Advertisement

আলজাজিরার কলাম/হরমুজ-পরবর্তী যুগ আফ্রিকার জন্য এক বিশাল সুযোগ নিয়ে এসেছে

রাফায়েল শিখানি
হরমুজ-পরবর্তী যুগ আফ্রিকার জন্য এক বিশাল সুযোগ নিয়ে এসেছে
নাইজেরিয়ার লাগোসে ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর লাগোস লেগুনে নোঙর করা একটি তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর থেকে তোলা দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালীতে চলাচলের বিঘ্ন অব্যাহত থাকায় আফ্রিকার অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অথচ তাদের হাতে প্রচুর জ্বালানি ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে। চার বছর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের প্রভাব পড়েছিল।

Advertisement

আমরা এখন যেটিকে ‘হরমুজ-পরবর্তী যুগ’ বলছি, তাতে প্রবেশ করছি। এটা এমন এক সময়, যখন বৈশ্বিক ব্যবস্থা আর একটি মাত্র সংকীর্ণ জলপথ দ্বারা নির্ধারিত নয়। আফ্রিকার সামনে এখন সুযোগ রয়েছে তার ভাগ্য পরিবর্তনের এবং বিশ্ব ভূরাজনীতির প্রান্তিক অবস্থান থেকে মূলধারায় উঠে আসার। সম্পদের নিছক জোগানদাতা বা অন্য দেশের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল না থেকে আফ্রিকা এখন নিজের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিজেই তৈরি করতে পারে।

আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলো যা ভয় পায়

আফ্রিকার এই রূপান্তরের প্রথম ধাপ হলো থ্যালাসোফোবিয়া বা সমুদ্র ভীতি কাটিয়ে ওঠার একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা করা। এটি হলো আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোর একটি ঐতিহাসিক প্রবণতা যেখানে তারা সমুদ্রকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তির ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানা হিসেবে দেখে এসেছে।

কয়েক দশক ধরে আফ্রিকার কৌশলগত চিন্তা মূলত স্থলের হুমকি, যেমন জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান এবং সীমান্ত সংঘাত দ্বারা প্রভাবিত ছিল। সমুদ্র কেবল জননীতিতেই নয়, বরং অভিজাত শ্রেণির কৌশলগত সংস্কৃতিতেও প্রান্তিক হয়েছিল। এসবেই বোঝা যায় যে, কেন আফ্রিকা স্থল নিরাপত্তা নিয়ে প্রচুর চিন্তা করলেও সামুদ্রিক শক্তি, নীল অর্থনীতি, মহাসাগরীয় করিডোর এবং নৌ-শক্তি নিয়ে ততটা ভাবেনি।

অন্য সমস্যাটি হলো, আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই একটি সাধারণ মহাদেশীয় কৌশলের রাজনৈতিক, আর্থিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়ভার নিতে ভয় পায়। তারা একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে বিচ্ছিন্ন জাতীয় পদক্ষেপকেই বেশি পছন্দ করে। এর কারণগুলো কেবল সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত। প্রথম কারণ হলো সার্বভৌমত্বের প্রাধান্য। আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলো ঔপনিবেশিক সীমানা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে তাদের স্বাধীনতার পরবর্তী ব্যবস্থার মূল নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে।

অথচ একটি সাধারণ সামুদ্রিক কৌশলের জন্য সার্বভৌমত্বের কিছু অধিকার ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন: যেমন একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর এখতিয়ার, যুদ্ধের নিয়মাবলি, যৌথ কমান্ড এবং সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করা।

দ্বিতীয় কারণ হলো ‘স্বার্থের ভিন্নতা’। আফ্রিকার বিভিন্ন সামুদ্রিক অঞ্চলের হুমকি ভিন্ন ভিন্ন: গিনি উপসাগরে জলদস্যুতা ও অপরিশোধিত তেল চুরি, পশ্চিম ভারত মহাসাগরে অবৈধ মাছ ধরা এবং ভূমধ্যসাগরে অভিবাসন সমস্যা। এই ধরনের ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার থেকে একটি একক এজেন্ডা তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন কাজ এবং বিভাজনই সেখানে সহজ পথ হিসেবে দেখা দেয়।

তৃতীয় কারণ হলো ‘ব্যয় এবং সক্ষমতা’। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নজরদারি এবং লজিস্টিক সক্ষমতা তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা খুব কম রাষ্ট্রই বহন করতে পারে।

চতুর্থ এবং সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ হলো ‘নিরাপত্তার আউটসোর্সিং’। আফ্রিকান জলসীমায় বিদেশি নৌবাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি (আন্তর্জাতিক মিশন বা সামরিক ঘাঁটির মাধ্যমে) সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই পরনির্ভরশীলতা নিজস্ব সক্ষমতা তৈরিতে নিরুৎসাহিত করে।

এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও সীমান্ত বিরোধের মতো সমস্যাগুলো বাজেট এবং মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে ফেলে, যার ফলে সমুদ্রের বিষয়টি সবসময় অবহেলিত থেকে যায়।

কেন আফ্রিকার ভূ-রাজনৈতিক সচেতনতা প্রয়োজন

আফ্রিকায় সমুদ্র রাজনৈতিকভাবে অদৃশ্য হয়ে থাকে: এটি কেবল তখনই গুরুত্ব পায় যখন কোনো আন্তর্জাতিক সংকট আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোকে বৈশ্বিক সামুদ্রিক করিডোরের ওপর তাদের নির্ভরশীলতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

