logo

দেশে ফিরছেন সাগরে ১০ দিন ভেসে থাকা সেই ২৯ বাংলাদেশি

আফছার হোসাইন
আফছার হোসাইন, মিশর
দেশে ফিরছেন সাগরে ১০ দিন ভেসে থাকা সেই ২৯ বাংলাদেশি
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ চেষ্টায় প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী। ছবি: ইন্টারনেট

ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ৩৮ বাংলাদেশি গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তবরুক থেকে উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপে পৌঁছানোর সেই স্বপ্নযাত্রাই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় এক ভয়াবহ মৃত্যুযাত্রায়। প্রায় ১০ দিন ভূমধ্যসাগরে ভাসমান থাকার পর প্রাণ হারান ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিক। পরে মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূল থেকে জীবিত ২৯ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। দীর্ঘদিন আটক থাকার পর অবশেষে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

মিশরের মারসা মাতরুহে আটক থাকা এ ২৯ বাংলাদেশিকে তিন ধাপে দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, ২৮ সেপ্টেম্বর ৬ জন, ২৯ সেপ্টেম্বর ১২ জন এবং ১ অক্টোবর ১১ জনসহ মোট ২৯ বাংলাদেশি দেশে ফিরবেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) অর্থায়নে তাদের বিমান টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ভূমধ্যসাগরে নিহতদের কয়েকজন। ছবি: মিশর দূতাবাস
ভূমধ্যসাগরে নিহতদের কয়েকজন। ছবি: মিশর দূতাবাস

১০ দিন ভূমধ্যসাগরে ভাসমান:

আটক বাংলাদেশিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তবরুক থেকে ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নাগরিকসহ মোট ৪২ জন একটি রাবারের নৌযানে করে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। নৌযানটিতে একটি স্পিডবোটের ইঞ্জিন থাকলেও ছিল না প্রয়োজনীয় নেভিগেশন ব্যবস্থা। যাত্রার আগে দালালরা তাদের আশ্বাস দিয়েছিল, মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রিসে পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু সমুদ্রে নৌযানটি ছাড়ার কয়েক ঘন্টা পরই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। নেভিগেশন ব্যবস্থার অভাবে একপর্যায়ে নৌযানটি দিক হারিয়ে ফেলে। পরে জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে বিশাল সমুদ্রের মধ্যে অসহায় হয়ে পড়ে তারা।

ভূমধ্যসাগর থেকে আরও ১৬০ বাংলাদেশি উদ্ধার

খাবার ও পানির সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয় তীব্র গরম ও প্রচণ্ড সূর্যতাপ। প্রতিটি মুহূর্ত তখন হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার লড়াই। সেই লড়াইয়ে টিকতে না পেরে প্রাণ হারান একে একে ৯ জন বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিক। মৃতদেহ গুলোতে পচন ধরার পর জীবিত যাত্রীরা সেগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হন। ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো বাংলাদেশিরা হলেন—জুনায়েদ, রবিন, হৃদয় পাল, জুয়েল আহমেদ, চান মিয়া, হাবিবুল্লাহ, সানোয়ার, রিপন, মেহেদী হাসান ও মিশকাত তালুকদার।

১০ দিন সাগরে ভাসতে থাকার পর ১৩ আগস্ট বাকিদের নিয়ে নৌযানটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। পরে মিশরীয় কর্তৃপক্ষ তাদের উদ্ধার করে।

গ্রিসে পৌঁছানোর আশায় ১৩ থেকে ১৭ লাখ টাকা:

আটক বাংলাদেশিদের কয়েকজন জানান, দালালদের মাধ্যমে গ্রিসে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে জনপ্রতি প্রায় ১৩ থেকে ১৭ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেছেন তারা। কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ ঋণ নিয়ে, আবার কেউ জীবনের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ভেঙে এই অর্থের ব্যবস্থা করেন। তাদের অভিযোগ, দালালরা দুইতলা জাহাজে করে ইউরোপে পাঠানোর কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তাদের একটি ছোট রাবারের নৌযানে তুলে দেওয়া হয়। কয়েকজনের দাবি, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিংবা জোর করে ওই নৌযানে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

সমুদ্রে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পর এখন সংশ্লিষ্ট দালাল ও মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

২৯ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরাতে দূতাবাসের উদ্যোগ:

মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টি জানার পর আটক বাংলাদেশিদের অবস্থা, উদ্ধার পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত (চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স) গৌতম কুমার দে এবং প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন গত ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর মারসা মাতরুহ জেলখানা পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা সংশ্লিষ্ট মিশরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আটক ২৯ বাংলাদেশির প্রত্যেকের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেন তারা। ব্যক্তিগত তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের ব্যবস্থাও করা হয়।

ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার ৬ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাল মিশর

দূতাবাসের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধারের পর মিশরীয় কর্তৃপক্ষ আটক বাংলাদেশিদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাস মিশরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের আইনগত ও কনসুলার সহায়তা এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়। দূতাবাসের ওই কর্মকর্তা আরো জানান, আইওএম-এর অর্থায়নে ২৯ বাংলাদেশির বিমান টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী তিন ধাপে তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হবে।

যে ২৯ বাংলাদেশি দেশে ফিরছেন:

মারসা মাতরুহে আটক ২৯ বাংলাদেশির মধ্যে রয়েছেন—কিশোরগঞ্জের মারাম আলী, সাইমন মিয়া; সুনামগঞ্জের মাহফুজ মিয়া, শামীম আহম্মেদ, মো. আলিম উদ্দিন, মো. মামুন খান, হুজাইফা বিন হুসাইন, আবু সাইদ মো. ইয়াহিয়া, মো. সোহেল মিয়া, সাইদুল ইসলাম, আরিফ আহম্মেদ, রুহানি আহম্মেদ রাব্বি, আনাম উদ্দিন, নূর আলম, বদর উদ্দিন, নাঈম আহম্মেদ, মো. হুসাইন আহম্মেদ, মো. হুসাইন মিয়া, তায়েবুর রহমান, সাব্বির হোসেন তালহা ও তোফায়েল আহম্মেদ; হবিগঞ্জের মো. রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ, মো. সয়োব মিয়া ও মুস্তাকিম ভূঁইয়া; সিলেটের নজরুল ইসলাম, আব্দুল করিম, মো. তানভীর হুসাইন ও রাজু মিয়া এবং মাদারীপুরের মো. ফারুক।