রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা আজ, দলে পরিবর্তনের গুঞ্জন

জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে নিজেদের চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গত কয়েকদিন ধরে এই পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলটির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে শেষ মুহূর্তে মির্জা ফখরুলই রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হচ্ছেন, নাকি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান কোনো বড় চমক দেখাবেন তা আজকের দিনেই স্পষ্ট হবে।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে চূড়ান্ত করা হলে দল, সরকার এবং জাতীয় সংসদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রদবদল আসবে। বিশেষ করে বিএনপির নতুন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব কে হচ্ছেন তা নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে।
একইসঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে মির্জা ফখরুলের স্থলাভিষিক্ত কে হবেন এবং তার খালি হওয়া নির্বাচনি আসনে উপনির্বাচনে কে দলীয় মনোনয়ন পাবেন, তা নিয়েও জোর গুঞ্জন চলছে।
স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গুঞ্জন চললেও দলটি এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কারো নাম প্রকাশ করেনি। তবে আজ দুপুর ১২টায় দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিবালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এই বৈঠকেই রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং সম্ভাব্য প্রার্থীর ফরম ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রে স্বাক্ষর সম্পন্ন করা হবে। এর আগে গত ১০ আগস্ট বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সর্ব শেষ বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের সর্বময় ক্ষমতা চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছেন। বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হতে পারে।’
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য জানিয়েছেন, চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের পরই মনোনীত প্রার্থীর স্বাক্ষর, প্রস্তাবক ও সমর্থকদের স্বাক্ষরসহ মনোনয়ন ফরম নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়ার জন্য একটি প্রতিনিধি দলকে পাঠানো হবে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে নীরবতা ও সচিবালয়ে ভিড়
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখনো মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা করেননি। গণমাধ্যমে নানা ধরনের খবর এলেও মির্জা ফখরুল নিজেই এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
তা সত্ত্বেও, গতকাল বুধবার দিনভর সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে বিএনপির নেতাকর্মী ও কর্মকর্তাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। অনেকেই মির্জা ফখরুলকে মন্ত্রী হিসেবে শেষবারের মতো দেখতে আসেন, আবার কেউ কেউ অগ্রিম শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। গতকাল দায়িত্বের শেষ দিন হতে পারে ধরে নিয়ে তার স্বাক্ষরের জন্য অনেকগুলো জরুরি ফাইল উপস্থাপন করা হয়। বিকেলে তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দেন।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে খালি হবে ৩ পদ: সমীকরণে যারা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি মনোনীত হন, তবে তার হাতে থাকা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি হবে- স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী, বিএনপির মহাসচিব পদ ও ঠাকুরগাঁওয়ের সংসদ সদস্য পদ।
এই শূন্য পদগুলো পূরণে ইতোমধ্যে একাধিক নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন করে কোনো পূর্ণ মন্ত্রী দেওয়ার সম্ভাবনা কম। বর্তমানে এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এককভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অথবা বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদকেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বাড়তি দায়িত্ব বা নতুন দপ্তর হিসেবে নিয়ে আসা হতে পারে।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব: মহাসচিব পদ শূন্য হলে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন: মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁওয়ের আসনটি খালি হলে সেখানে উপনির্বাচনে তার ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিনকে দলীয় প্রার্থী করা হতে পারে বলে তৃণমূল সূত্র জানিয়েছে।
স্থায়ী কমিটিতে নতুন মুখ: মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে একটি পদ খালি হবে। এর আগে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ স্পিকারের দায়িত্ব নেওয়ার কারণে স্থায়ী কমিটির আরেকটি পদ শূন্য হয়েছিল। ফলে দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামের এই দুটি খালি পদে নতুন কাউকে যুক্ত করার পথ সুগম হবে।
দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের পদ নিয়ে জল্পনা প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমি দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রকাশ করেই কাজ করে যাচ্ছি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশেই সবসময় নেতাকর্মীদের পাশে আছি। দল আমাকে যেভাবে দায়িত্ব দেবে—তা বিএনপি চেয়ারম্যান ও দলের নীতি নির্ধারকরাই ঠিক করবেন।’
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য গত রোববার নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং রুহুল কবির রিজভী এই ফর্ম দুটি সংগ্রহ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো অভিজ্ঞ, ধৈর্যশীল এবং সর্বজনগ্রাহ্য নেতাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করা বিএনপির জন্য একটি বড় স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে দলের কঠিন মুহূর্তে মির্জা ফখরুল যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সব রাজনৈতিক দলের সাথে সমঝোতা বজায় রেখেছেন, তা তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাকে বঙ্গভবনে বসানো হলে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সমন্বয় ও স্থায়িত্ব তৈরি হবে। একইসঙ্গে, মির্জা ফখরুলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রুহুল কবির রিজভীর মতো মাঠপর্যায়ের পরীক্ষিত ও অনুগত নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসা দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেবে। সব মিলিয়ে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বিএনপি একইসাথে সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতা এবং দল পরিচালনায় নতুন গতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে।
.png)



