ফরেন পলিসির কলাম/সৌদি আরব ভুল জায়গায় ঘুষ দিয়েছে

সৌদি আরব বর্তমানে মারাত্মক সংকটে পড়েছে। দেশটির বৈশ্বিক প্রভাব মূলত শীর্ষ তেল উৎপাদক দেশ হিসেবে এর অবস্থান এবং সেই সুবাদে অর্জিত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। অথচ মধ্যপ্রাচ্য এখন বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে পারস্য উপসাগরে সৌদি ট্যাংকারগুলোর চলাচল অবরুদ্ধ রয়েছে। লোহিত সাগরেও সেগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। ড্রোন হামলার পর দেশটির প্রধান তেল পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে সৌদি আরবের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হলো, এর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন এই আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং মনে হচ্ছে এ নিয়ে তাদের খুব একটা মাথাব্যথাও নেই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধ শেষের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য একটি চুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। চুক্তিটি হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রাধান্য এই অঞ্চলে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। তারা যেকোনো আগ্রাসন প্রতিহত করবে, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করবে এবং বন্ধুভাবাপন্ন সরকারগুলোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।
এর বিনিময়ে সৌদি আরব এবং কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ছোট উপসাগরীয় আরব দেশগুলো মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে জায়গা করে দেয়, সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতা করে এবং তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখে। এই ব্যবস্থার কার্যকারিতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গিয়েছিল ১৯৯০-৯১ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ইরাককে কোনো সৌদি তেলক্ষেত্র দখল করতে দেয়নি এবং কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে হটিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান আক্রমণ সেই ব্যবস্থাকে অপূরণীয়ভাবে ভেঙে দিয়েছে। আর সৌদি আরবের কাছে এর কোনো বিকল্পও নেই।
সৌদি তেল শিল্প এখন চতুর্মুখী চাপের মুখে রয়েছে। দেশটির অধিকাংশ সেরা তেলক্ষেত্র ও শোধনাগার পারস্য উপসাগরের কাছাকাছি অবস্থিত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। তবে সৌদির কাছে একটি বিকল্প পরিকল্পনা ছিল। পরিকল্পনাটি হলো, পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন। এটি উপসাগরীয় অঞ্চলকে দেশের অপর প্রান্তে লোহিত সাগরের উপকূলীয় বন্দর ও শোধনাগারগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এ বছর বসন্তকালে সেই বিনিয়োগের সুফল পাওয়া গিয়েছিল। যুদ্ধের আগে এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল পূর্ব দিকে পাঠানো হতো। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার পর সেই পরিমাণ বেড়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়ায়।
কিন্তু গত জুলাইয়ে ইয়েমেনভিত্তিক এবং ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি জাহাজের ওপর লোহিত সাগরে অবরোধ ঘোষণা করে। তারা দক্ষিণ গোলযোগপূর্ণ এলাকা বা বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে। যদিও এর উত্তর দিক দিয়ে সৌদি জাহাজগুলোর বের হওয়ার পথ খোলা রয়েছে, তবে সুয়েজ খাল দিয়ে সুপারট্যাংকারগুলো যেতে পারে না। অথচ সৌদি বহরের প্রায় অর্ধেকই এই সুপারট্যাংকার।
দুর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়ছে না। হুতিরা সম্প্রতি লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা এবং বাব আল-মান্দেবের একটি দ্বীপ দখল করে নিয়েছে। এর ফলে সৌদি জাহাজগুলোতে আক্রমণ করার তাদের ক্ষমতা আরও বেড়ে গেছে। এছাড়া ইরাকে অবস্থিত ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা সৌদি আরবে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের একটি পাম্পিং স্টেশন এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে পাইপলাইনটি পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে। এটি আবার চালু করতে এক মাসের বেশি সময় লাগতে পারে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর রয়টার্সকে বাণিজ্য সূত্র জানায়, সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল বোঝাই কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। একই সপ্তাহে সৌদি আরামকো ইউরোপীয় শোধনাগারগুলোকে জানিয়েছে যে, আগামী কিছুদিন তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। চলতি সপ্তাহে হুতিরা সৌদি আরবের ওপর তাদের আক্রমণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা রিয়াদ এবং এর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়াও অন্যান্য অঞ্চলের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
