logo

দেশের সাইবার নিরাপত্তা সংকটের মূলে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব

আহমেদ সোহেল বাপ্পী
আহমেদ সোহেল বাপ্পীমানবাধিকার কর্মী ও গবেষক
দেশের সাইবার নিরাপত্তা সংকটের মূলে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব
ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

একটা অপরাধ ঠেকানোর জন্য শুধু আইন আর প্রতিষ্ঠানের নামই যথেষ্ট নয়, এজন্য দরকার এমন মানুষ, যারা ডিজিটাল প্রমাণ পড়তে জানেন, অপরাধীর ডিজিটাল পদচিহ্ন অনুসরণ করতে জানেন, সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে জানেন। বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা সংকটের মূল সংকট এখানেই।

দেশে দক্ষ সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেটরের ভয়াবহ অভাব রয়েছে। প্রতিষ্ঠান আছে, আইন আছে, প্রযুক্তিও কেনা হচ্ছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি চালানোর মতো, তদন্তের সূত্র ধরে অপরাধীকে চিহ্নিত করার মতো প্রশিক্ষিত পর্যাপ্ত জনবল নেই। আর এই একটি ফাঁক দিয়েই বেরিয়ে যাচ্ছে দেশের হাজারো কোটি টাকা।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস নাগাদ দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩৪ দশমিক ০৭ মিলিয়নে। আর মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) প্রতি মাসে গড়ে দেড় ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি লেনদেন হয়। কিন্তু লেনদেনের এই বিস্ফোরণের সঙ্গে বাড়েনি এসব লেনদেন খতিয়ে দেখার সক্ষমতা। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যাই তার বড় প্রমাণ। ২০১৮ সালে যেখানে সাইবার মামলা ছিল প্রায় ৫০০টি, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,২০০-তে।

মোট সাইবার অপরাধের প্রায় ৪০ শতাংশই আর্থিক জালিয়াতি ও লেনদেন প্রতারণা, ২৫ শতাংশ সিস্টেম হ্যাকিং ও ডেটা ব্রিচ। এসব মামলার তদন্তে নেই দক্ষ তদন্তকারী। যা আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় তা একেবারেই নগণ্য। অথচ বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর আকার নেহাত ছোট নয়।

বিজিডি ই-গভ সার্ট, সিআইডি-র সাইবার পুলিশ সেন্টার, ডিএমপির সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন, পিবিআই ও র‌্যাবের সাইবার উইং, বিটিআরসি এবং বিএফআইইউ—প্রতিটি সংস্থারই নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্র্যাকিংয়ের মতো প্রযুক্তিও ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু থানা পর্যায়ে গিয়ে এই কাঠামো ভেঙে পড়ে।

ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ ও সাইবার ফরেনসিকে প্রশিক্ষিত জনবলের সংকট সেখানে প্রকট। যে অল্প কয়েকজন দক্ষ তদন্তকারী তৈরি হন, তাদের বড় অংশই ভালো বেতন ও উন্নত সুযোগের আকর্ষণে বিদেশে বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চলে যান। নীরব এ মেধা পাচার, যা প্রতি বছর রাষ্ট্রকে আরও দুর্বল করে তুলছে। ফলে যখন কোনো ব্যাংক হ্যাক হয় বা কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়, তদন্তের গতি নির্ধারণ করে দেয় হাতে গোনা কয়েকজন ক্লান্ত কর্মকর্তার সক্ষমতা। আর অপরাধীরা ততক্ষণে অনেক দূর এগিয়ে যায়।

তথ্যপ্রযুক্তি আইন থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনে ক্রমাগত পরিবর্তনও এই দুর্বল তদন্তকারী বাহিনীর জন্য বাড়তি বোঝা—নতুন আইনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা তৈরির কোনো ধারাবাহিক পরিকল্পনাই নেই। এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ ব্যাংকিং খাতে।

