logo
Advertisement

আলজাজিরার কলাম/গাজায় মানবিকতা শুধু ভেঙেই পড়ছে না, বরং কেনাবেচা ও আপস করা হচ্ছে

অমিতাভ বেহার
গাজায় মানবিকতা শুধু ভেঙেই পড়ছে না, বরং কেনাবেচা ও আপস করা হচ্ছে
গাজার দেইর আল-বালাহতে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় রাফাহতে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত রেড ক্রিসেন্টের আট কর্মীর মরদেহ। ছবি: সংগৃহীত

আজ আমরা যখন বিশ্ব মানবিক দিবস পালন করছি, তখন আমাদের অবশ্যই মানবিকতার অবস্থা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা উচিত। মানবিক কাজ সবসময় এই যৌথ ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল যে, যুদ্ধের মধ্যেও এমন কিছু সীমারেখা থাকবে যা কখনো অতিক্রম করা উচিত নয়।

Advertisement

প্রজন্ম ধরে, আমাদের আন্তর্জাতিক চুক্তি ছিল এর আওতায় ক্ষুধার্থ শিশুকে রক্ষা করা বা অসুস্থ ও আহতদের চিকিৎসা করা মৌলিক আইনি অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আজ এই আইনগুলোর প্রকৃত অর্থ হারিয়ে গেছে।

অনেক সরকারই নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে ভূমিকা রাখছে না, অথচ এসব আইন তৈরিতে তারাই সাহায্য করেছিল। কেউ কেউ খোলামেলাভাবে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করছে। অন্যরা এটি বেছে বেছে প্রয়োগ করছে। তাদের প্রতিপক্ষ যখন লঙ্ঘন করে তখন নিন্দা জানাচ্ছে, অথচ তাদের মিত্ররা যখন একই কাজ করে তখন তা সহ্য করছে। আরও অনেকেই যখন নিন্দা জানানো এবং পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তখন নীরব থাকছে।

সরকারগুলো যখন মনে করে যে তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক এবং অভ্যন্তরীণ স্বার্থগুলো তাদের আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন মানবিক ব্যবস্থা সংকুচিত এবং কলুষিত হয়ে পড়ে। আইন প্রয়োগ অসংগত হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত বেসামরিক হতাহতের ঘটনা মেনে নেওয়া নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

আজ বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে লালন করা হচ্ছে। অপরাধীরা আমাদের সবাইকে নিরাপদ রাখার জন্য বিদ্যমান আইনগুলো ভঙ্গ করতে আরও বেশি সাহস পাচ্ছে, কারণ তারা জানে যে তাদের জবাবদিহি করতে হবে না। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ মানবিক সংকটগুলো শূন্য থেকে তৈরি হয় না। বরং এই ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রত্যক্ষ ফল।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, বেসামরিক নাগরিক এবং সহায়তাকর্মীদের সুরক্ষাকে এখন আর সার্বজনীন বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, বরং এটি একটি পণ্যের মতো। এটা এমন কিছু যা নিয়ে দরদাম করা যায়, আটকে রাখা যায় বা বেছে বেছে প্রয়োগ করা যায়। সুরক্ষা তখন একটি রাজনৈতিক বিনিয়োগ হয়ে ওঠে যা রাজনৈতিক মুনাফা দেয়।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে অন্তত এক হাজার সহায়তাকর্মী নিহত হয়েছেন, যা আগের তিন বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। ২০২৫ সালে মানবিক কার্যক্রমের ওপর শত শত হামলা হয়েছে এবং ৩৫০ জন সহায়তাকর্মী নিহত, ৩২২ জন আহত, ২৩৫ জন অপহৃত এবং ২৮০ জন আটক হয়েছেন।

অক্সফামে আমরা আট বছরে আমাদের পাঁচজন সহকর্মী এবং অংশীদার কর্মী হারিয়েছি এবং আমাদের ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ অন্তত ১ হাজার ২০০ বার নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়েছেন।

সহায়তাকর্মীদের হত্যাকাণ্ড প্রায়শই এমন সব জায়গায় ঘটে যেখানে যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে সেই সব সরকারই অস্ত্র, অর্থ বা নিরাপত্তা দিচ্ছে যারা আসলে একই সাথে মানবিক সহায়তার জন্যও অর্থায়ন করছে।

কিন্তু সুরক্ষার অভাবই আজ মানবিক কাজের একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। প্রায়শই রাষ্ট্রগুলো অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ করে যা সহায়তাকর্মীদের তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়।

গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ অক্সফাম এবং অন্য ৩৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বলেছিল যে গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবিক ত্রাণ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হলে তাদের কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্যসহ বিভিন্ন তথ্য হস্তান্তর করতে হবে। এই দাবিগুলো আমাদের সহকর্মীদের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ছিল। ৩৭টি সংস্থাই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়।

ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ইচ্ছাকে শেষ করতে পারেনি কারণ আমরা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে আমাদের নিবন্ধনের কারণে আইনগতভাবে কাজ করার অধিকারী। কিন্তু এটি আমাদের কাজকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে, যেহেতু আমাদের কোনো পণ্য ভেতরে আনার অনুমতি নেই এবং আমরা স্থানীয় পণ্যের ওপর নির্ভর করছি, যা যুদ্ধ ও সংকটের কারণে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।

মানবিক কাজ ক্রমাগত কমতে থাকা তহবিলের কারণেও হুমকির মুখে পড়েছে। এই বছর, জি৭-ভুক্ত দেশগুলো ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাহায্য কাটছাঁট করেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে তাদের উন্নয়ন সহায়তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস করেছে। এটি এমন এক সময়ে করা হলো যখন মানবিক চাহিদাগুলো আরও খারাপ হচ্ছে, যেমন ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো রেকর্ডের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হচ্ছে, অথবা সুদানে মানুষ দুর্ভিক্ষের কারণে মারা যাচ্ছে।

যুদ্ধ বা সংঘাতের সময়ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সবার জন্য বাধ্যতামূলক। বেসামরিক মানুষকে নিরাপদ রাখতে হবে এবং তাদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে দিতে হবে। মানুষকে অনাহারে রাখা বা খাবার-পানি বন্ধ করে দেওয়াকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে, ত্রাণকর্মী, হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, স্কুল ও আশ্রয়কেন্দ্রের মতো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা করা নিষিদ্ধ।

মানবিক সহায়তাকর্মীদের ওপর প্রতিটি হামলার জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত শুরু করা উচিত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে বিচার নিশ্চিত করা উচিত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবে (২৭৩০) এটাই বলা আছে। আমাদের সেই নীতিগুলোর প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনা দরকার যা আমাদের সবাইকে রক্ষা করে।

বিশ্ব মানবিক দিবস হলো সেইসব মানবিক কর্মীদের স্মরণ করার দিন যারা অন্যের সেবা করতে গিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু জবাবদিহিতা এবং পদক্ষেপ ছাড়া কেবল স্মরণ করা আসলে অন্যায়কে মেনে নেওয়ারই শামিল। আমাদের অবশ্যই আরও ভালো কিছু করতে হবে।


লেখক পরিচিত

অমিতাভ বেহার অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]