আন্তর্জাতিক যুব দিবস/সময় কম, সম্ভাবনা বিশাল

১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১২ আগস্টকে আন্তর্জাতিক যুব দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। একটি বিশ্বাস থেকে দিয়েছিল যে—তরুণরা ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকা প্রজন্ম নয়, তারাই আজকের পরিবর্তনের কারিগর। ছাব্বিশ বছর পর সেই বিশ্বাসটি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
তরুণ—আপনার হাতে যে সময়টুকু আছে, সেটাই আপনার সবচেয়ে বড় পুঁজি। বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ চিরস্থায়ী নয়—কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে, আপনি যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যে দক্ষতা অর্জন করছেন, যে সাহস নিয়ে নতুন কিছু শুরু করছেন, সেটাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ে দেবে। ব্যর্থতাকে ভয় পাবেন না; দেশের গণ্ডিতে নিজেকে সীমিত করবেন না—আপনি বিশ্বের ১৮০ কোটি তরুণেরই অংশ, আর বিশ্বের সব কিছুতেই আপনার সমান অধিকার আছে। শুধু মনে রাখতে হবে, একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতি তাদেরই পুরস্কৃত করে, যারা শেখা থামায় না, চেষ্টায় ঘাটতি রাখে না। ফ্রিল্যান্সিং হোক, স্টার্টআপ হোক বা চাকরি—নিজের দক্ষতাকে প্রতিদিন শাণিত রাখুন। কারণ, আগামীকালের বাজার আজকের চেয়ে ভিন্ন হবে।
তবে শুধু তরুণদের ইচ্ছাশক্তিতে এই রূপান্তর সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারকদের কাছে আজকের আহ্বান স্পষ্ট—সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। প্রতিবছর শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়া লাখো তরুণের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হলে শিক্ষার সব বিনিয়োগই ব্যর্থ হয়ে যাবে। বাজেটে ঘোষিত স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তা তহবিল যেন কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে সহজ শর্তে ছোট ও নতুন উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আহরণে গতি আনতে হবে দ্রুত। কারণ ধীরগতির অর্থনীতি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু কাঠামো নয়, বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরিত করতে হবে।
এই যাত্রায় শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে দূরত্ব ঘোচানো সবচেয়ে জরুরি কাজের একটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম শিল্পের চাহিদার সঙ্গে তাল না মেলালে একদিকে শিক্ষিত তরুণ বেকার থাকবে, অন্যদিকে কারখানায় দক্ষ জনবলের সংকট থেকেই যাবে। পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শিল্পখাতের সরাসরি অংশগ্রহণ, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ এবং ক্যাম্পাসে শিল্প-পেশাজীবীদের নিয়মিত উপস্থিতি—এই তিনটি অভ্যাসকে ব্যতিক্রম নয়, নিয়মে পরিণত করতে হবে। ব্যাংকিং খাতেও এমন উদ্যোগের দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে প্রাইম ব্যাংকের ‘প্রাইমএকাডেমিয়া’ প্ল্যাটফর্মের অধীন ‘এমপাওয়ারিং ইয়ুথ’ কর্মসূচি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের পেশাজীবীদের সরাসরি সংযুক্ত করছে, আর্থিক সাক্ষরতা, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও মক ইন্টারভিউয়ের মতো বাস্তবভিত্তিক অনুশীলনের মাধ্যমে, এমন মডেলগুলো আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।
জনমিতিক লভ্যাংশ একটি জাতির জীবনে একবারই আসে। বাংলাদেশের জন্য সেই জানালা এখনো খোলা, কিন্তু চিরকাল খোলা থাকবে না। তরুণের সাহস, নীতিনির্ধারকের দূরদর্শিতা আর শিল্প-একাডেমিয়ার হাত ধরাধরি করে চলা—এই তিনে মিলেই তৈরি হতে পারে বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।
লেখক: ব্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক
.png)


