জুলাই গণঅভ্যুত্থান: সাহসের মিছিলে কবির কণ্ঠস্বর

মানুষ একটা আশ্চর্য ব্যাপার। সে ধ্বংস হতে চায় না। নিজেকে সে ধ্বংস করে না। বেঁচে থাকার আজন্ম তৃষ্ণায় সে জীবন এবং পৃথিবীর সঙ্গে সংগ্রাম করে অবিরাম। জীবনের তাগিদে এ দেশে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যুদ্ধে। কবি ও লেখকরা নেমেছিলেন কলমযুদ্ধে। শব্দ, বাক্য এবং মননশীলতার যুদ্ধে। তারা ক্রুদ্ধ ও সংগঠিত হয়েছিলেন অন্যায়ের বিপুল হিমালয় দেখে। লিখেছিলেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও দেয়াললিখন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে আসাদুজ্জামান (আসাদ) শহীদ হলে নাগরিক কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন ‘আসাদের শার্ট’। এই আসাদের শার্ট বাংলার মানুষের প্রাণের পতাকা হয়ে উড়েছিল এই আকাশ-বাতাসে। মুক্তিযুদ্ধের সময় শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’, ‘তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা’ কবিতার মতো মুক্তিযুদ্ধ ও স্বদেশপ্রেম নিয়ে বাংলাদেশের অনেক কবি লিখেছেন তাঁদের অমর কবিতাখানি, যা ইতিহাসে আজও দেদীপ্যমান।
স্বাধীনতাউত্তর এই দেশে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন লেখক, কবি ও সাহিত্যিকরা। ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচিতে যখন ঘাতক বুলেটে নিথর নূর হোসেন, তখন তা স্পর্শ করেছিল আমাদের শামসুর রাহমানকেও, যার প্রকাশ ঘটেছে ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ কবিতায়।
সামাজিক অনাচার, অবিচার এবং স্বৈরশাসনের নানা ধরনের উৎপীড়ন ও শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে কবি-সাহিত্যিকরা কলম ধরেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বুকের ভেতর দারুণ ঝড় নিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন দেশপ্রেমিক কবি-লেখক। এর সংখ্যা অবশ্য হাতে গোনা।
তবেই তুমি বাংলাদেশ
বিগত সাড়ে পনেরো বছরে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কয়েকটি রাজনৈতিক দল আন্দোলন করেছে। কিন্তু নানা কারণে কেউ সুবিধা করতে পারেনি। তার মসনদ কাঁপাতে পারেনি। গণমানুষেরও কণ্ঠ হয়ে উঠতে পারেনি তাদের আন্দোলনের স্লোগান। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে ২০১৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া কোটাবিরোধী আন্দোলন ৮ এপ্রিল দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তোপের মুখে পড়ে হাসিনা সরকার। ছাত্রদের দাবি মেনে কোটা সংস্কার করে। ওই বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া নিহত এবং ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। সেই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে, দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আন্দোলনের বারুদে আগুন জ্বেলে দেন কবিরা। তাদের কবিতা হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের দ্রোহের স্লোগান, প্রতিবাদের বজ্রকণ্ঠ। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৭০ বা ৮০ বছর আগে লেখা কবিতার লাইন রাজপথে নেমে এসেছিল সান্ত্বনা কিংবা নতুন সূর্যোদয়ের সংবাদ নিয়ে। সন্তানের চিন্তায় অস্থির হওয়া মমতাময়ী মায়ের জন্য শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ডে লিখেছিল, ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?’ দানবের রাইফেল, বুলেট আর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দীপ্ত কণ্ঠে স্লোগান হয়ে জালেমের মসনদ কাঁপিয়েছে কবির কবিতা—‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ। যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবেই তুমি বাংলাদেশ।’ তারা রুখে দাঁড়িয়েছিল বলেই এ দেশে আজকের অনিন্দ্য সুন্দর সকাল এসেছে।
