প্রতিপক্ষের নৈরাজ্য রাজপথেই মোকাবিলা করবে বিএনপি

দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার যে কোনো অপচেষ্টা, নৈরাজ্য ও নাশকতামূলক তৎপরতার বিরুদ্ধে রাজপথে শক্ত অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
সাবেক শাসক দল আওয়ামী লীগের গোপন অপতৎপরতা এবং জামায়াতসহ যে কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নৈরাজ্যমূলক আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে রাজপথেই মোকাবিলা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।
মাঠের কর্মসূচিতে সোচ্চার হওয়ার কড়া নির্দেশনা
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় কেন্দ্র থেকে শুরু করে একদম তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সার্বক্ষণিক সতর্ক ও মাঠে সক্রিয় থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে মিছিল, সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে দৃশ্যমান রাজপথের উপস্থিতি বজায় রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে দলটি।
বিশেষ করে মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে—যেমন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল—ধারাবাহিক প্রতিবাদ মিছিল ও শোডাউনের মাধ্যমে রাজপথ দখলে রাখার বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিশ্চুপ থাকবে না বিএনপি
দলটির দায়িত্বশীল নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, যে কোনো গঠনমূলক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনকে দল স্বাগত জানায়। তবে গণতান্ত্রিক অধিকারের অজুহাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস, বাসে-ট্রেনে আগুন দেওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা হলে বিএনপি নিশ্চুপ থাকবে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘জনগণ বিএনপি সরকারকে ক্ষমতা দিয়েছে তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাদের, তাদেরই সেটি যথাযথভাবে পালন করতে হবে। বিএনপি কখনো আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চায় না।’
তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘বিএনপি অতীতেও রাজপথে ছিল, ভবিষ্যতেও রাজপথে থাকবে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা বিধান এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল দায়িত্ব সরকারের।’
একই প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘চব্বিশের গণ-আন্দোলনের পরাজিত শক্তি বিভিন্নভাবে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থির করার অংশ হিসেবে সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করা এবং আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এসব ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। চব্বিশের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তা নস্যাৎ করার কোনো অপচেষ্টাই সফল হতে দেওয়া হবে না।’
দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা আরও বলেন, ‘পরাজিত শক্তির মাঠে কোনো কার্যক্রম চালানোর অধিকার নেই।’
নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ
বিএনপির কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে, জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে অর্জিত বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ বিনষ্ট করতে চাইলে তা বরদাশত করা হবে না। আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করতে দেওয়া হবে না।
বিএনপি নেতারা বলেছেন, ‘রাজপথ বা দেশের রাজনৈতিক ময়দান কারও কাছে ইজারা দেওয়া হয়নি। যে কোনো অপশক্তিকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সুনির্দিষ্ট কৌশলেই মোকাবিলা করবে দল।’
বিরোধী দল মোকাবিলায় বিএনপির গৃহীত কৌশল
ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি: সারা দেশের জেলা, মহানগর ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত বিরতিতে যৌথ মিছিল, প্রতিবাদ সভা ও সতর্ক অবস্থান অব্যাহত রাখা।
জনগণের নিরাপত্তা ও সচেতনতা বৃদ্ধি: যেকোনো ধরনের নাশকতা ও নৈরাজ্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ পাহারাদারের ভূমিকা পালন করা।
সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করা: সরকারি বা রাষ্ট্রীয় কাজের ব্যস্ততার পাশাপাশি প্রতিটি দলীয় ইউনিটকে মানসিকভাবে ও সাংগঠনিকভাবে সর্বদাই সক্রিয় রাখা।
বিএনপির হাইকমান্ড মনে করছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চক্রান্ত রুখতে মাঠে দলের সার্বক্ষণিক সক্রিয়তার বিকল্প নেই। তাই রাজপথে শক্ত পাহারায় থেকে আওয়ামী লীগসহ প্রতিপক্ষ দলগুলোর সার্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েই এগোচ্ছে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, চব্বিশের গণআন্দোলন-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে একটি ‘ভালো কৌশল’ গ্রহণ করেছে।
আলীগের কার্যক্রম নিয়ে অঙ্গসংগঠনগুলোকে বার্তা
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন বা ঝটিকা নৈরাজ্য ঠেকাতে মাঠে বিএনপির উপস্থিতি একটি বড় রাজনৈতিক প্রতিরক্ষা বর্ম হিসেবে কাজ করবে, বিএনপি মাঠ ছেড়ে দিলে প্রতিপক্ষ শক্তি সেই শূন্যতার সুযোগ নিতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই দলের হাইকমান্ড অঙ্গসংগঠনগুলোকে সক্রিয় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিএনপি বলছে, তারা নিজেদের একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। সংঘাত বা আইন নিজের হাতে না তুলে নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং একই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তার বার্তা দেওয়া সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক।
দীর্ঘ আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও নেতাকর্মীদের যেন ঢিলেঢালা ভাব না আসে এবং সাংগঠনিক ভিত্তি যাতে মজবুত থাকে, সে জন্য ধারাবাহিক শোডাউন ও মিছিল-সমাবেশ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানায় বিএনপি।

