বিএনপির ২২ লাখ নেতাকর্মীর ঘাড়ে এখনও ২৭ হাজার মামলার বোঝা

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে দায়ের হওয়া রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার একটি বড় অংশ প্রত্যাহার হলেও এখনও বিএনপির প্রায় ২২ লাখ নেতাকর্মীর ঘাড়ে ঝুলছে ২৭ হাজার মামলার আইনি বোঝা। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও এসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় চরম ভোগান্তি ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। মামলা নিষ্পত্তি ও প্রত্যাহারের তদবির নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভিড় করছেন অনেকে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ফ্যাসিবাদের আমলে দায়ের করা এসব মিথ্যা মামলা এখনও ঝুলে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।
এদিকে বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রে জানানো হয়েছে, সরকারের গঠিত কমিটির কাছে সুপারিশ ও তালিকা পাঠানো হলেও মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা তা আমলে নিচ্ছেন না; যার ফলে প্রক্রিয়াটিতে তীব্র ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
শীর্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা মামলাজটে বন্দি
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা ছিল সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপি তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাসহ দলের শীর্ষ ও মধ্যম সারির প্রায় সব নেতাই একাধিক মামলার আসামি।
কেন্দ্রীয় উল্লেখযোগ্য নেতাদের মামলার পরিসংখ্যান:
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল: ৬০০টির অধিক
সাইফুল আলম নীরব: ৪৫৭টি
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল: ৩৫৭টি
এস এম জাহাঙ্গীর: ৩৫০টির বেশি
সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু: ৩১৫টি
মীর সরফত আলী সপু: ২৫০টি
রফিকুল আলম মজনু: ২২৬টি
আনিসুর রহমান তালুকদার: ২১১টি
মামুন হাসান: ২০০টি
অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী: ১৮০টির বেশি
শিমুল বিশ্বাস: ১৭৪টির বেশি
এস এম জিলানী: ১৭০টি
আবদুল কাদির ভূঁইয়া: ১৫০টি
সালাহউদ্দিন আহমেদ: প্রায় ১৫০টি
রাজিব আহসান: ১৪৬টি
আকরামুল হাসান: ১৪৬টি
তানভীর আহমেদ রবিন: ১২৭টি
শহিদুল ইসলাম বাবুল: ১১০টি
হাবিবুর রশীদ: ১০৩টি
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: ৯৮টি
বজলুল করিম চৌধুরী: ৯৫টি
আব্দুস সালাম: ৮০টি
জয়নুল আবদিন ফারুক: ৫০টির অধিক
শামসুজ্জামান দুদু: ৩০টির অধিক
রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু: ৫০টি
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: ৩৩টি
মামলার সার্বিক পরিসংখ্যান ও বিএনপির দলীয় বক্তব্য
বিএনপির মামলা ও তথ্য সংরক্ষণ সমন্বয়ক এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সালাউদ্দিন খান (পিপিএম) এশিয়া পোস্টকে জানান, ২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সর্বমোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ লাখ।
তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে মামলা প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনো বিভিন্ন পর্যায়ে ২৭ হাজার মামলা ঝুলে রয়েছে, যেখানে আসামি হিসেবে রয়ে গেছেন দলের ২২ লাখ নেতাকর্মী। সালাউদ্দিন খান বলেন, সারাদেশের ভুক্তভোগীরা মামলা নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে চাপ দিচ্ছেন। আমরা জেলা ও আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিতে আবেদন পাঠালেও দায়িত্বশীলরা তা যথাযথভাবে আমলে নিচ্ছেন না।
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এ বিষয়ে এশিয়া পোস্টকে বলেন, মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী দল দমন করা ছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান কৌশল। সরকার এতটাই বেপরোয়া ছিল যে হজ পালনরত ব্যক্তি কিংবা মৃত ব্যক্তির নামেও মামলা দিয়েছে। এসব ভুয়া মামলা নিষ্পত্তির জন্য দলীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে অনেক মামলা নিষ্পত্তিও হয়েছে। আশা করছি বাকি মামলাগুলোও দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে।
সরকারি কমিটি ও প্রত্যাহারের বর্তমান অগ্রগতি
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে (২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত) দায়ের করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বি-স্তরবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে:
আন্তঃমন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় কমিটি: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে গঠিত।
জেলা কমিটি: জেলা পর্যায়ে প্রাপ্ত আবেদনসমূহ পর্যবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নেতৃত্বে গঠিত।
কমিটিগুলো রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার আবেদন আহ্বান করার পর চলতি বছরের ৫ মে জেলা প্রশাসকদের সভাপতি করে জেলা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। তবে বিএনপির অভিযোগ, নতুন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত এই জেলা কমিটিগুলো এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সভা পরিচালনা করতে পারেনি। ফলে মাঠপর্যায়ে মামলা প্রত্যাহারের তালিকায় ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
আইনি অগ্রগতির বিষয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ২৩ হাজার ৮৬৫টি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছিল, যার ফলে প্রায় ৫ লাখ মানুষ অব্যাহতি পান। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুনে জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, রাজনৈতিক কারণে দায়ের হওয়া মোট ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা ইতোমধ্যে পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। যেসব মামলা অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলো রাজনৈতিক হয়রানি নাকি প্রকৃত ফৌজদারি অপরাধ তা যাচাই-বাছাই করে দ্রুত সমাধানের প্রক্রিয়া চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার জট দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে তা নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে বিচার বিভাগের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক সংস্কার প্রক্রিয়ার অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল হয়রানিমূলক মামলাগুলো দ্রুত খারিজ করা। অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকার ২৩ হাজারেরও বেশি মামলা প্রত্যাহার করে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও ২৭ হাজার মামলা আটকে থাকা এবং জেলা কমিটির সভা না হওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতার স্পষ্ট প্রমাণ। প্রকৃত ফৌজদারি অপরাধ ও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার দ্রুত পৃথকীকরণ অত্যন্ত জরুরি; তা না হলে মাঠপর্যায়ের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী আইনি হয়রানির শিকার হতেই থাকবেন, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে বড় অন্তরায়।


