logo

আর্ট অব প্রফেশনালিজম: শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, একটি দায়িত্ববোধের নাম

আর্ট অব প্রফেশনালিজম: শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, একটি দায়িত্ববোধের নাম
শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক। ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

শিক্ষকতা শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ কিংবা খাতা মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো কাজ নয়। একজন শিক্ষক একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক, সহকর্মীর সহযাত্রী, প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং সমাজের একজন আদর্শ নাগরিক। তাই একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন পেশাদার শিক্ষক হয়ে ওঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেশাদারত্বের সঙ্গে যুক্ত থাকে দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ, আচরণ, পারস্পরিক সম্মান, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নতুন শিক্ষক যখন কর্মজীবন শুরু করেন, তখন তার সামনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ আসে। পাঠদান, গবেষণা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি, সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন, মতপার্থক্য মোকাবিলা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া-সবকিছুই তার পেশাগত জীবনের অংশ। এসব ক্ষেত্রে শুধু বিষয়জ্ঞান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পেশাগত আচরণ, দায়িত্ববোধ, মূল্যবোধ ও পরিপক্বতার সমন্বয়।

শিক্ষকের প্রথম পরিচয়, তিনি একজন পেশাজীবী

পেশাদারত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের দায়িত্বকে শুধু চাকরি হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলেন। তার কথা, আচরণ, সময়ানুবর্তিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং অন্যদের প্রতি সম্মান-সবকিছুই শিক্ষার্থীদের কাছে এক ধরনের নীরব শিক্ষা হয়ে ওঠে।

একজন শিক্ষক যদি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে না আসেন, শিক্ষার্থীর কথা না শোনেন, সহকর্মীকে অসম্মান করেন কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন, তাহলে তিনি শুধু একটি নিয়ম ভঙ্গ করছেন না, বরং শিক্ষার্থীদের সামনে একটি ভুল পেশাগত সংস্কৃতির উদাহরণ তৈরি করছেন। বিপরীতে, একজন শিক্ষক যখন দায়িত্বশীল, সময়নিষ্ঠ, বিনয়ী, ন্যায়পরায়ণ ও সহানুভূতিশীল আচরণ করেন, তখন তার আচরণই শিক্ষার্থীর জন্য বাস্তব শিক্ষা হয়ে ওঠে।

নেতৃত্ব মানে পদ নয়, প্রভাব সৃষ্টি করা

বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব মানেই কোনো প্রশাসনিক পদ বা চেয়ার নয়। একজন শিক্ষক কোনো পদে না থেকেও নেতৃত্ব দিতে পারেন। প্রকৃত নেতৃত্বের ভিত্তি হলো দক্ষতা, সহযোগিতা, আস্থা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। অংশীদারত্বমূলক নেতৃত্বে ব্যক্তি একা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন না; বরং সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করেন এবং সম্মিলিতভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেন।

একজন কার্যকর শিক্ষক ও একাডেমিক নেতাকে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করতে হয়, আমরা এখন কোথায় আছি? আমরা কোথায় যেতে চাই? এবং সেখানে কীভাবে পৌঁছাব? এই প্রশ্নগুলো শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ প্রশাসনের জন্য নয়; প্রতিটি শিক্ষক, বিভাগ ও একাডেমিক ইউনিটের জন্যও প্রযোজ্য। নিজের কোর্স, শিক্ষার্থীদের ফলাফল, গবেষণা, বিভাগীয় কার্যক্রম কিংবা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ- প্রতিটি ক্ষেত্রেই কৌশলগত চিন্তার প্রয়োজন।

পরিবর্তনকে ভয় নয়, নেতৃত্ব দিতে হবে

উচ্চশিক্ষার জগৎ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নতুন শিক্ষনপদ্ধতি, গবেষণার ধরন এবং বিভিন্ন নীতিমালা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা দ্বিধা থাকে। কেউ মনে করেন, তিনি হয়তো নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন না; কেউ আশঙ্কা করেন যে পরিবর্তনের ফলে তার নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে; আবার কেউ পরিবর্তনের ধারাবাহিক চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

