতমুখী কথা। একদিকে হাজার হাজার তরুণ চাকরি পাচ্ছে না, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে তারা ‘যোগ্য মানুষ’ খুঁজে পাচ্ছে না। অর্থাৎ দেশে বেকারও বাড়ছে, আবার দক্ষ কর্মীর সংকটও বাড়ছে। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে গভীর একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২৬ লাখ বেকারের মধ্যে বড় একটি অংশ উচ্চশিক্ষিত তরুণ। অনেক গ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত চাকরি খুঁজেও স্থায়ী কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। অন্যদিকে প্রযুক্তি, শিল্পখাত, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, এমনকি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও প্রায়ই অভিযোগ করছে—দক্ষ কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না।

এই বাস্তবতা শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা এবং তরুণ সমাজের আত্মবিশ্বাসের জন্যও বড় হুমকি।

সমস্যার শুরু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা মানেই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার প্রতিযোগিতা। ছোটবেলা থেকে একজন শিক্ষার্থীকে শেখানো হয়—ভালো রেজাল্ট করলেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত। ফলে শেখার চেয়ে নম্বর পাওয়ার প্রবণতা বেশি তৈরি হয়। একজন শিক্ষার্থী হয়তো রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, মুখস্থ করছে, ভালো সিজিপিএ অর্জন করছে; কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা কিংবা সৃজনশীল চিন্তা—এসব দক্ষতা গড়ে উঠছে না।

ফলাফল হিসেবে আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি যারা পরীক্ষার খাতায় সফল, কিন্তু বাস্তব কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চিত। তারা থিওরি জানে, কিন্তু প্রয়োগ জানে না। তারা সার্টিফিকেট অর্জন করছে, কিন্তু আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই সমস্যা স্পষ্ট। গত এক দশকে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু শিক্ষার মান, গবেষণা, আধুনিক ল্যাব, দক্ষ শিক্ষক এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ সেই অনুপাতে শক্তিশালী হয়নি। অনেক শিক্ষার্থী চার বছর পড়াশোনা শেষ করেও বুঝতে পারে না বাস্তব চাকরির বাজারে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন।

বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, অটোমেশন, সাইবার সিকিউরিটি ও ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী এখনো পুরোনো সিলেবাসে আটকে আছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম বাস্তব শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

বর্তমান সময়ে শুধু একাডেমিক ফলাফল দিয়ে আর ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব নয়। এখন প্রতিষ্ঠানগুলো এমন মানুষ চায় যারা সমস্যা সমাধান করতে পারে, দ্রুত নতুন কিছু শিখতে পারে, প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে এবং দলগতভাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু আমাদের বড় অংশের তরুণ এখনও সেই বাস্তব প্রস্তুতি পাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট এখন ‘স্কিল মিসম্যাচ’ বা দক্ষতার অমিল। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় যা শেখাচ্ছে আর কর্মক্ষেত্র যা চাইছে—দুটির মধ্যে বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। এই ফাঁক যত বাড়বে, ততই তরুণদের হতাশা বাড়বে।

এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। অনেক তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করেও নিজের যোগ্যতা নিয়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। কেউ বিদেশমুখী হচ্ছে, কেউ ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশায় ভুগছে, আবার কেউ নিজের শিক্ষাজীবনকেই ব্যর্থ মনে করছে। দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি মানসিক ও সামাজিক সংকটও তৈরি করে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে যাকে ধরা হয়—সেই তরুণ জনগোষ্ঠীই ভবিষ্যতে বড় বোঝায় পরিণত হতে পারে, যদি তাদের দক্ষ করে তোলা না যায়। আজ দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সের। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু যদি তারা কেবল সার্টিফিকেটধারী বেকারে পরিণত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।

বিশ্ব এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের কারণে আগামী দশকে বহু প্রচলিত চাকরি হারিয়ে যেতে পারে। নতুন ধরনের কাজ তৈরি হবে, যেখানে শুধু ডিগ্রি নয়; প্রয়োজন হবে বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং অভিযোজন ক্ষমতা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো সেই পরিবর্তনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক রাখলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। শুধু চাকরি খোঁজার মানসিকতা নয়; উদ্যোক্তা হওয়ার সাহসও তৈরি করতে হবে।

একই সঙ্গে তরুণদেরও বুঝতে হবে—সিজিপিএ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই সবকিছু নয়। বাস্তব দক্ষতা ছাড়া এখনকার বিশ্বে টিকে থাকা কঠিন। নতুন প্রযুক্তি শেখা, যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানো, নিজেকে আপডেট রাখা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের তরুণদের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ নেই। তারা মেধাবী, পরিশ্রমী এবং দ্রুত শেখার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা।

আজ সময় এসেছে আমাদের নিজেদের একটি কঠিন প্রশ্ন করার—আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত জাতি তৈরি করছি, নাকি শুধু সার্টিফিকেটধারী একটি প্রজন্ম তৈরি করছি?

কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কেবল সিজিপিএ দিয়ে পরিচয় তৈরি হবে না। পরিচয় তৈরি হবে দক্ষতা দিয়ে, কাজের সক্ষমতা দিয়ে, বাস্তব সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা দিয়ে। আর সেই প্রস্তুতি নিতে না পারলে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ শুধু প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে না; হারিয়ে ফেলবে তাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎও।

লেখক: সিইও, লিড নেশন একাডেমী – এলএনএ এবং সহকারী অধ্যাপক, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়