নারী চিকিৎসকদের অব্যক্ত যন্ত্রণা ও ডে-কেয়ারের অপেক্ষা

রাত সাড়ে এগারোটা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ। একজন তরুণী চিকিৎসক দ্রুত পায়ে অপারেশন রুমে ঢুকল। কপালে ঘাম, চোখে ক্লান্তি—কিন্তু হাত কাঁপছে না। রোগী স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত চলল চেষ্টা। রোগীর কন্ডিশন একটু ভালো হওয়ার পর কমল ক্লান্তি। অন্যদিকে মোবাইল ফোনের রিংটোন বেজেই চলেছে। তিনি একটু সরে এসে ফোন বের করলেন। অপরপ্রান্তে কেউ নেই। শুধু একটি বার্তা ‘বাবু কাঁদছে।’
এই দৃশ্য কোনো চলচ্চিত্রের নয়। এটি বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে, প্রতিটি শিফটে, প্রতিটি ইমার্জেন্সি কলে—বারবার ঘটে চলা এক নীরব বাস্তবতা। যে চিকিৎসক মুহূর্তের মধ্যে রোগীর জীবন বাঁচাচ্ছেন, তিনি নিজে প্রতিদিন একটি অসম্ভব প্রশ্নের মুখোমুখি ‘ডিউটিতে গেলে সন্তান কোথায় থাকবে?’
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএসডিসি) ২০২২ সালের তথ্য বলছে, দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকদের ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ নারী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) হিসাবে, সরকারি সেবায় কর্মরত নারী চিকিৎসকের সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এই সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। কিন্তু এই বিশাল কর্মীবাহিনীর শিশুসন্তানের জন্য একটিও প্রাতিষ্ঠানিক, সরকারি ডে-কেয়ার সেন্টার নেই। এটি কি কেবল একটি সুবিধার অনুপস্থিতি? না—এটি একটি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি।
প্রতিদিনের যুদ্ধ
একজন নারী চিকিৎসকের দিনটা শুরু হয় একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন দিয়ে। শিশুকে কার কাছে রাখব? বাসার আয়া বিশ্বস্ত কি না, তার নিশ্চয়ত নেই। মায়ের বাড়ি দূরে। স্বামীর পোস্টিং ভিন্ন জেলায়। এই অনিশ্চয়তা নিয়ে তাকে হাসপাতালে যেতে হয়, ওয়ার্ড রাউন্ড দিতে হয়, রোগী দেখতে হয়—সারাক্ষণ মনের কোণে একটি উদ্বেগ জমে থাকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জরিপ বলছে, শহুরে দ্বৈত-কর্মজীবী পরিবারের ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশু পরিচর্যার মূল দায়িত্ব মায়ের উপর পড়ে। আর সরকারি চিকিৎসকের ক্ষেত্রে নাইট শিফট ও ইমার্জেন্সি কলের বাধ্যবাধকতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত ২০১৯ সালের একটি গবেষণা দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ নারী চিকিৎসক শিশু পরিচর্যার অনিশ্চয়তার কারণে ডিউটি পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন।
মাতৃত্বকালীন ছুটি মাত্র ছয় মাস। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স বলছে, শিশুর প্রথম বছরে মায়ের নিবিড় পরিচর্যা ও স্তন্যদান আদর্শ। কিন্তু ছয় মাস পরে ইমার্জেন্সি রোস্টারে নাম ওঠে। বিকল্প নেই, প্রতিবাদের ভাষা নেই। শুধু আছে প্রতিদিনকার নীরব আপস।
শুধু ব্যক্তির সমস্যা নয়, সমাজের ক্ষত!
এই সমস্যাকে কেবল একজন মায়ের ‘ব্যক্তিগত সমস্যা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু সংখ্যা ও তথ্য বলে ভিন্ন কথা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০২১ সালের প্রতিবেদনে জানায়, শিশু পরিচর্যার সুবিধাহীন কর্মজীবী মায়েরা পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় পদোন্নতির দৌড়ে গড়ে ১৮ থেকে ২৪ মাস পিছিয়ে পড়েন।
বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের গবেষণা বলছে, ডে-কেয়ার সুবিধা থাকলে পরিবারে বাবার শিশু পরিচর্যায় অংশগ্রহণ গড়ে ২২ শতাংশ বাড়ে। নারী রোগীরা, বিশেষত প্রসূতি ও গাইনোকোলজি বিভাগে— নারী চিকিৎসক পেতে চান। ২০১৮ সালের ডব্লিউএইচও’র দক্ষিণ এশিয়া প্রতিবেদন বলছে, এ অঞ্চলে নারী চিকিৎসকের পেশা পরিত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ শিশু পরিচর্যার অপ্রতুল ব্যবস্থা। নারী চিকিৎসকরা পেশা ছেড়ে দিলে কেবল একজন ডাক্তার হারানো নয়— হারিয়ে যায় লাখো রোগীর আস্থার জায়গা।
মনের ক্ষতটা দেখা যায় না!
