বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে ফ্রান্সে শুরু হয়েছে জি৭ সম্মেলন

বিশ্বের শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট জি৭-এর শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয়েছে ফ্রান্সের মনোরম শহর এভিয়ান-লে-বেঁ। ১৫ থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, জাপান ও কানাডার শীর্ষ নেতারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে যোগ দিয়েছেন।
এবারের সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্ব একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব মোকাবিলা করছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।
পশ্চিমা নেতারা মনে করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইউক্রেনের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্যে সম্মেলনে নতুন সহায়তা প্যাকেজ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিয়ে নেতারা মতবিনিময় করছেন।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জি৭ নেতারা।
মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলার উপায় খুঁজতে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সদস্য দেশগুলো সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
এবারের সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রযুক্তিটির দ্রুত বিস্তার বিশ্ব অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন নেতারা। একইসঙ্গে তথ্য নিরাপত্তা, ভুয়া তথ্যের বিস্তার এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারের বিষয়েও আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
ফ্রান্স এবারের সম্মেলনে ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া ও কেনিয়াসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য আঞ্চলিক অংশীদার দেশগুলোর প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জি৭ সম্মেলন শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত ভবিষ্যত নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সম্মেলনের শেষে ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং এআই-বিষয়ক একটি যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্ব যখন একাধিক সংকটের মুখোমুখি, তখন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত এই জি৭ সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এর ফলাফল আগামী কয়েক বছরে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
