উচ্চশিক্ষায় স্কিল গ্যাপ ও কারিকুলামের সংকট: গুটি আমের বীজে ফজলি আম প্রত্যাশা করা যায় না

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বাড়ছে; অন্যদিকে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি এবং কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে শিক্ষার অসামঞ্জস্য। ফলে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে- আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি সত্যিই ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে?
বর্তমান বাস্তবতা বলছে, সমস্যা শুধু চাকরির নয়, সমস্যা দক্ষতার। চাকরিদাতা আর চাকরিপ্রার্থী যেন বিপরীত মেরুতে ধাবমান। ফলে ক্রমেই তাদের দূরত্ব বাড়ছেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, কিন্তু চাকরিদাতারা বলছেন- প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৬ শতাংশ নিয়োগদাতা প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পান না (১৯ মে, ২০২৪)। এটি শিক্ষা ও চাকরির বাজারের মধ্যে বড় ধরনের দক্ষতা ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
এই সংকটের মূল কারণগুলোর একটি হলো আমাদের পুরোনো ও মুখস্থনির্ভর কারিকুলাম। এখনও বাংলাদেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা মানে- নোট মুখস্থ করা, পরীক্ষায় লিখে আসা এবং ভালো জিপিএ অর্জন করা। অথচ ২১ শতকের বিশ্বে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন critical thinking, communication skill, creativity, teamwork, problem solving, adaptability এবং digital competency.
আজকের পৃথিবী শুধু তথ্য জানা মানুষ চায় না। বরং তথ্য ব্যবহার করতে পারা মানুষ চায়। এখানেই কারিকুলামের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ কারিকুলামই একটি শিক্ষাব্যবস্থার ‘Master Blueprint’. কারিকুলাম নির্ধারণ করে একজন শিক্ষার্থী কী শিখবে, কীভাবে শিখবে এবং শেষ পর্যন্ত সে কেমন দক্ষতা অর্জন করবে। সহজভাবে- কারিকুলাম হলো বীজ, আর দক্ষতা হলো ফসল।
গুটি আমের বীজে যেমন কখনো ফজলি আম প্রত্যাশা করা যায় না, তেমনি দুর্বল, ব্যাকডেটেড ও মুখস্থনির্ভর কারিকুলাম দিয়ে কখনোই ২১ শতকের চাহিদাসম্পন্ন দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা সম্ভব নয়। যদি কারিকুলামে সৃজনশীলতা না থাকে, তাহলে সৃজনশীল মানুষ কোথা থেকে আসবে? যদি সেখানে গবেষণা, উদ্ভাবন, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গা না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা মোকাবিলা করবে কীভাবে?
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় একটি সমস্যা হলো এখানে শিক্ষার্থীরা ‘কী’ জানে সেটি যাচাই করা হয়; কিন্তু ‘কেন’ জানে ও ‘কীভাবে’ প্রয়োগ করতে পারে, সেটি মূল্যায়িত হয় না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়। তারা চাকরির বাজারে গিয়ে বুঝতে পারে- সনদ আছে, কিন্তু দক্ষতা নেই।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের Bangladesh Tertiary Education Sector Review-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর সংযোগ এখনও দুর্বল। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ঘাটতি দেশের প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গঠনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তর প্রয়োজন। এখন সময় এসেছে, Student centered learning, Active learning, Project & Problem based learning, Learning experience creation এর। কারিকুলামেই গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতার ‘Master Plan’ যুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ কোনো শিক্ষার্থী কোন দক্ষতা অর্জন করবে, তা স্পষ্টভাবে কারিকুলামেই নির্ধারণ করতে হবে। কারণ দক্ষতা কখনো মুখস্থ করে অর্জিত হয় না; দক্ষতা অর্জিত হয় চর্চা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন জরুরি। এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিন ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষাই শিক্ষার্থীর সক্ষমতার প্রধান মাপকাঠি। অথচ বর্তমান বিশ্বে presentation skill, teamwork, leadership, research ability এবং innovation capacity অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই মূল্যায়ন ব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে- Continuous Assessment, Portfolio, Presentation & Project, Problem Solving & Innovation.
মুখস্থবিদ্যা নির্ভর শিক্ষা শুধু সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে না; এটি আত্মবিশ্বাসহীন, নির্ভরশীল এবং ঝুঁকি নিতে অক্ষম প্রজন্ম তৈরি করে। যে শিক্ষা প্রশ্ন করতে শেখায় না, সেই শিক্ষা কখনো উদ্ভাবন তৈরি করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে স্টিভ জবস বলেছিলেন, ‘Innovation distinguishes between a leader and a follower’. কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও একই উত্তর খোঁজে, নতুন উত্তর নয়।
অথচ ভবিষ্যতের বিশ্ব হবে উদ্ভাবননির্ভর, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষতানির্ভর। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কেবল ডিগ্রি দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়; প্রয়োজন হবে lifelong learning, reskilling এবং adaptability. এ প্রসঙ্গে মার্কিন ভবিষ্যতবিদ, লেখক ও সমাজ বিশ্লেষক আলভিন টফলার সতর্ক করে বলেছিলেন- ‘The illiterate of the 21st century will not be those who cannot read and write, but those who cannot learn, unlearn, and relearn.’ অর্থাৎ ২১ শতকের নিরক্ষর তারা নয় যারা পড়তে, লিখতে পারে না; বরং তারা, যারা নতুন করে শিখতে, ভুলে যেতে এবং আবার শিখতে পারে না।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তারা প্রযুক্তিবান্ধব, দ্রুত অভিযোজনক্ষম ও বিশ্বসচেতন। সঠিক কারিকুলাম ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে এই তরুণরাই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন সাহসী নীতি, আধুনিক কারিকুলাম ও বাস্তবমুখী শিক্ষা সংস্কার। কারণ বাস্তবতা খুবই স্পষ্ট- দুর্বল কারিকুলামে দক্ষ জাতি তৈরি হয় না। ব্যাকডেটেড শিক্ষা দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ হয় না। মুখস্থবিদ্যা দিয়ে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠে না। শিক্ষা বিষয়ে নেলসন ম্যান্ডেলার বিখ্যাত সেই উক্তি - Education is the most powerful weapon which you can use to change the world - অর্থাৎ পৃথিবী পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো শিক্ষা। কিন্তু সেই শিক্ষা অবশ্যই হতে হবে দক্ষতাভিত্তিক, সৃজনশীল এবং ভবিষ্যৎমুখী। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু ডিগ্রি দেওয়া নয়; বরং দক্ষ, উদ্ভাবনী, নৈতিক এবং নেতৃত্ব দিতে সক্ষম মানবসম্পদ তৈরি করা।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা তাই আজ শুধু সংকটের গল্প নয়; এটি পরিবর্তন, পুনর্গঠন এবং সম্ভাবনারও গল্প। এখন প্রয়োজন সঠিক বীজ বপন করার- কারণ আগামী দিনের ফসল নির্ভর করছে আজকের কারিকুলামের ওপর।
লেখক: ড. ফুয়াদ হোসেন, ডিন, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।