খবর রয়েছে যে, পাইপলাইনে হামলার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুবার ফোন করেছিলেন। তিনি হুতিদের অগ্রযাত্রা ধীর করতে তাদের ওপর বোমা হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ জানান। কিন্তু হোয়াইট হাউজ সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনে ইয়েমেন সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘হুতিরা আমাদের ফোন করেছিল। তারা আমাদের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না। তারা আমাদের জানিয়েছে যে তারা আমাদের সঙ্গে লড়তে চায় না। তারা চায় না আমরা তাদের পেছনে লাগি। আমাদের জড়ানো ছাড়াই তারা থাকতে পছন্দ করে এবং অধিকাংশ জাহাজকে তারা যেতে দিচ্ছে। শুধু একটা দেশকে তারা খুব একটা পছন্দ করছে না।’
এটি হয় ট্রাম্পের কোনো কল্পনাপ্রসূত বক্তব্য, অথবা এমন কোনো কথোপকথন যেখানে তিনি হুতিদের কথাকে সত্য বলে ধরে নিয়েছেন। রিয়াদের জন্য এর যেকোনো একটিই ভয়াবহ।
সৌদির জন্য বিষয়টি অত্যন্ত হতাশার। কারণ, ট্রাম্প ও তাঁর জামাতা এবং আন্তর্জাতিক দূত জারেড কুশনারকে তারা বছরের পর বছর ধরে ঘুষ দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সম্পর্ক বরাবরই লেনদেনভিত্তিক। তবে তা ছিল জাতীয় নিরাপত্তা ও তেলের মতো বিষয়ে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়।
সৌদি আরব মার্কিন গণতন্ত্রের অবক্ষয় এবং দুর্নীতিকে সানন্দেই গ্রহণ করেছিল বলে মনে হয়। তারা নিজেদের স্বার্থে এই অর্থ ব্যবহার করেছে। ২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তারা তাঁর হোটেলগুলোতে প্রচুর অর্থ খরচ করতে শুরু করে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তাঁর প্রথম বিদেশ সফর করেছিলেন সৌদি আরবে। সে সময় সৌদির পক্ষ থেকে তাঁকে অঢেল তোষামোদ করা হয়।
শুরুতে এই বিনিয়োগ লাভজনক বলেই মনে হয়েছিল। সেই সফরে ট্রাম্প সৌদির সঙ্গে ১১ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ২০১৮ সালে যখন মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন, তখন কুশনার সম্ভবত সৌদি রাজপরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। খবর রয়েছে যে, যুবরাজ তখন গর্ব করে বলেছিলেন, কুশনার তাঁর ‘পকেটে’ আছেন।
ওই বছরের শেষের দিকে ট্রাম্প ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন, যা সৌদি আরব অনুমোদন করে। এছাড়া জামাল খাসোগি হত্যার নির্দেশ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিজেই দিয়েছিলেন—সিআইএর এমন মূল্যায়নও ট্রাম্প প্রকাশ্যে খারিজ করে দেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের পর সৌদি আরব নিজেদের বিনিয়োগ দ্বিগুণ করে। সৌদি সমর্থিত ‘লিভ গলফ’ টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য ট্রাম্পের মালিকানাধীন কোর্সগুলোকে ভাড়া নেয়। সৌদি রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ কোম্পানিগুলো ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের সঙ্গে রিয়েল এস্টেট চুক্তি করে। তারা ট্রাম্পকে লাইসেন্স ফি বাবদ কোটি কোটি ডলার দেয় এবং ভবিষ্যতে আরও বড় অঙ্কের অর্থের প্রতিশ্রুতি দেয়।
সবচেয়ে লজ্জাজনক ঘটনা হলো, সৌদি সরকার কুশনারের নতুন বিনিয়োগ সংস্থাকে ২০০ কোটি ডলার দেয়। সৌদির সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের ম্যানেজাররা এতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। একটি ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ বা যাচাই-বাছাই প্রতিবেদনে কুশনারের সংস্থাকে ‘সব দিক থেকেই অসন্তোষজনক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ওই চুক্তিতে অস্বাভাবিক রকমের বেশি ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর ফলে ফান্ডের পারফরম্যান্স যেমনই হোক না কেন, কুশনার ও তাঁর সহযোগীরা প্রতি বছর সৌদিদের কাছ থেকে আড়াই কোটি ডলার পকেটে ভরতেন। তা সত্ত্বেও মোহাম্মদ বিন সালমান সেই চুক্তি সম্পন্ন করেছিলেন।