শরীরের ক্ষত দেখা যায়, মনের ক্ষত দেখা যায় না। জার্নাল অব অকুপেশনাল হেল্থ সাইকোলজি’র ২০২০ সালের একে গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু পরিচর্যার নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকলে কর্মজীবী মায়েদের মধ্যে জেনারালাইজড এনজাইটি ডিসঅর্ডার হার ৪১ শতাংশ বেড়ে যায়। একদিকে রোগীর প্রতি দায়িত্ব, অন্যদিকে শিশুর প্রতি মায়ের ভালোবাসা; এই দুইয়ের মাঝে একজন নারী চিকিৎসকের মানুষিক টানা-পোড়া চলতে থাকে সারাক্ষণ।
দ্য লেনসেচ ২০২১ সালে এই দ্বৈত চাপকে ‘ডাবল বার্ডেন সিনড্রোম’ নামে চিহ্নিত করেছে।
বিশ্ব চিকিৎসক সংস্থা ২০২২ সালের সমীক্ষায় জানায়, শিশু পরিচর্যার নিরাপদ ব্যবস্থাহীন নারী চিকিৎসকদের মধ্যে বার্নআউটের হার অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি। বার্নআউটে ভোগা চিকিৎসক ভুল করেন, দেরি করেন, সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না—এর মূল্য দিতে হয় রোগীকে। তাই এটি শুধু একজন মায়ের মানসিক সমস্যা নয়, এটি রোগীর নিরাপত্তার প্রশ্নও।
বিশ্ব যা করেছে, আমরা কেন পারব না?
এই সমস্যার সমাধান কঠিন নয়। বিশ্ব দেখিয়ে দিয়েছে। ভারতের এআইআউএমএস দিল্লিতে ‘বালওয়াড়ি’ নামক হাসপাতাল-সংলগ্ন ডে-কেয়ার ২০০৫ সাল থেকে চালু। সেটি চালুর পরের বছরেই নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুপস্থিতি ২৪ শতাংশ কমে গেছে। ব্রিটিশ এনএইচএস ২০০৪ সাল থেকে হাসপাতাল ডে-কেয়ার কৌশল বাস্তবায়ন করছে। ফলে নার চিকিৎসকদের কর্ম-সন্তুষ্টি ৩১ শতাংশ বেড়েছে, পেশা-পরিত্যাগ কমেছে ১৯ শতাংশ।
কানাডার কুইবেক প্রদেশে ১৯৯৭ সালে ভর্তুকিপ্রাপ্ত শিশু পরিচর্যা চালু হওয়ার পর নিারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ ১৪ শতাংশ বেড়েছে এবং প্রদেশের অর্থনীতিতে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার যোগ হয়েছে। নরওয়েতে সরকারি ‘বারনেহেজ’ কর্মসূচির ফলে নারী শ্রমশক্তির হার ৭৭ শতাংশ, এই হিসাব বিশ্বের সর্বোচ্চদের একটি।
এগুলো কোনো ধনী দেশের বিলাসিতার গল্প নয়। এগুলো বিনিয়োগের গল্প। মানুষে বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ শেষপর্যন্ত ফেরত আসে অনেক বেশি হয়ে।
কী চাই আমরা?
এই সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রকে এখনই কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অবিলম্বে একটি ‘হাসপাতাল ডে-কেয়ার নীতিমালা’ প্রণয়ন করতে হবে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ৯৪ নম্বর ধারা সংশোধন করে সরকারি হাসপাতালে ডে-কেয়ার স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, নিটোর এবং আটটি বিভাগীয় হাসপাতালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে মানসম্পন্ন ডে-কেয়ার চালু করতে হবে। যেখানে ২৪ ঘণ্টা, প্রশিক্ষিত কর্মী ও স্মার্ট প্রযুক্তিসহ থাকবে সার্বিক তত্ত্বাবধান। থাকবে পুষ্টিবিদ, স্পোর্টস ট্রেইনার ও চিকিৎসা সুবিধা।
তৃতীয়ত, মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস থেকে বাড়িয়ে কমপক্ষে ৯ মাস করতে হবে এবং নমনীয় কর্মসূচি চালু করতে হবে ।
চতুর্থত, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য বরাদ্দের একটি অংশ ডে-কেয়ার অবকাঠামোর জন্য নির্ধারণ করতে হবে।
শেষ কথা
যে হাত রাত তিনটায় অস্ত্রোপচার করে মানুষ বাঁচায়, সেই হাতের মালিক যখন ভোরবেলায় বাড়ি ফেরেন, তখন তার শিশু ঘুমিয়ে পড়েছে—মা ছাড়াই । এই দূরত্ব কমানোর সবচেয়ে সহজ পথ হলো কর্মস্থলের কাছে একটি নিরাপদ, ভালোবাসায় ভরা ডে-কেয়ার।
বাংলাদেশের নারী চিকিৎসকরা প্রতিদিন অসম্ভবকে সম্ভব করছেন। তাদের জন্য একটা ছোট্ট ডে-কেয়ার ঘর তৈরি করা কি সত্যিই এত কঠিন? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় সরকারের, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এবং আমাদের সকলের।
লেখক: চিকিৎসক, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ক বিশ্লেষক এবং ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) সহকারী অধ্যাপক।