একজন পেশাদার শিক্ষকের দায়িত্ব হলো পরিবর্তনকে অন্ধভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করে সেটিকে বোঝা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া এবং ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা। পরিবর্তন ব্যবস্থাপনায় সুস্পষ্ট যোগাযোগ, সহকর্মীদের সম্পৃক্ততা এবং ছোট ছোট সাফল্যের মাধ্যমে আস্থা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বন্দ্ব থাকবেই, কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট করা যাবে না

যেখানে মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন, সেখানে মতপার্থক্য থাকবেই। বিশ্ববিদ্যালয়ও এর ব্যতিক্রম নয়। কাজ, সিদ্ধান্ত, দায়িত্ব বণ্টন কিংবা পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ স্বাভাবিক। তবে মতপার্থক্যকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অহংকার কিংবা সম্পর্ক নষ্ট করার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কখনোই পেশাদারিত্বের পরিচয় নয়।

সব দ্বন্দ্ব ক্ষতিকর নয়। বরং কাজসংক্রান্ত মতপার্থক্য অনেক সময় একটি সিদ্ধান্তকে আরও উন্নত করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মতপার্থক্য কীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে।

একজন পেশাদার শিক্ষককে জানতে হবে কখন নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হবে, কখন অন্যের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং কখন সমঝোতার পথ খুঁজে নিতে হবে। সক্রিয়ভাবে শোনা, সহমর্মিতা, স্পষ্ট যোগাযোগ, দৃঢ় কিন্তু শালীন বক্তব্য এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা - এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের পেশাগত পরিবেশেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভালো শিক্ষক আর ভালো বক্তার মধ্যে পার্থক্য আছে

একজন শিক্ষক অনেক জ্ঞানী হতে পারেন, চমৎকার বক্তাও হতে পারেন; কিন্তু একজন শিক্ষককে জানতে হবে শিক্ষার্থীকে কীভাবে সম্মান করতে হয়, কীভাবে তার কথা শুনতে হয় এবং কীভাবে তাকে উৎসাহিত করতে হয়।

শিক্ষার্থীর সঙ্গে কার্যকর সম্পর্কের ভিত্তি হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা, সহমর্মিতা, গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরামর্শ এবং প্রত্যাশার স্বচ্ছতা। শিক্ষার্থী ভুল করলে তাকে ভুলটি বুঝিয়ে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া একজন পেশাদার শিক্ষকের দায়িত্ব। একইভাবে, কোনো শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে বাড়তি সুবিধা দেওয়া কিংবা অপছন্দের কারণে বঞ্চিত করা শিক্ষকের নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

শিক্ষার্থীর নাম ধরে ডাকা, প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেওয়া, প্রশ্ন করার জন্য কাউকে উপহাস না করা, স্থানীয় ও বাস্তব উদাহরণ ব্যবহার করা এবং সময়মতো শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হওয়া - এসব ছোট ছোট আচরণ শিক্ষার্থীর কাছে একজন শিক্ষকের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যা করেন, শিক্ষার্থী তা-ই শেখে

একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সময়ানুবর্তিতা শেখাতে পারেন; কিন্তু তিনি নিজেই যদি নিয়মিত দেরি করেন, তাহলে তার কথার চেয়ে তার আচরণই বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একইভাবে, শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর মতামতকে সম্মান করেন, শিক্ষার্থীও অন্যের মতামতকে সম্মান করতে শেখে। শিক্ষক যদি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন, শিক্ষার্থীও ভুল থেকে শেখার সাহস পায়।

তাই শিক্ষকতা মূলত আদর্শ আচরণের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার একটি পেশা। শিক্ষক যা বলেন তার চেয়ে তিনি কী করেন - অনেক সময় সেটিই শিক্ষার্থীর ওপর বেশি গভীর প্রভাব ফেলে।