সাইবার হামলা থেকে আপনার স্মার্টফোন নিরাপদ রাখতে মানুন ৫ নিয়ম

২০১৩ সালে সোনালী ব্যাংক হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে আড়াই লাখ ডলার চুরি দিয়ে যে অধ্যায়ের সূচনা, তা চূড়ান্ত রূপ নেয় ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মধ্য দিয়ে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ওই সাইবার চুরির ঘটনায় সিংহভাগ অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক তদন্তও বছরের পর বছর ঝুলে থেকেছে দক্ষ ডিজিটাল ফরেনসিক জনবলের অভাবে। এরপর ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে ম্যালওয়্যার হামলা, একটি শাখায় পরিচালকের অ্যাকাউন্ট জাল করে অর্থ স্থানান্তরের চেষ্টা এবং সবশেষ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ জালিয়াতি, প্রতিটি ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, অপরাধীরা প্রতিবারই তদন্তকারীদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণা বলছে, দেশের ৫২ শতাংশ ব্যাংক উচ্চ সাইবার ঝুঁকিতে আছে, অথচ ব্যাংকগুলোর গত ২০ বছরের মোট আইটি বিনিয়োগের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে সাইবার নিরাপত্তায়—চীনের ২৪ শতাংশ, উত্তর কোরিয়ার ১৩ শতাংশ কিংবা রাশিয়ার ১২ শতাংশের

তুলনায় যা নিতান্তই অপ্রতুল। শুধু যন্ত্র কিনলেই নিরাপত্তা আসে না; যন্ত্র চালানোর ও তথ্য বিশ্লেষণ করার মতো দক্ষ মানুষও লাগে, যার সবচেয়ে বড় ঘাটতি এখানেই।

প্রতিকারের এই ঘাটতির মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ ভুক্তভোগীরা। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএএফ) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৮৮ শতাংশ সাইবার অপরাধের ঘটনাই সামাজিক মর্যাদা হারানোর ভয়ে অন্তরালে থেকে যায়। আর যে ১২ শতাংশ ভুক্তভোগী আইনি পথে হাঁটেন, তাদের সাড়ে ৮৭ শতাংশই কোনো ইতিবাচক ফল পান না।

এই ব্যর্থতার একটা বড় কারণ হলো, অভিযোগ জমা নেওয়ার মতো লোক থাকলেও, প্রতিটি অভিযোগের প্রযুক্তিগত সূত্র ধরে অপরাধীকে চিহ্নিত করার মতো প্রশিক্ষিত তদন্তকারী নেই যথেষ্ট সংখ্যায়। উদ্বেগের বিষয়, ভুক্তভোগীদের প্রায় ৭৯ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, আর ৫৯ শতাংশই নারী। যে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে ডিজিটাল অর্থনীতি এগিয়ে যাওয়ার কথা, তদন্তকারীর অভাবে তারাই ন্যায়বিচার থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন।

তদন্তকারীর এই ঘাটতি আরও ভয়াবহ চেহারা নেয় যখন

বাংলাদেশ শুধু অভ্যন্তরীণ অপরাধের শিকার থাকে না, আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রেরও পছন্দের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। চীন, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম যখন নিজ নিজ ভূখণ্ডে অনলাইন জুয়া ও প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে কড়া অভিযান শুরু করেছে, তখন মূলত চীন ও নাইজেরিয়াসহ ছয় দেশের নাগরিকদের নিয়ে গঠিত সিন্ডিকেটগুলো তাদের কার্যক্রম সরিয়ে আনছে দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষত বাংলাদেশে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের মতো শহরে পর্যটক ভিসায় ঢুকে অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে অনলাইন ক্যাসিনো ও স্ক্যামিং কেন্দ্র। সাম্প্রতিক এক অভিযানে চট্টগ্রামের খুলশী থানা এলাকা থেকেই একসঙ্গে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আর দেশের বিভিন্ন কারাগারে এখন বন্দি আছেন চার শতাধিক বিদেশি নাগরিক, যাদের অনেকেই বছরের পর বছর অবৈধভাবে অবস্থান করলেও থেকে গেছেন নজরদারির বাইরে। কারণ, আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল লেনদেন ট্র্যাক করার মতো বিশেষায়িত তদন্তকারী দল পর্যাপ্ত নয়।

