
শীতের আগমন ও রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পঞ্চম বার্ষিকী ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, যুদ্ধের এ ধরনের কৌশল সাধারণত মানুষের মনোবল গুঁড়িয়ে দিতে পারে না।
চলতি বছর ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিনের বাহিনী দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চললেও ইউক্রেনের চারটি প্রদেশ রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার পুতিনের ভৌগোলিক লক্ষ্য এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। আর সে কারণেই ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিতে তিনি তাদের শহরগুলোতে বেপরোয়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছেন।
এসব হামলায় নিশানা করা হচ্ছে আবাসিক ভবন, বড় উন্মুক্ত বাজার, শপিং মল, কিয়েভের দোব্রোবুত চিকিৎসা কেন্দ্র ও ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের মতো স্থানগুলোকে। সবচেয়ে বেশি আঘাত হানা হয়েছে রাজধানী কিয়েভে; তবে দিনিপ্রো, খারকিভ, খেরসন, ওদেসা, মিকোলাইভ ও সুমির মতো অন্যান্য শহরও এই হামলা থেকে রেহাই পায়নি।
রাত নামলেই সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দে রাতের নীরবতা ভেঙে যায়।
মানুষজন ছুটে যান আশ্রয়ের খোঁজে (যদি কাছাকাছি কোনো বাঙ্কার বা নিরাপদ স্থান থাকে) কিংবা কিয়েভের মাটির নিচের পাতাল রেল স্টেশনগুলোতে। শহরের রাস্তায় হাঁটা, কেনাকাটা করা, কিংবা তেলের পাম্পের মতো নিয়মিত লক্ষ্যবস্তু হওয়া স্থানগুলোতে গাড়িতে তেল ভরার সময়েও মানুষ আঘাতের শিকার হতে পারেন, এমনকি মারাও যেতে পারেন।
গত সেপ্টেম্বরে ইউক্রেন সফরের সময় এই অবিরাম হামলার তীব্রতা আমি নিজের চোখে দেখেছি। মিকোলাইভে এক রাতেই মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত এক ডজনেরও বেশি সতর্কবার্তা শুনতে পাই। কিয়েভ থেকে প্রায় ৩১ মাইল পশ্চিমে কোপিলিভ নামক স্থানে একটি রেস্তোরাঁয় যখন আমি রাতের খাবার খাচ্ছিলাম, তখন কানফাটা এক শব্দে দেওয়াল কেঁপে ওঠে। মাত্র ৫০০ মিটার দূরে একটি ভবনে আঘাত হানে একটি ড্রোন; চোখের পলকে কমলা আগুনের লেলিহান শিখা ভবনটির ছাদ গ্রাস করে নেয়।
এ ধরনের ঘটনা এখন ইউক্রেনীয়দের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এই আতঙ্ক কোনো অংশে কম নয়।
গত সেপ্টেম্বর মাসে ইউক্রেনের ওপর ৩ হাজার ১৭৭টি জেটচালিত ড্রোন ছুড়েছে রাশিয়া, যার বড় অংশই ছিল গেরান মডেলের ড্রোন। এটি আগস্টের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি এবং জুনের ৩৫০টি হামলার তুলনায় বিশাল এক উল্লম্ফন। এসব ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি প্রায়ই ছোড়া হয় ইস্কান্দারের মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ঘণ্টায় ৫ হাজার ৬০০ মাইল গতিবেগ এবং আকাশেই গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতার কারণে এগুলো প্রতিহত করা চরম কঠিন।
পুতিনের এই তীব্র বোমা হামলার মূল লক্ষ্য হলো ইউক্রেনীয়দের জীবন এতটাই দুর্বিষহ করে তোলা, যাতে তারা বাধ্য হয়ে পুতিনের অপূর্ণ আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নতি স্বীকার করে। তার বাহিনী প্রায় পুরো লুহানস্ক দখল করে নিলেও দোনেৎস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চল এখনো পুরোপুরি দখল করতে পারেনি। কিন্তু তার এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র অভিযানের কাছে ইউক্রেন মাথা নত করবে না।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কিয়েভ ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোসিওলজির এক জরিপে দেখা গেছে, শান্তির বিনিময়ে জমি ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাবে ইউক্রেনীয়দের কঠোর বিরোধিতাই রয়ে গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া তিন-চতুর্থাংশ মানুষ এমন একটি সমঝোতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, যেখানে দোনেৎস্কের অ-অধিকৃত অংশ থেকে ইউক্রেনের সেনা প্রত্যাহার, ক্রিমিয়া ও দনবাসের ওপর রাশিয়ার আইনি কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া এবং ন্যাটোর সদস্যপদের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করার শর্ত ছিল।
আলাদাভাবে যখন জানতে চাওয়া হয় যে দক্ষিণাঞ্চলীয় দুটি প্রদেশের অ-অধিকৃত অংশ হস্তান্তরের বিনিময়ে কোনো সমঝোতা তারা মানবেন কি না, দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সরাসরি ‘না’ বলেছেন। এই জবাবগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ গত বছরের শেষ দিকে এক নির্মম শীতের মুখোমুখি হয়েই রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা শুরু করেছিল।
পুতিন হয়তো ভাবছেন, এই শীতে বিদ্যুৎ ও হিটিং ব্যবস্থা অচল করে, পানিশোধনাগার ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস করে একযোগে বড় ধরনের বোমাবর্ষণে ইউক্রেনীয়দের মানসিক শক্তি ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে; যার ফলে অতিরিক্ত জমি দখল করে যুদ্ধের সমাপ্তি টানার পথ সুগম হবে। তার এমন হিসাব একেবারেই অমূলক নয়। কারণ ইউক্রেনে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী সরঞ্জামের তীব্র সংকট রয়েছে।
