logo
Advertisement

প্যারিসে বাংলাদেশসহ ১৯৬ দেশের পতাকার শিল্পকর্ম

সাইফুল ইসলাম রনি
সাইফুল ইসলাম রনিফ্রান্স
প্যারিসে বাংলাদেশসহ ১৯৬ দেশের পতাকার শিল্পকর্ম
প্যারিসে বাংলাদেশসহ ১৯৬ দেশের পতাকার শিল্পকর্ম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ফ্রান্সের ইতিহাসে স্বাধীনতা ও বিপ্লবের অন্যতম প্রতীক বাস্তিল চত্বর রূপ নিয়েছে শান্তি, সহাবস্থান ও বৈশ্বিক ঐক্যের এক ব্যতিক্রমী শিল্পমঞ্চে। ৯ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্যারিস ডিজাইন উইকের অংশ হিসেবে ‘বাস্তিলের পুনর্দখল’ শিরোনামে প্রদর্শিত হচ্ছে বাংলাদেশসহ ১৯৬টি দেশের পতাকার বৃহৎ শিল্পকর্ম। উদ্যোগটির মূল বার্তা, জাতি ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব।

শিল্পীযুগল ক্লেয়ার ও জঁ-সেব এই স্মারক শিল্পকর্মটি তৈরি করেছেন ‘ফেস্তিভাল দু মোঁদ’ এবং ‘রি-ফ্যাশন’-এর অংশীদারিত্বে। বাস্তিল চত্বরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জুলাই স্তম্ভকে ঘিরে বৃত্তাকারে সাজানো হয়েছে পতাকাগুলো। এর মধ্যে জাতিসংঘের ১৯৫টি সদস্য ও পর্যবেক্ষক দেশের প্রতিনিধিত্বকারী ১৯৬টি পতাকার পাশাপাশি রয়েছে একটি সাদা পতাকা, যা শান্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

শিল্পকর্মটির নাম ‘বাস্তিলের পুনর্দখল’ হলেও এর বক্তব্য কোনো রাজনৈতিক দখল বা সংঘাতকে ঘিরে নয়। বরং ইতিহাসে বিপ্লব ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত বাস্তিলকে নতুন অর্থে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। শিল্পীদের পরিকল্পনায় চত্বরটি পরিণত হয়েছে জাতি, জনগোষ্ঠী, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং মননের একটি উন্মুক্ত পরিসরে।

এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পতাকা তৈরিতে নতুন কাপড়ের পরিবর্তে ব্যবহৃত পোশাক ব্যবহার করা। ‘রি-ফ্যাশন’-এর সহযোগী সংগ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ব্যবহৃত পোশাক থেকে কাপড় সংগ্রহ করে প্রতিটি পতাকা তৈরি করা হয়েছে।

পরবর্তী ধাপে এসব কাপড় ‘হুরিয়া’ সমিতির কর্মশালায় একত্রিত ও সেলাই করা হয়। সংগঠনটি আরও টেকসই ফ্যাশন এবং পোশাকের পুনর্ব্যবহারের ধারণাকে এগিয়ে নিতে কাজ করে।

শিল্পকর্মটির মাধ্যমে ফলে দুটি বিষয় একই সঙ্গে সামনে এসেছে। একদিকে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে শান্তি ও সহাবস্থানের বার্তা, অন্যদিকে রয়েছে পুরোনো পোশাক ও বস্ত্র পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশগত দায়বদ্ধতার ধারণা।

শিল্পীদের কাছে ব্যবহৃত কাপড়ের নির্বাচন ছিল প্রকল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বিবেচনায় রেখে তাঁরা কাপড়ের টুকরোগুলো নির্বাচন করেছেন। ফলে প্রতিটি পতাকা একক কোনো নতুন কাপড়ের তৈরি নয়; বরং বিভিন্ন মানুষের ব্যবহৃত পোশাক ও বস্ত্রের অংশ একত্রিত হয়ে তৈরি করেছে নতুন একটি প্রতীক।

এই কাপড়গুলোকে শিল্পীরা পরিচয়, স্মৃতি ও ইতিহাসের বাহক হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের ভাবনায়, পৃথিবীর বৈচিত্র্য একটি বিশাল বস্ত্র-নকশার মতো, যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের গল্প একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

বাস্তিল চত্বরে পতাকাগুলো যখন বৃত্তাকারে প্রদর্শিত হচ্ছে, তখন সেগুলো কেবল আলাদা আলাদা দেশের প্রতীক হিসেবে থাকছে না। সম্মিলিতভাবে এগুলো হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব পরিবর্তন ও পুনর্ব্যবহারের একটি শিল্প-প্রতীক, যাকে আয়োজকেরা ‘সবুজ বিপ্লবের পতাকা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

প্রদর্শনী শেষে পতাকাগুলো সংরক্ষণ বা পুনর্ব্যবহারের আরেকটি সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ড্রুওট এস্টিমেশনস-এর উদ্যোগে ৯ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত Drouot.com-এ অনলাইনে পতাকাগুলোর নিলাম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগ্রহী ব্যক্তিরা প্রদর্শনীস্থলে দেওয়া কিউআর কোড স্ক্যান করে অনলাইন নিলামে অংশ নিতে পারবেন।

এই উদ্যোগের ফলে শিল্পকর্মটি শুধু প্যারিসের বাস্তিল চত্বরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রদর্শনী শেষে পতাকাগুলো বিভিন্ন সংগ্রাহকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার মাধ্যমে প্রকল্পটির বার্তাও আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

একটি বেসরকারি ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রি-ফ্যাশন পরিবেশবান্ধব অনুদানের মাধ্যমে অর্থনীতি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে। এর নিয়ন্ত্রিত তহবিল মূলত টেক্সটাইল ও জুতার বর্জ্য প্রতিরোধ এবং ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহৃত হয়।

৯ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর প্যারিস ডিজাইন উইকের অংশ হিসেবে বাস্তিল চত্বরে এই শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হবে। একই সময়ে অনলাইন নিলামের মাধ্যমে পতাকাগুলো নতুন মালিকের কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াও চলবে।

ইতিহাসের বিপ্লবী প্রতীক বাস্তিল তাই এই আয়োজনে পেয়েছে নতুন এক ব্যাখ্যা। এবার সেখানে বিপ্লবের ভাষা এসেছে যুদ্ধ বা সংঘাতের বদলে শান্তি, বৈচিত্র্য, পুনর্ব্যবহার ও একটি টেকসই ভবিষ্যতের বার্তা নিয়ে।