গুগল অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে ফিরে পাবেন যেভাবে

প্রতারণার অর্থ স্থানীয় এজেন্টদের সহায়তায় দ্রুত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে

রূপান্তরিত হয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে সমান্তরাল এক অনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি, যার জাল ছিন্ন করতে প্রয়োজন ব্লকচেইন ট্র্যাকিংয়ে দক্ষ, আন্তর্জাতিক মানের তদন্তকারী। যা এখনো অপ্রতুল।

প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে এই সক্ষমতার ফারাক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতে অনলাইন প্রতারণায় প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি বিপুল হলেও, দেশটির '১৯৩০ হেল্পলাইন' ও সিএফসিএফআরএমএস প্ল্যাটফর্মের পেছনে আছে প্রশিক্ষিত তদন্তকারী ও বিশ্লেষকদের একটি বড় বাহিনী। যারা রিয়েল-টাইমে জালিয়াতির উল্লেখযোগ্য অংশ ব্লক বা উদ্ধার করতে পারছে।

বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো কেন্দ্রীয় রিয়েল-টাইম পেমেন্ট ব্লকিং ব্যবস্থা গড়ে না ওঠার পেছনে প্রযুক্তির অভাব যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী তা পরিচালনার মতো প্রশিক্ষিত মানুষের অভাব। পার্থক্যটা তাই প্রযুক্তিতে নয়, দক্ষ মানবসম্পদে। এই বাস্তবতা থেকে সবচেয়ে জরুরি ও অগ্রাধিকারযোগ্য পদক্ষেপ একটাই—এখনই সময়ক্ষেপণ না করে দক্ষ সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর তৈরিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। এর জন্য প্রথমত, প্রতিটি জেলা ও থানা পর্যায়ে

ডিজিটাল ফরেনসিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল নিয়োগ ও নিয়মিত দক্ষতা-উন্নয়ন প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে প্রতিটি অভিযোগ কেন্দ্রীয় সংস্থার অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয় পর্যায়েই দ্রুত তদন্ত শুরু করা যায়।

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই: আইজিপি

দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষিত তদন্তকারীদের ধরে রাখতে প্রতিযোগিতামূলক বেতন-কাঠামো, ক্যারিয়ার প্রণোদনা ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। নইলে মেধা পাচার থামবে না। আর যত প্রযুক্তিই কেনা হোক, তা চালানোর মানুষই থাকবে না।

তৃতীয়ত, ভারতের আদলে ব্যাংক, এমএফএস ও পুলিশের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় রিয়েল-টাইম প্রতারণা প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, তবে তার ভিত্তি হতে হবে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষিত জনবল—কাঠামো আগে নয়, মানুষ আগে। ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থেমে থাকার কথা নয়, থাকা উচিতও নয়। কিন্তু প্রতিটি নতুন ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে সমান তালে যদি তৈরি না হয় তা রক্ষা করার মতো দক্ষ মানুষ, তাহলে আমাদের অর্জিত অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলবে অদৃশ্য এই সাইবার লুণ্ঠন।

প্রযুক্তি কেনা যায় রাতারাতি, কিন্তু একজন দক্ষ তদন্তকারী তৈরি হতে সময় লাগে বছরের পর বছর। আর সেই সময়টাই আমরা এখনো নষ্ট করছি। তাই সরকারকে আর কোনো দেরি না করে এখনই এ খাতে মানবসম্পদ তৈরির কাজে মনোযোগী হতে হবে। কারণ প্রতিটি বিলম্বিত দিনে আরও একজন ভুক্তভোগী তৈরি হচ্ছেন, আর অপরাধীরা এগিয়ে যাচ্ছে আরও এক ধাপ।