ট্রাম্প যখন আবার প্রেসিডেন্ট হলেন এবং গাজা সংকট সমাধানে কুশনার যখন মার্কিন কূটনীতির নেতৃত্ব দিলেন, তখন মনে হয়েছিল সেই অর্থ সঠিকভাবে বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু এরপরই ট্রাম্প ইরান আক্রমণ করে বসেন।
সৌদি আরব জনসমক্ষে এই সংঘাত থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। তবে গোপনে তারা ট্রাম্পকে ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের পক্ষে চাপ দিতে থাকে। পরিস্থিতি যখন বুঝতে পারে যে তা হচ্ছে না, তখন তারা যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার পক্ষে অবস্থান নেয়।
এই গ্রীষ্মে যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক ভেস্তে গেল এবং ট্রাম্প যখন ইরানে আবারও বোমা হামলা চালানোর চেষ্টা করলেন, তখন ইরান ইয়েমেন ও ইরাকে তাদের অনুগত মিলিশিয়াদের সক্রিয় করে তুলল। যুদ্ধের শুরুতে এই গোষ্ঠীগুলোকে তারা আপাতদৃষ্টিতে সংযত রেখেছিল। আর এখন সেই গোষ্ঠীগুলোই বহুমুখী আক্রমণ চালিয়ে সৌদি আরবকে কোণঠাসা করে ফেলেছে।
সৌদির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছে: ট্রাম্প নিজের ইচ্ছায় একটা যুদ্ধ শুরু করে সৌদি আরবের ওপর হামলা এবং তাদের জাহাজের চলাচলে বিধিনিষেধ ডেকে এনেছেন। এরপর কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে অর্থাৎ স্থল অভিযান ও প্রকৃত শাসন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তিনি পিছু হটেছেন। এর পরিবর্তে তিনি কূটনীতির আশ্রয় নেন, যা ব্যর্থ হয় এবং সৌদি আরবের ওপর হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
যেসব শক্তির বিরুদ্ধে তারা নিজ শক্তিতে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না, সেই শক্তির হামলায় জর্জরিত সৌদি আরব এখন মরিয়া হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাচ্ছে। অথচ তাদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার এই সমস্যার সমাধান করতে পারছে না।
হুতিদের হামলার জবাবে সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে বোমা হামলা চালাচ্ছে। অথচ ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে তারা বছরের পর বছর ধরে ইয়েমেনে বোমা হামলা চালিয়েছে এবং স্থানীয় সরকারকে সমর্থন দিয়েছে, তবুও হুতিদের দমন করতে পারেনি। সৌদি আরবের বড় সামরিক বাজেট রয়েছে। কিন্তু কাঠামোগতভাবে তাদের সশস্ত্র বাহিনী দুর্বল এবং তাদের পারফরম্যান্সের রেকর্ডও খারাপ। মার্কিন নির্ভরতার কারণেই মূলত তাদের এই দুর্বলতা।
হুতিদের অগ্রগতির জবাবে ট্রাম্পের প্রথম প্রতিক্রিয়াটি ছিল পরিচিত ভঙ্গিতে: সমস্যাটিকে অস্বীকার করা এবং অন্যদেরও তা অস্বীকার করতে বাধ্য করা। মূল মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা যখন শাসন পরিবর্তন বা ট্রাম্পের প্রথম দাবি অনুযায়ী ‘বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ’ অর্জনে ব্যর্থ হয়, তখন থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে এটিই ছিল তাঁর প্রধান কৌশল।
যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের কৌশল পরিষ্কার: বড় হুমকি ও জমকালো ঘোষণা দেওয়া, প্রাণহানি এড়াতে আকাশপথে অভিযান চালানো এবং হুমকি ও বোমাবাজি ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত পিছু হটে মিথ্যা বলা। ইরানের বিরুদ্ধে এই নীতি ব্যর্থ হচ্ছে, তবে হুতিদের বিরুদ্ধে তা আগেই ব্যর্থ হয়েছিল।
২০২৫ সালে হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছিল। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা এই কাজ করছে বলে দাবি করে। ওই বছরের মার্চ মাসে ট্রাম্প ইয়েমেনে বিমান হামলা শুরু করেন। নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ‘কঠোর’ পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র কেবল আকাশপথেই অভিযান চালায়। কিন্তু এর দেড় মাস পর দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। প্রায় ১০০ কোটি ডলারের গোলাবারুদ খরচ করার পর, কয়েকটি যুদ্ধবিমান হারানোর পর এবং কিছু লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করলেও হুতিদের হামলা থামাতে ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটে। ট্রাম্প প্রশাসনের অদক্ষতার এক প্রদর্শনী হিসেবে তারা ‘সিগন্যাল’ অ্যাপের মাধ্যমে যুদ্ধের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করে দেয়। এরপরও তারা দাবি করে যে অভিযানটি দারুণ সফল হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব এক কঠিন অবস্থানে পড়েছে। নৌপথ এবং পাইপলাইন রক্ষা করার চেয়ে সেগুলোতে আক্রমণ করা অনেক সহজ। ওমানের উপকূলের কাছাকাছি ট্যাংকার থেকে ট্যাংকারে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে সৌদি আরব ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া তেলের সমস্ত পরিমাণের বিকল্প এভাবে পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সৌদি আরবের ট্রাম্প-কুশনার বিনিয়োগের একমাত্র বাস্তব ইতিবাচক দিক হলো একটি পারমাণবিক চুক্তি। এই চুক্তি সৌদিকে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের কঠোর নজরদারি ছাড়াই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুবিধা দেবে।proliferation বা বিস্তার রোধের ঝুঁকি এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের যুক্তিকে দুর্বল করে দেওয়ার কারণে অতীতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই এই কাজটি করতে রাজি হননি।
কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট যাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সৌদি অর্থ জমা পড়েছে—তিনি এই কাজটি করেছেন। হোয়াইট হাউজ সম্প্রতি এই চুক্তিটি কংগ্রেসে পাঠিয়েছে। সেখানে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি উভয় কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং মূলত রাবার স্ট্যাম্পের মতো কাজ করেছে।
তা সত্ত্বেও সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক সুবিধা নাও পেতে পারে। নিজেদের দুর্বলতা এবং দুর্নীতির সমালোচনাকে পাশ কাটাতে ট্রাম্প বলেছেন যে, এই চুক্তি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু সৌদি আরব তা করবে না, অন্তত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত না হলে তো নয়ই, যা ইসরায়েল হতে দেবে না।
আর যদি এই চুক্তি পাস হয়েও যায়, তবে ডেমোক্র্যাটরা ভবিষ্যতে যখনই ক্ষমতায় আসবে, চুক্তিটি বাতিল করতে পারে। শুধু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণেই নয়, বরং ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সহযোগীরা দুর্নীতির মাধ্যমে এর থেকে লাভবান হওয়ার কারণেও তারা এটি করতে পারে।
সৌদি আরব অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে ওয়াশিংটনে লবিং করার জন্যও তাদের হাতে কম অর্থ থাকবে। কারণ এই চুক্তি ঠেকানোর জন্য লবিং করা দরকার।
মনে হচ্ছে সৌদি আরব বিশ্বাস করেছিল যে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত মার্কিন সরকার তাদের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করবে। তারা ভেবেছিল কোনো ধরনের সততা, নীতি, আইন বা মানবাধিকার ছাড়াই তারা সক্ষমতা এবং তুলনামূলক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে ‘ঘুষখোর’ মানেই হলো আত্মকেন্দ্রিক এবং দুর্বল।
ঘুষখোর নেতারা স্বভাবগতভাবেই দায়িত্বজ্ঞানহীন হন। ফার্দিনান্দ মার্কোস, সাদ্দাম হোসেন এবং মোবুতু সেসে সেকো—অথবা অতি সম্প্রতি ভিক্তর ওরবানের মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত শোচনীয় রেকর্ড রয়েছে। নিজ দেশের স্বার্থ হোক বা অন্যের, সবক্ষেত্রেই তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন।
আধুনিক যুগে বিশ্বের প্রধান সামরিক শক্তির কেন্দ্রে এমন ঘটনা এর আগে আমরা দেখিনি। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার দিকে এই পতন কোনো অংশে কম ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হয়নি। একজন ঘুষখোর নেতা হয়তো আপনার মনের মতো কথাই বলবেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি তা বাস্তবায়ন করতে পারবেন।
দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারা নিয়ম ও আইন ভাঙতে পারদর্শী, কিন্তু অন্য কোনো কাজে তাদের দক্ষতা নেই বললেই চলে। সৌদি আরব ভুলভাবে বিশ্বাস করেছিল যে ট্রাম্পের ধ্বংসযজ্ঞ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং ঘুষ দিয়ে কেনা ওয়াশিংটন তাদের সেবা করে যাবে।
লেখক পরিচিতি
নিকোলাস গ্রসম্যান যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক, ‘আর্ক ডিজিটাল’-এর সম্পাদক এবং ‘ড্রোনস অ্যান্ড টেররিজম’ বইয়ের লেখক।

