বিশেষ সাক্ষাৎকার/হাইব্রিডরা যেন দলে ঢুকতে না পারে, খেয়াল রাখব: রিজভী

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর দলকে আরও সুসংগঠিত করা এবং তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পর দল ক্ষমতায় এলে হাইব্রিড ও সুবিধাবাদীদের ভিড় বাড়ে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করে এসব লোক যাতে দলে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকবেন তিনি। একই সঙ্গে দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন রিজভী।
রোববার (২৪ আগস্ট) নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এশিয়া পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো
এশিয়া পোস্ট: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়ে কেমন অনুভব করছেন?
রিজভী: বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়া অত্যন্ত গর্ব ও আনন্দের। অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে পালনের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রয়োজনীয় সাহস ও শক্তির প্রার্থনা করি। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলাম, এখন স্থায়ী কমিটির সদস্য। সরকারপ্রধানের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে আছি। সরকারি দায়িত্বে থেকে যতটুকু ভূমিকা রাখা দরকার, তা রাখব। নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং তারা এসে যেন আমাকে না পেয়ে ফিরে না যান-সেদিকে খেয়াল রেখে আমি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে যাব।
এশিয়া পোস্ট: প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ভয় ও আশঙ্কার কথা বলেছেন।
রিজভী: শুধু নেতৃত্বে এলেই চলবে না। অর্পিত গুরুদায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছি কিনা- এই বোধটি সবসময় কাজ করে। দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশিত কাজগুলো সহকর্মীদের সমর্থন ও সহযোগিতার মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন করতে চাই।
এশিয়া পোস্ট: সাংগঠনিক কোন কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবেন?
রিজভী: দলকে সুশৃঙ্খল রাখা। সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা। বিরোধীদলের গঠনমূলক সমালোচনা আমলে নেওয়া। অতীতে দেখা গেছে, দল ক্ষমতায় গেলে সাংগঠনিক তৎপরতা কমে যায়। সেটি যেন না হতে পারে, সেদিকে নজর দেব। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাব।
এশিয়া পোস্ট: তৃণমূলে সংগঠন নিয়ে পরিকল্পনা কী?
রিজভী: আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠন নতুন আঙ্গিকে সাজানো হচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান নিয়মিত স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। তাদেরকে পরামর্শ দিচ্ছেন। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে তৃণমূলকে শক্তিশালী করার চেষ্টা থাকবে।
এশিয়া পোস্ট: সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ কী?
রিজভী: অত্যন্ত সফলভাবে সরকার ছয় মাস অতিক্রান্ত করেছে। বর্তমানে জ্বালানি সংকট চলছে। সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি, সংকট কেটে যাবে। দেশে এখনো অনেক গ্যাস মজুদ আছে, সেগুলো উত্তোলনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হবে। এছাড়া সমস্যা সমাধানে চীন, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
এশিয়া পোস্ট: সরকার ও দলের কর্মকাণ্ডে ভারসাম্য আনার কথা বলা হচ্ছে, অগ্রগতি কতদূর?
রিজভী: দল নির্বাচিত হয়েই সরকার গঠন করেছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টা আমরা প্রত্যেকেই দলের লোক। তাই দলের লোক হিসেবে সরকারে কাজ করার পাশাপাশি দলের দায়িত্বও পালন করবেন, এতে কোনো জটিলতা নেই। সরকার গঠনের প্রথমদিকে দলীয় কর্মকাণ্ড একটু ধীর ছিল, কিন্তু এখন আবার পুরোদমে চলছে। প্রতি সপ্তাহেই দু-একদিন দলের চেয়ারম্যান তৃণমূলের সঙ্গে বসছেন ও মতবিনিময় করছেন। সেখান থেকে তিনি সাংগঠনিক নানা বিষয়ে অবগত হচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন।
এশিয়া পোস্ট: দলের একটি অংশের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ নানান অভিযোগ আসছে। এ ক্ষেত্রে দলের অবস্থান কী?