ফলস্বরূপ, আফ্রিকার বিশাল কৌশলগত সম্পদ যেমন তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ এবং আটলান্টিক, ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরকে সংযুক্ত করার ভৌগোলিক অবস্থান—ভূ-রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনে রূপান্তরিত হয় না। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আফ্রিকাকে নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করতে হবে। এর অর্থ হলো সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে মহাদেশীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা।

এখানেই ‘হরমুজ-পরবর্তী যুগ’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি একক জ্বালানি করিডোর দ্বারা শাসিত ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে একটি বহু-কেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরকে বোঝায়। এখন বিশ্বের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হরমুজ, বাব আল-মান্দেব, লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল, মোজাম্বিক চ্যানেল এবং উত্তমাশা অন্তরীপের মতো একাধিক কৌশলগত করিডোরের সমন্বয়ে নির্ধারিত হয় যেখানে আফ্রিকা একটি কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে, আফ্রিকা কেবল বৈশ্বিক প্রবাহের পথ নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক করিডোর ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে। মহাদেশটির কাগজে-কলমে কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব নেই (যেমন আফ্রিকান ইউনিয়নের ২০৫০ সমন্বিত সামুদ্রিক কৌশল), কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন নেই। আফ্রিকার এখন যা প্রয়োজন তা হলো সেই পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ভূ-রাজনৈতিক সচেতনতা।

আফ্রিকার করণীয়

ভূ-রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির অর্থ হলো সমুদ্র সম্পর্কে রাজনৈতিক অভিজাতদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা। যতক্ষণ পর্যন্ত সমুদ্রকে কেবল একটি সীমান্ত বা রপ্তানির পথ হিসেবে দেখা হবে, ততক্ষণ নিজস্ব সামুদ্রিক সক্ষমতায় বিনিয়োগের রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরি হবে না।

প্রথম পরিবর্তনটি হতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক। এটি স্বীকার করা যে সমুদ্র এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং আফ্রিকান শক্তির বহিঃপ্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র। এর অর্থ হলো প্রতিষ্ঠান, বাজেট এবং কমান্ড কাঠামোর মধ্যে সামুদ্রিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা।

নেতৃত্বের ক্ষেত্রে, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, মিশর, মরক্কো, কেনিয়া, অ্যাঙ্গোলা এবং সেনেগালের মতো নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর একটি জোটকে এগিয়ে আসতে হবে। গিনি উপসাগরের রাষ্ট্রগুলোর তৈরি ‘ইয়াউন্ডে আর্কিটেকচার’ একটি ভালো উদাহরণ, যা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে জলদস্যুতা কমাতে সাহায্য করেছে।

সুনির্দিষ্ট নীতির ক্ষেত্রে ছয়টি বিষয় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত

  • ১. বিদ্যমান চুক্তিগুলো দ্রুত কার্যকর করা।
  • ২. যৌথ নজরদারি এবং রাডার ও স্যাটেলাইট তথ্যের আদান-প্রদান বাড়ানো।
  • ৩. বাহ্যিক দাতাদের ওপর নির্ভরতা কমাতে একটি ‘আফ্রিকান সামুদ্রিক নিরাপত্তা তহবিল’ গঠন করা।
  • ৪. বন্দর ও করিডোরগুলোকে আফ্রিকান মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা।
  • ৫. জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং নিজস্ব শোধনাগার তৈরি করা যাতে জ্বালানি সংকটে তারা বিপদে না পড়ে।
  • ৬. সমুদ্র খাতের মানবিক ও শিল্প সম্পদে (জাহাজ নির্মাণ, মেরামত ইত্যাদি) বিনিয়োগ করা যাতে মহাদেশের সম্পদ বাইরে চলে না যায়।

পরিশেষে ভূ-রাজনৈতিক সচেতনতা তখনই বাস্তব হয় যখন এটি অর্থায়নকৃত প্রতিষ্ঠান এবং কার্যকর বাজেটে রূপান্তরিত হয়। হরমুজ-পরবর্তী যুগ আফ্রিকার জন্য কোনো হুমকি নয়, বরং এটি তাদের জন্য শ্রেষ্ঠ সুযোগ। প্রশ্ন এখন আর এটি নয় যে আফ্রিকা নতুন বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে স্থান পাবে কি না। সেই স্থান তার ভৌগোলিক অবস্থান ও সম্পদের কারণেই নির্ধারিত।

আসল প্রশ্ন হলো, মহাদেশটির সেই কৌশলগত দূরদৃষ্টি আছে কি না যাতে তারা ইতিহাসের লক্ষ্যবস্তু না হয়ে নিজেই ইতিহাসের নায়ক হতে পারে।


লেখক: রাফায়েল শিখানি একজন মোজাম্বিকান ইতিহাসবিদ, গবেষক, পরামর্শদাতা, বিশ্লেষক এবং প্রাবন্ধিক, যার সাংবাদিকতা, শিক্ষাদান, গবেষণা, কৌশলগত যোগাযোগ এবং পাবলিক পলিসির ক্ষেত্রে চার দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে।