বিক্ষোভ ও লুটপাট ঠেকাতে প্যারিসের দুই গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রাতভর কারফিউ

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের গুরুত্বপূর্ণ দুটি এলাকায় রাতভর কারফিউ জারি করেছে দেশটির পুলিশ প্রশাসন। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারফিউয়ের আওতায় রয়েছে প্লাস দে লা রিপুবলিক চত্বর এবং লে আল এলাকার নির্দিষ্ট কিছু সড়ক।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে প্যারিজিয়াঁ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সোমবার রাত ১১টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। একই সঙ্গে প্যারিসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রাত ৮টা থেকে বিক্ষোভ ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সহিংসতা ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এবং জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কারফিউ চলাকালে নির্ধারিত এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নিষিদ্ধ থাকবে। তবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী ব্যক্তি, দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে যাতায়াতকারী কর্মী, জরুরি সেবাকর্মী ও ব্যবসায়ীদের জন্য নির্ধারিত শর্তে ছাড় রাখা হয়েছে।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জনসেবাসংক্রান্ত অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। বিভিন্ন সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
প্যারিসেও পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিশেষ করে রিপুবলিক চত্বর ও লে আল বাণিজ্যিক এলাকায় সংঘর্ষ এবং দোকানপাটে লুটপাটের খবর পাওয়া যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ অভিযান চালায় এবং বিপুল মানুষকে আটক করে।
লে প্যারিজিয়াঁর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভের ঘটনায় প্যারিসে ৮৫৫ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ৫৫৭ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। রোববার রাতে নতুন করে সহিংসতার ঘটনায় আরও ২০৮ জনকে আটক করা হয়। এসব ঘটনার পর নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্লাস দে লা রিপাবলিকের কেন্দ্রীয় চত্বর এবং লে আল এলাকার দক্ষিণ দিকের কয়েকটি প্রবেশপথে কারফিউ কার্যকর হবে। লে আলের ক্ষেত্রে প্লাস মরিস কাঁতাঁ, রু বারজে, বুলভার সেবাস্তোপল, রু র্যামবুতো ও আলেঁদ্রে ব্রেতোঁর নির্দিষ্ট অংশ নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।
তবে পুরো রিপাবলিক এলাকা কিংবা প্যারিস শহরজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়নি। নিষেধাজ্ঞা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া এলিসে প্রাসাদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শঁজেলিজে, ফরাসি পার্লামেন্টের আশপাশ, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা এবং প্রধান রেলস্টেশনগুলোর আশপাশেও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিক্ষোভ ও সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে প্যারিসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো ও রেলস্টেশনে সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। লে আল এলাকার কাছাকাছি শাতলে এবং রিপাবলিক স্টেশনে সোমবার রাত ১০টা থেকে ট্রেন থামা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কর্মজীবী মানুষ, পর্যটক ও রাতের যাত্রীদের চলাচলে ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যাত্রীদের যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু বলেছেন, দেশের বিভিন্ন শহরে সহিংসতা মোকাবিলায় প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় ও সীমিত পরিসরে কারফিউ জারি করা হবে। তার মতে, পুরো শহরকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় না এনে যেসব এলাকায় সহিংসতার ঝুঁকি বেশি, সেসব স্থানে ব্যবস্থা নেওয়াই আপাতত উপযুক্ত।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের কৌশল আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ফ্রান্সের অন্য কয়েকটি শহরেও রাতের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। লিল, দুএ, দেনাঁ ও ওয়াতিনিয়ে শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
প্যারিস পুলিশের ঘোষণায় কারফিউয়ের সময়সীমা সোমবার ১৯ অক্টোবর রাত ১১টা থেকে মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর সকাল ৬টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এ ব্যবস্থা বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে নতুন করে জানানো হবে।
কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুদ্ধার কার্যক্রমও চলছে।