রিজভী: দলের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, জমি-জায়গা দখল করলে তা কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ইতোমধ্যে প্রায় দুই হাজারের মতো নেতাকে দলের বিভিন্ন মেয়াদে এবং বিভিন্নভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। দলের কঠোর অবস্থানের কারণে তুলনামূলকভাবে এসব অভিযোগ অনেক কমে এসেছে। জনগণও দেখছে, বিএনপিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কেউ যুক্ত হলে তাকে বিচারের ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। এটি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি কতদূর বাস্তবায়ন হয়েছে?
রিজভী: ৩১ দফা সামনে রেখে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। ছয় মাসে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফসহ অনেক কিছু ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। আশা করি, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ৩১ দফা বাস্তবায়ন হবে।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানকে বিএনপি কীভাবে মূল্যায়ন করে?
রিজভী: জুলাই আন্দোলন ছিল একটা মহা গণঅভ্যুত্থান। প্রমাণিত হয়েছে সত্যিকারের অর্থেই মানুষ রাস্তায় নেমে গেলে কোনো স্বৈরাচার টিকে থাকতে পারে না। তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। শেখ হাসিনা চিরস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যে স্বপ্ন দেখতেন, জুলাই আন্দোলনে তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এই আন্দোলনে বিএনপি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মাঠে ছিল।
এশিয়া পোস্ট: বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কেমন?
রিজভী: বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সরকারের চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। তাদের গঠনমূলক সমালোচনা আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এশিয়া পোস্ট: ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিএনপির সঙ্গে থাকা শরীক দলগুলোর মূল্যায়ন কতদূর?
রিজভী: শরীক দলগুলো থেকে একাধিক মন্ত্রী হয়েছে। মূল্যায়ন চলমান প্রক্রিয়া।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) শূন্যতা পূরণ কী সম্ভব?
রিজভী: ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের সময় তিনি দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই দুঃশাসনে তাকে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে। এতে বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। নেতাকর্মীদের মধ্যে তার অবশ্যই একটি বড় প্রভাব রয়েছে। তবে আশা রাখি, সেই অভাব পূরণে কোনো ধরনের শূন্যতা বা ফাঁক যেন তৈরি না হয়, সব সময় সেই চেষ্টা চালিয়ে যাব।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপিতে ‘হাইব্রিড ও সুবিধাবাদী’দের প্রবেশ নিয়ে অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ আছে। এদের চিহ্নিত করতে কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি?
রিজভী: একটি দল যখন দীর্ঘ সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসে, তখন সেখানে হাইব্রিডদের ভিড় জমে। তারা যাতে সুবিধা নিতে না পারে, সেজন্য আমাদের ত্যাগী নেতাকর্মী; যারা আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; তাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। হাইব্রিডরা এসে দলের নাম ভাঙিয়ে যাতে কোনো অনৈতিক কাজে জড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। দল এ ব্যাপারে সতর্ক।
এশিয়া পোস্ট: অনেকের অভিযোগ ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন হচ্ছে না, কতটুকু সত্য?
রিজভী: দলের চেয়ারম্যান বিভিন্নভাবে যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করছেন। সম্প্রতি বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ১২ জন নেতাকে বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা প্রত্যেকেই মাঠের নেতা। জেলা বা বিভাগীয় শহরের আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দলের যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়েছে। মূল্যায়ন অব্যাহত থাকবে।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল কী হতে পারে?
রিজভী: বিএনপির অগ্রাধিকারমূলক কৌশল হলো জনসমর্থন ধরে রাখা ও নতুন জনসমর্থন অর্জন করা। বিএনপি সরকার সঠিক কৌশল নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল কবে হবে?
রিজভী: দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবে। তবে এটুকু বলতে পারি, খুব শিগগিরই হবে।
এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
রিজভী: এশিয়া পোস্ট ও তার পাঠকদেরও বিএনপির পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ।