এসব আন্দোলনে হাতের প্ল্যাকার্ড, বিবর্ণ দেয়াল এবং ফেসবুকের ওয়ালে দ্রোহের আগুন নিয়ে জ্বলে উঠেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজ এবং অন্য অনেক কবি।
বুক তাদের বাংলাদেশের হৃদয়
২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১ তারিখ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়, মাদরাসা, পাড়া-মহল্লা, অলি-গলি; এমনকি প্রতিটি ঘরে ঘরে। সরকারের রক্তচক্ষু আর বুলেট উপেক্ষা করে রাস্তায় নামছে মানুষ। আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ সহযোদ্ধার লাশ কাঁধে নিতে নিতে লড়ে যাচ্ছে ছাত্র-জনতা। ছাত্র-জনতার লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। বাতাসে লাশের গন্ধ। লাশের সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছাকাছি। অনিশ্চিত এক পথের যাত্রী বাংলাদেশ। এদিকে হাসিনার নির্বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে দেশের অনেক লেখক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী কিছু বলছেন না। তারা আছেন হাসিনার প্রিয়পাত্র হওয়ার ধান্দায়। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন লেখকই মাঠে নেমেছিলেন মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে। ‘বিক্ষুব্ধ কবি-লেখক সমাজ’ ব্যানারে লেখক ও সাংবাদিক ইমরান মাহফুজসহ আরও কয়েকজন করলেন জুলাই গণহত্যা ও দেশব্যাপী নিপীড়নের প্রতিবাদ। ইমরান মাহফুজ বললেন, ‘আমরা তো হাতে গোনা কিছু লেখক, কবি ও কথাসাহিত্যিক ছিলাম আন্দোলনে। আজও বলব, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে না, তারা লেখক না।’
২ তারিখ জমায়েত হলেন রাজধানীর বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রবেশমুখে। মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করলেন। তারা বললেন, ‘স্বাধীন দেশে এমন নির্মমতা মেনে নেওয়া যায় না। স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে বাস করেও কথা বলতে, লিখতে, দাবি জানাতেও ভয় হয়।’ কর্মসূচিতে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, কবি টোকন ঠাকুর, গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরায়েজী, ইমরান মাহফুজ, কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন, কর্মসূচির অন্যতম সমন্বয়ক লেখক ও সাংবাদিক আবিদ আজম, কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিন, আশরাফ জুয়েল, বকুল আশরাফ, কাজল শাহনেওয়াজ, শিক্ষক ও গবেষক সরোজ মেহেদী, কথাসাহিত্যিক কিঙ্কর আহসানসহ অনেকে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের অনেক তরুণ লেখক ও ইসলামি ধারার কবি-লেখক আন্দোলনের পক্ষে শহরের দেয়াল ও ফেসবুকের ওয়ালে লেখালেখি করেন। প্রতিবাদ জানান।
আন্দোলনে আহত কবি-লেখক
জুলাই আন্দোলনে শিল্পী, আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ মাঠে নামলেও কবি-লেখকদের অবস্থান ছিল হাতে গোনা। এর মধ্যে অনেকে আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন, হয়েছেন শারীরিকভাবে আহত। কেউ করেছেন কারাবরণ, কারও বেঁচে ফেরাই ছিল অবিশ্বাস্য ঘটনা। আন্দোলনে ১৭ জন কবি গুরুতর আহত হন। ময়মনসিংহের কবি হাসান আফিফ ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৮ জুলাই পায়ে গুলিবিদ্ধ হন এবং বেশ কয়েক দিন স্বেচ্ছায় পালিয়ে বেড়ান। হবিগঞ্জের লেখক শাহ হুজাইফা