ফলে গত মার্চে যেখানে ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করা যেত, জুলাইয়ে তা নেমে এসেছে ২০ শতাংশে। ইউক্রেন এখন ইউরোপীয় জোটের সঙ্গে মিলে কম খরচের ‘ফ্রেইয়া’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উদ্ভাবনে কাজ করছে এবং ফরাসি-ইতালীয় ‘এসএএমপি/টি এনজি’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাওয়ার চেষ্টায় রয়েছে, যা সহজে স্থানান্তরযোগ্য। তবে এগুলোর কোনোটিই নিকট ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত সংখ্যায় মোতায়েন করা সম্ভব হচ্ছে না।
তা সত্ত্বেও, ইউক্রেনীয়দের প্রমাণিত দৃঢ়তার কথা বাদ দিলেও, রুশ নেতার এই কৌশল কিছু অপ্রিয় বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে।
ইতিহাস বলে, তীব্র বোমাবর্ষণ বেসামরিক জনগণের মনোবল ভেঙে দেয় না; বরং তা তাদের প্রতিরোধ স্পৃহাকে আরও শক্তিশালী করে। ইউক্রেনীয়রাও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইকে জাতীয় অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখে। আমি যখন তাদের জিজ্ঞেস করেছি তারা কেন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, প্রায় সবাই একবাক্যে বলেছেন, লড়াই থামানোর একমাত্র বিকল্প হলো নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া। কেউ হয়তো একে ফাঁকা অহমিকা বলে উড়িয়ে দিতে পারেন, তবে আসল সত্য হলো ইউক্রেনীয়রা মনেপ্রাণে এটাই বিশ্বাস করে।
এর পাশাপাশি ইউক্রেনে এই ধারণাও প্রবল যে কোনো ধরনের চুক্তির সুযোগ নিয়ে পুতিন মূলত সময়ক্ষেপণ করবেন এবং বাহিনী পুনর্গঠন করে আবার নতুন করে হামলা চালাবেন। এ কারণেই শান্তির বিনিময়ে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার যে কোনো রূপরেখার ব্যাপারে ইউক্রেনীয়রা অত্যন্ত সতর্ক বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার দুই দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের দেওয়া প্রস্তাবের ক্ষেত্রে, যাদের ইউক্রেনীয়রা নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর বদলে পুতিনের পক্ষপাতী হিসেবেই দেখে।
তা ছাড়া, পুতিন নিজেও প্রবল চাপে রয়েছেন। যুক্তরাজ্যের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফের তথ্য অনুযায়ী, পুতিনের বাহিনী ইতিমধ্যে ১৫ লাখ সেনা হতাহতের শিকার হয়েছে। ইউক্রেনের মতো রাশিয়ারও সামরিক জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে, যদিও দেশটির জনসংখ্যা ইউক্রেনের তুলনায় সাড়ে তিন গুণ বেশি। এ কারণেই রাশিয়াকে উত্তর কোরীয় সেনা এবং এশিয়া ও আফ্রিকার ভাড়াটে সেনাদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তদুপরি, চলতি বছর রুশ বাহিনী নতুন করে খুব বেশি অঞ্চল দখল করতে পারেনি। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ২৮ শতাংশ ভূখণ্ড তারা দখল করতে পেরেছে। একই সঙ্গে তাদের নতুন সেনা সংগ্রহের তুলনায় প্রতি মাসে গড়ে ৬,০০০ বেশি সেনা প্রাণ হারাচ্ছে বা আহত হচ্ছে।
এদিকে ইউক্রেনের দখলকৃত দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে যাওয়া রাশিয়ার সড়ক ও রেলপথগুলোতে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার ফলে ক্রিমিয়া, খেরসন ও জাপোরিঝিয়ায় অবস্থানরত রুশ সেনারা প্রয়োজনীয় রসদ সংকটে পড়েছে। অতি সম্প্রতি উত্তরাঞ্চলীয় দোনেৎস্কের লাইমান সেক্টরে ইউক্রেনের থার্ড আর্মি কোরের ‘অপারেশন ভিভালদি’ রুশ বাহিনীকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দেয় এবং তাদের পূর্ব দিকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
এই যুদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতিকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সামরিক বাহিনীর বিপুল লোকবলের চাহিদার কারণে দেশটিতে তীব্র শ্রমসংকট দেখা দিয়েছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ২০২৭ সালের খসড়া বাজেটে কেন্দ্রীয় ব্যয়ের ৩৫ শতাংশই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রতিরক্ষায়।
রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের শোধনাগারগুলোতে ড্রোন হামলার কারণে গত জুন নাগাদ জ্বালানি উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিসংকট, শুরু হয়েছে রেশনিং, পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং গত জানুয়ারি থেকে পেট্রোলের দাম ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সব দিক মিলিয়ে ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে ইউক্রেনীয়দের অনীহা, জনসাধারণের মনোবল ভাঙতে বোমাবর্ষণের ঐতিহাসিক ব্যর্থতা এবং রাশিয়ার নিজেদের অভ্যন্তরীণ বহুমুখী সংকটই ইঙ্গিত দেয় যে, আসন্ন শীতের তীব্র কষ্টের মধ্যেও পুতিনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনকে তাঁর শর্তে শান্তি মেনে নিতে বাধ্য করতে পারবে না।
লেখক পরিচিতি
রাজন মেনন নিউইয়র্ক সিটি কলেজের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাল্টজম্যান ইনস্টিটিউট অব ওয়ার অ্যান্ড পিস স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো।


