logo

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ: সংস্কার নাকি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর রোডম্যাপ প্রয়োজন

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ: সংস্কার নাকি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর রোডম্যাপ প্রয়োজন
সমাবর্তনের শিক্ষার্থীদের উল্লাস। ছবি: ডেইলি স্টার

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে এমন একটি সন্ধিক্ষণে অবস্থানরত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে একদিকে শিল্প ও সেবা খাত ক্রমাগত দক্ষ, সৃজনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর জনশক্তি চাইছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হওয়া অনেক শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এ অবস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি কোর্স পরিবর্তন, পরীক্ষা পদ্ধতিতে সামান্য সংশোধন কিংবা নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও পরিমাপযোগ্য জাতীয় উচ্চশিক্ষা রূপান্তর রোডম্যাপ। এই রোডম্যাপের লক্ষ্য শুধু অধিকসংখ্যক স্নাতক তৈরি করা নয়; বরং এমন মানুষ তৈরি করা, যারা জ্ঞান অর্জন করবে, জ্ঞান প্রয়োগ করবে, নিজেকে বিকশিত করবে, অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করবে এবং সমাজকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হলো বা কতজন সনদ পেল- শুধু তা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রশ্ন হওয়া উচিত, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় কী জানে, কী করতে পারে, কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছে এবং সমাজের জন্য কী করতে সক্ষম।

এই জায়গায় শিক্ষার পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- জানতে শেখা, করতে শেখা, মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা, একসঙ্গে বসবাস ও কাজ করতে শেখা এবং নিজেকে ও সমাজকে রূপান্তর করতে শেখা। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যকে কেবল তথ্য সরবরাহ থেকে রূপান্তরমূলক শিক্ষায় নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলাম

বাংলাদেশে ওবিই নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ওবিই যদি শুধু পাঠ্যক্রমের নথি, কোর্সের ফলাফল এবং ম্যাপিং এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোতে শিক্ষার্থীর ফল অর্জনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে- মৌলিক, সামাজিক, চিন্তন এবং ব্যক্তিগত ক্ষেত্র। এর মধ্যে রয়েছে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও প্রয়োগ, যোগাযোগ ও সহযোগিতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা, আত্ম নির্দেশনা, সততা, দায়িত্ববোধ ও আজীবন শেখার সক্ষমতা। তাই একটি ভালো পাঠ্যক্রমের প্রশ্ন হওয়া উচিত- শিক্ষার্থী কী পড়বে?-এর পাশাপাশি শিক্ষার্থী কী করতে পারবে? এবং সে কেমন দক্ষতা ও মূল্যবোধ অর্জন করবে? পাঠ্যক্রম, শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম এবং মূল্যায়ন- এই তিনটির মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করতে হবে।

আমাদের উচ্চশিক্ষার আরেকটা বড় দুর্বলতা হলো পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা। প্রচলিত ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর জ্ঞান প্রায়ই নির্ধারিত হয় সে কতটা তথ্য মনে রাখতে পেরেছে তার ভিত্তিতে। অথচ কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজন তথ্য মুখস্থ করার চেয়ে বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, দলগত কাজ এবং নতুন পরিস্থিতিতে জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষমতা। তাই মূল্যায়নে প্রকল্প, সমস্যা সমাধান, উপস্থাপনা, গবেষণাভিত্তিক কাজ, ব্যবহারিক কার্যক্রম, দলগত কাজ, প্রতিবেদন, পোর্টফোলিও এবং আত্মমূল্যায়নের মতো পদ্ধতির বিস্তার ঘটাতে হবে। মূল্যায়ন হবে শেখার শেষ ধাপ নয়; বরং শেখারই একটি অংশ।

শিক্ষকই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু

কোনো পাঠ্যক্রম যত আধুনিকই হোক, দক্ষ ও প্রস্তুত শিক্ষক ছাড়া তা কার্যকর হয় না। শিক্ষকদের নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতিতেও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পেশাগত উৎকর্ষ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের শিক্ষক শুধু বক্তা হবেন না; তিনি হবেন পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা, গবেষক এবং শিক্ষার্থীর শেখার সহযাত্রী।

গবেষণাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে

গবেষণাবিহীন বিশ্ববিদ্যালয় মূলত জ্ঞান পুনরুৎপাদন করে; জ্ঞান সৃষ্টি করে না। তাই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী যৌথ গবেষণা, আন্তঃবিষয়ক গবেষণা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে।

গবেষণার ফল যেন শুধু সাময়িকী বা সম্মেলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; তা যেন শ্রেণিকক্ষ, শিল্প, সমাজ ও নীতিনির্ধারণে ব্যবহার হয়। একটি দীর্ঘমেয়াদি বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনায় গবেষণা-সংস্কৃতি, গবেষণা সহযোগিতা, শিল্প-সমর্থিত গবেষণা এবং শিক্ষাদানের সঙ্গে গবেষণার সংযোগকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভয় নয়, দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন উচ্চশিক্ষার বাস্তবতা। তাই শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে দূরে রাখার পরিবর্তে এর দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখাতে হবে। ধারণা তৈরি, লেখার ভাষা পরিমার্জন, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা গবেষণার সহায়ক হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, মৌলিকত্ব এবং একাডেমিক সততা সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে।

একই সঙ্গে প্রয়োজন ডিজিটাল দক্ষতা ও নিরাপত্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি, ফলাফল, অর্থ, মানবসম্পদ, গবেষণা ও প্রশাসনিক তথ্যকে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা যেতে পারে। তবে ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। গোপনীয়তা, তথ্যের অখণ্ডতা ও প্রাপ্যতা- এই তিনটি নীতিকে ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় হবে সমাজের জীবন্ত পরীক্ষাগার

ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্যাম্পাসের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবেশ, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, দারিদ্র্য, জলবায়ু, সামাজিক বৈষম্য কিংবা স্থানীয় উন্নয়নের বাস্তব সমস্যাগুলোকে শিক্ষার অংশ করতে হবে।

শিক্ষার্থীরা প্রকল্প করবে, স্থানীয় সমস্যার সমাধান খুঁজবে, সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করবে এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিখবে। শিক্ষার পঞ্চম স্তম্ভ- নিজেকে ও সমাজকে রূপান্তর করার শিক্ষা- বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি ‘জীবন্ত পরীক্ষাগারে’ পরিণত করার কথা বলে, যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, সামাজিক উদ্যোগ ও টেকসই উন্নয়ন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

এখন প্রয়োজন জাতীয় রোডম্যাপ

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ তাই আর বিচ্ছিন্ন কিছু সংস্কারের বিষয় নয়; এটি একটি সমন্বিত জাতীয় রূপান্তরের প্রশ্ন। প্রয়োজন এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ, যেখানে শিক্ষক নিয়োগ ও উন্নয়ন, ফলভিত্তিক শিক্ষা, মূল্যায়ন সংস্কার, গবেষণা ও উদ্ভাবন, শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারত্ব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল দক্ষতা, সাইবার নিরাপত্তা, আজীবন শিক্ষা, শিক্ষার্থীর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ, নৈতিকতা, অন্তর্ভুক্তি এবং মান নিশ্চিতকরণ- সবকিছু একটি কাঠামোর মধ্যে থাকবে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি অবশ্যই অবকাঠামোতে নয়, মানসিকতায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষাদানকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়, সেখান থেকে গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং শেষ পর্যন্ত জ্ঞান ও উদ্ভাবনের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার সাফল্য কতজন গ্র্যাজুয়েট তৈরি হলো, সেই সংখ্যায় নয়; বরং তারা কী জানে, কী করতে পারে, কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে কতটা অবদান রাখতে পারে- তার মধ্যেই উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সাফল্য নিহিত।

লেখক: ড. ফুয়াদ হোসেন, ডিন, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।