ফেরদৌসকে ছাত্রলীগের পেটুয়া বাহিনী ১৭ জুলাই সায়েন্স ল্যাবে কয়েক দফা পেটায়। ১৫ জুলাই ঢাবির ভিসি চত্বরে ছাত্রলীগের নির্মম হামলার শিকার হন সাতক্ষীরার লেখক ও ঔপন্যাসিক হাসান ইনাম। ভিসি চত্বরে গায়েবানা জানাজায় অংশ নেওয়ার পর কফিন কাঁধে রাজু ভাস্কর্যের দিকে যাওয়ার সময় হামলার শিকার হন সুনামগঞ্জের কবি মাসুক নুর। ১৮ জুলাই ধানমন্ডি-২৭-এ আহত হন বরিশালের কবি সাবরিনা শশী। চট্টগ্রামের লেখক শেরীফ ফারুকী ১৭ জুলাই ছাত্রলীগের হাতে মার খান। ৪ আগস্ট কুমিল্লার দেবিদ্বারে পুলিশি নির্যাতন ও ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন কুমিল্লার লেখক হাসনাত আবদুল্লাহ। লক্ষ্মীপুরের লেখক কাদের মাজহার ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশের টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডে আহত হন। মুন্সিগঞ্জের কবি ইব্রাহিম নিরব ১৮ জুলাই পুলিশি বাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। ১০ দিনের রিমান্ডও দেয় আদালত। আদালতে বসেই হাসিনার পালানোর সংবাদ পান। বরিশালের অনুবাদক তুহিন খানের পায়ে ৪ আগস্ট ছররা গুলি লাগে। ৪ আগস্ট শ্যামলিতে গুলিবিদ্ধ হন বরিশালের লেখক আল নাহিয়ান। পাবনার কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ১৮ জুলাই ও ৪ আগস্ট আহত হন। কুমিল্লার লেখক মোরশেদ আলম হৃদয় ১৮ জুলাই কাজলা থেকে গ্রেপ্তার হন। ১৮ দিন ডিবি অফিসে ছিলেন। ওদের অত্যাচারে হাত-পা এখনও ভাঙা। ৪ আগস্ট কিশোরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে আহত হন কবি চঞ্চল বাশার। নরসিংদীর কবি আকতার জামান ৪ আগস্ট রাতে নরসিংদীর এসপি অফিসে ৪০ মিনিট জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এর আগে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৫ দিন বন্দি ছিলেন কুমিল্লার লেখক হানিফ মোল্লা। সিলেটের কবি সালেহ আহমদ খসরু ৩৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে আহত হন। (সূত্র: ডেইলি স্টার)
প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর প্রাণের কবিতা
আন্দোলন, প্রতিবাদ, দ্রোহ, বিদ্রোহ এবং স্লোগানের কণ্ঠস্বর হয়ে সব কালে, সব দেশে ফিরে আসে কবির কবিতা এবং লেখকের উক্তি। এখনো আন্দোলনে দারাজ কণ্ঠে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’, ‘কাণ্ডারী’ কিংবা ‘কারার ঐ লৌহকপাট’। আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে সজাগ করে ফররুখ আহমদের ‘রাত পোহাবার কত দেরি, পাঞ্জেরী?’ বিদ্রোহী ও বিশ্বাসী মানুষের ধমনিতে আগুন জ্বালিয়ে যায় আল মাহমুদের ‘আমাদের মিছিল’ কবিতা। আন্দোলনের ভাষা হয়ে শহরের জীর্ণ দেয়াল আর ফেসবুকের ওয়াল ছেয়ে যায় শামসুর রাহমানের ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ আর হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ কবিতা’র লাইন—‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবার আকুতি নিয়ে হাজির হয় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও’। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে—‘যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবেই তুমি বাংলাদেশ।’
৭০ কিংবা ৮০ বছর আগের লেখা কবিতা এখনো আন্দোলনের কণ্ঠস্বর। এখনও আন্দোলন-সংগ্রামে সেসব কবিতা উজ্জীবিত করে মানুষকে। মুষ্টিবদ্ধ করে হাত। মাথা করে উঁচু। বুক করে সটান। পাঁজর করে শক্ত। এর মধ্যে মনে পড়ে যায় সৈয়দ শামসুল হকের নূরুলদীনের কথা। নুরুলদীন একদিন ডাক দিয়েছিল, ‘জাগো বাহে, কোনঠে সবাই।’
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