পেশাদারত্বের আরেক নাম শিষ্টাচার

পেশাগত শিষ্টাচারকে অনেকেই শুধু পোশাক, অভিবাদন কিংবা আনুষ্ঠানিক আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। একজন শিক্ষক তার পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং দেশেরও প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই তার দৈনন্দিন আচরণের মধ্যেই পেশাগত পরিচয় প্রকাশ পায়।

অফিসে প্রবেশের আগে দরজায় কড়া নাড়া, সহকর্মীকে সম্মানজনকভাবে সম্বোধন করা, যৌথ কর্মপরিসর পরিচ্ছন্ন রাখা, সময়ের মূল্য দেওয়া এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পেশাগত সংবেদনশীলতা বজায় রাখা-এসবই একজন শিক্ষকের পেশাগত আচরণের অংশ।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন ভদ্রতা দুর্বলতা নয়। বরং ক্ষমতা বা পদমর্যাদা থাকা সত্ত্বেও অন্যকে সম্মান করতে পারা পরিণত পেশাদারিত্বের অন্যতম লক্ষণ।

চাপের মধ্যেও নিজেকে সামলানো জরুরি

শিক্ষকতার পেশায় মানসিক চাপ কম নয়। শ্রেণিকক্ষের কাজ, পরীক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, শিক্ষার্থীদের সমস্যা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়-সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক আবেগের বশবর্তী না হয়ে কিছুটা থামা, গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। একজন পেশাদার শিক্ষক শুধু অন্যকে পরিচালনা করেন না; তিনি নিজেকেও পরিচালনা করতে শেখেন।

শেষ কথা: পেশাদারত্ব একটি দৈনন্দিন অনুশীলন

পেশাদারত্ব কোনো প্রশিক্ষণ শেষে অর্জিত একটি সনদ নয়। এটি প্রতিদিনের আচরণে প্রকাশ পায়। শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমরা কীভাবে কথা বলছি, সহকর্মীর মতামত কীভাবে গ্রহণ করছি, দায়িত্ব কতটা সময়মতো পালন করছি, মতবিরোধ কীভাবে সমাধান করছি, পরিবর্তনকে কীভাবে গ্রহণ করছি এবং প্রতিষ্ঠানের বাইরে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করছি - প্রতিটি মুহূর্তেই পেশাদারত্বের পরীক্ষা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ভবন, শ্রেণিকক্ষ, পাঠ্যক্রম কিংবা পরীক্ষার সমষ্টি নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয় তার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মীদের দৈনন্দিন আচরণের মধ্য দিয়ে। তাই উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের আলোচনায় অবকাঠামো, প্রযুক্তি, গবেষণা ও পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি পেশাগত সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

নতুন শিক্ষক হোন কিংবা অভিজ্ঞ অধ্যাপক- সবার জন্যই প্রশ্নটি একই: আমি কি শুধু একজন শিক্ষক, নাকি এমন একজন পেশাদার শিক্ষক, যার আচরণ দেখে একজন শিক্ষার্থী শিখতে পারে কীভাবে একজন ভালো মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং সত্যিকারের পেশাজীবী হতে হয়?

কারণ শেষ পর্যন্ত একজন শিক্ষক কী পড়িয়েছেন, তা শিক্ষার্থীরা হয়তো কোনো একসময় ভুলে যেতে পারে; কিন্তু একজন শিক্ষক কীভাবে আচরণ করেছেন, কীভাবে মানুষকে সম্মান করেছেন, কীভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কীভাবে সংকট মোকাবিলা করেছেন-সেটি শিক্ষার্থীর মনে সারাজীবন থেকে যায়।

‘পেশাদারত্ব কোনো গন্তব্য নয়; এটি প্রতিদিনের অনুশীলন।’ এই দর্শনটিই সম্ভবত একজন আদর্শ শিক্ষকের পেশাগত জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

লেখক: ড. ফুয়াদ হোসেন, ডিন, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।