logo

আলজাজিরার বিশ্লেষণ/ভারতে তরুণদের বিক্ষোভে সরকারের দমন-পীড়নের পর কী ঘটতে চলেছে

ভারতে তরুণদের বিক্ষোভে সরকারের দমন-পীড়নের পর কী ঘটতে চলেছে
ভারতের নয়াদিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা কর্মীরা একজন বিক্ষোভকারীকে আটক করেন। ছবি: রয়টার্স

ভারতে তরুণদের বিক্ষোভের ওপর নজিরবিহীন দমন-পীড়নের পর রাজধানী নয়াদিল্লিতে উত্তেজনা এখনও কমেনি। সেখানে শুরু হয়েছে নতুন দফার আন্দোলনের প্রস্তুতি। এর আগে আলোচিত তরুণ সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ও বিভিন্ন বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের হাজারো নেতাকর্মীসহ বিরোধীদলীয় রাজনীতিকদের আটক করা হয়। পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই আটকাদেশকে বেআইনি আখ্যা দিলে রোববার তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

কারামুক্তির পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান অভিজিৎ দীপকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একজন ‘নিপীড়ক’ ও ‘কাপুরুষ শাসক’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ভারতের ইতিহাসে এমন ভীরু প্রধানমন্ত্রী দেশবাসী আগে কখনো দেখেনি।

আন্দোলনের পেছনের মূল দাবি

বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এমন একটি প্রক্রিয়া চালিয়েছে যার সরাসরি সুবিধা পাচ্ছে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। কারিগরি ত্রুটি ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে সংখ্যালঘু মুসলিমসহ কয়েক কোটি সাধারণ নাগরিকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বাকি দুই কমিশনার স্বয়ং জ্ঞানেশ কুমারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি তিন সদস্যের সাংবিধানিক সংস্থা, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ম। প্রধান কমিশনার সেই নিয়ম অমান্য করেছেন বলে খবর প্রকাশের পরই মূলত ভারতের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

দমন-পীড়নের বিস্তার ও দিল্লির রূপ

শনিবারের সমাবেশ ঠেকাতে দুই কোটি মানুষের শহর নয়াদিল্লিকে কার্যত একটি দুর্গে পরিণত করেছিল প্রশাসন। ভারতের পার্লামেন্টের কাছে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তর পুরোপুরি সিলগালা করে দেওয়া হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গত জুলাই মাসে এই যন্তর মন্তরেই ছাত্র আন্দোলনের মুখে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার মোতায়েন করা হয় ৩০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য। প্রধান প্রধান সড়কের প্রবেশমুখে তল্লাশিচৌকি বসানো হয় এবং বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে বিক্ষোভকারীদের খোঁজা হয়। সড়কে কংক্রিটের ব্যারিকেড ও কাঁদানে গ্যাসের গাড়ি বসিয়ে যান চলাচল আটকে দেওয়া হয়। মেট্রো ও ট্রেনের স্বাভাবিক চলাচল স্থগিত রাখা হয় এবং রাজধানীর বেশকিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, যাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণরা ঐক্যবদ্ধ হতে না পারেন।

বিমান থেকেই নেতা ও ইউটিউবারদের আটক

আন্দোলনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা অভিজিৎ দিপকে এবং তার দুই সহযোগী সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা মুম্বাই থেকে বিমানে দিল্লিতে পৌঁছামাত্রই এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজের ভেতরে ঢুকেই পুলিশ তাদের আটক করে। দিপকের শেয়ার করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ কর্মকর্তাদের দেখে তিনি বলছেন যে তিনি গ্রেপ্তার হতে কোনো ভয় পান না।

এর বাইরে জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী নেহা বোরা ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার পিনারাই বিজয়নের মতো বিরোধীদলীয় নেতাদেরও পুলিশ সাময়িকভাবে আটক করে।

দিল্লির হস্তশিল্প বাজার দিল্লি হাটের মতো উন্মুক্ত জায়গায় ক্ষুদ্র পরিসরে জমায়েত হতে চাইলেও পুলিশ সেখানে বাধা দেয়। মুম্বাইয়েও বিক্ষোভ করতে গিয়ে প্রায় ৬০০ মানুষ গ্রেপ্তার হন। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে স্ক্রোল ও নিউজলন্ড্রির মতো সংবাদমাধ্যমের বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও পুলিশের হাতে হেনস্তা ও আটকের শিকার হন।

আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছিল

দিল্লির ভিজ্যুয়াল শিল্পী আবান রাজা জানান, তিনি অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজসহ কয়েকজন শনিবার সকালে ব্যানার নিয়ে যন্তর মন্তরের দিকে যাচ্ছিলেন। সেখানে পৌঁছামাত্রই পুলিশ তাদের ব্যানার কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে এবং জোর করে বাসে তুলে নিয়ে যায়।

আবান রাজার বক্তব্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের অনেকেই বিক্ষোভকারী ছিলেন না। কেউ গুরুদুয়ারায় যাচ্ছিলেন আবার কেউ কর্মক্ষেত্র থেকে পরিবারে ফিরছিলেন। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকেও রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এ ধরনের নির্মম আচরণে ভয় না পেয়ে বরং গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানান তিনি।

বিরোধীদের সমর্থন ও একতাবদ্ধ লড়াই

কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ এই তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি মাঠে নেমেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে তারাও নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল জানান, সরকার যতই দমন করুক না কেন জ্ঞানেশ কুমারকে বিদায় না করা পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না।

কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মোদি সরকার গণতন্ত্রের মাতৃভূমিকে মুখ বন্ধ করা এক স্বৈরতন্ত্রে রূপ দিয়েছে। কিন্তু লাঠি, বুলেট কিংবা কারাগার দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে আটকে রাখা সম্ভব হবে না।

সরকার কেন সমঝোতায় যেতে নারাজ

বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে নিতে মোদি সরকারের চরম অনীহার পেছনে বড় রাজনৈতিক হিসাব কাজ করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বিজেপি অবশ্য দাবি করেছে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৩ কোটি নামের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ মারা গেছেন, ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ এলাকা ছেড়েছেন এবং বাকিদের ঠিকানা মেলেনি।

বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিক্ষোভকারীদের নৈরাজ্যবাদী আখ্যা দিয়ে বলেন, টিভিতে যা দেখা যাচ্ছে তা ভারতের আসল চিত্র নয়। দেশ শান্তিতে এগোচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি মেনে নিলে বিরোধীদের ভোট চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাবে। এর ফলে নিজের ক্ষমতাশালী ও অজেয় ভাবমূর্তি ধরে রাখা নরেন্দ্র মোদির জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সঞ্জয় কাপুরের মতে, এই আন্দোলনে যারা নেমেছেন তাদের বড় অংশই আর মোদি সরকারের শাসন দেখতে চান না। ফলে সরকারের পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার ভয় তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রতিক্রিয়া

ভারতের এই ব্যাপক ধরপাকড়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করতে এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলোচনায় বসতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, নাগরিকদের ন্যায্য উদ্বেগ আমলে না নিয়ে ভারত সরকার সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করার স্বৈরাচারী চেষ্টা চালাচ্ছে।

যদিও জেনেভায় ভারতের জাতিসংঘ মিশন একে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দাবি করেছে যে জননিরাপত্তার স্বার্থেই এসব আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যতের পথ কোন দিকে

তরুণ নেতাদের প্রত্যয় দেখে এটি স্পষ্ট যে এই আন্দোলন সহজে স্তিমিত হবে না। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জয়তী ঘোষ মনে করেন, জনগণের ক্ষোভের গভীরতা বুঝতে পারছে না মোদি প্রশাসন। এভাবে দমনপীড়ন চালিয়ে ক্ষোভ দমন করা যাবে না, বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

সাংবাদিক সঞ্জয় কাপুর মন্তব্য করেন, নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হয়তো ভাবছেন এই আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপের মতো কোনো রঙিন বিপ্লব অথবা নেপাল ও বাংলাদেশের মতো গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতনের চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে বিশ্লেষক রশীদ কিদওয়াই পুরো পরিস্থিতিকে সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির আগের অস্থিরতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিক্ষোভ দীর্ঘায়িত হবে এবং ভারত একটি গভীর অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।


লেখক পরিচিতি

প্রিয়াঙ্কা শঙ্কর ব্রাসেলস ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নাগরিক অধিকার এবং দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলন নিয়ে তিনি নিয়মিত আলজাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন লিখে থাকেন।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]