logo

গ্রিসে ৪ হাজার নিয়োগের চুক্তি, ভিসা-জটিলতায় ভুগছেন বাংলাদেশিরা

গ্রিসে ৪ হাজার নিয়োগের চুক্তি, ভিসা-জটিলতায় ভুগছেন বাংলাদেশিরা
ছবি: ট্রিপঅ্যাডভাইজর ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

ইউরোপের দেশ গ্রিসের সঙ্গে ২০২২ সালে বাংলাদেশের সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর আওতায় বছরে চার হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার কথা গ্রিসের। কিন্তু ভিসা ও নিয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতায় সেই লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। বেশ কিছু বাধার কারণে অনেক বাংলাদেশি এই চুক্তির সুবিধা নিতে পারছেন না।

গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা ইনফোমাইগ্রেন্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে অভিবাসী শ্রমিক বিনিময়-সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যকর হওয়ার পর থেকে দেশটিতে বৈধভাবে পৌঁছানো বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা ৫০০ জনেরও কম বলে জানিয়েছেন গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।

নাহিদা রহমান বলেন, ২০২২ সালে এথেন্স ও ঢাকার মধ্যে সই হওয়া চুক্তিটি এখনও কার্যকর রয়েছে। তবে কিছু বাধার কারণে অনেক বাংলাদেশি এই চুক্তির সুবিধা নিতে পারছেন না। এমওইউ কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে কতজন কর্মী গ্রিসে প্রবেশ করেছেন, তার প্রকৃত সংখ্যা আমাদের জানা নেই।

তিনি জানান, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দূতাবাসের মাধ্যমে যেসব কর্মীকে সেবা দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা ২০২৩ সালের পর গ্রিসে প্রবেশের কথা জানিয়েছেন, সেই তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, সাধারণভাবে ৫০০ জনেরও কম বাংলাদেশি কর্মী বৈধভাবে গ্রিসে এসেছেন।

চুক্তিটির দুটি প্রধান দিক রয়েছে। এর একটি হলো গ্রিসে বসবাসরত নির্দিষ্ট কিছু অনথিভুক্ত বাংলাদেশি অভিবাসীর বৈধতা বা নিয়মিতকরণ। অন্যটি হলো বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি গ্রিসে মৌসুমি কর্মী নেওয়া।

নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাজারো বাংলাদেশি বৈধ মর্যাদা পেলেও নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।

ভিসা প্রক্রিয়ায় বড় বাধা

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য অন্যতম বড় বাধা হলো ভিসা। কারণ, গ্রিসের ভিসার আবদেন করতে ভারতের নয়াদিল্লিতে গ্রিক দূতাবাসে সশরীরে হাজির হতে হয় বাংলাদেশিদের।

ভিসা সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার আগে আবেদনকারীকে গ্রিসের কোনো নিয়োগদাতার কাছ থেকে চাকরির চুক্তি সংগ্রহ করতে হয়। এ ছাড়া বৈধ পাসপোর্ট, পূরণ করা ভিসার আবেদনপত্র, বাংলাদেশের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ এবং ভিসা ফি জমা দেওয়ার প্রমাণপত্র দিতে হয়।

আবেদনকারীদের ভারতে যাওয়ার জন্য ভারতীয় ভিসাও প্রয়োজন হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ভিসা পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে।

নাহিদা সুমনা বলেন, বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের পর ভারতীয় ভিসা পাওয়া খুব কঠিন হয়ে গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি জানান, অনেক আবেদনকারী গ্রিক ভিসার সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক পেলেও নয়াদিল্লিতে যেতে না পারায় তাতে অংশ নিতে পারেননি।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং নিয়োগদাতা ও কর্মীর মধ্যে চাকরির মিল খুঁজে বের করার জন্য নির্ধারিত স্বল্প সময়সীমাও অনেক বাংলাদেশিকে বৈধ পথে গ্রিসে যাওয়ার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করছে। এর পরিবর্তে কেউ কেউ গ্রিসে বসবাসরত পরিচিতজনদের ওপর নির্ভর করছেন। আবার কেউ কেউ সমুদ্রপথে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশের ঝুঁকি নিচ্ছেন। তারা গ্রিসে বসবাসরত পরিচিতজনদের কাছে যান এবং পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে বিপজ্জনক সমুদ্রপথ বেছে নেন।

রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা। ছবি: ইনফোমাইগ্র্যান্টস থেকে নেওয়া
রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা। ছবি: ইনফোমাইগ্র্যান্টস থেকে নেওয়া

বিকল্প ভিসা-প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশি আবেদনকারীদের সমস্যাগুলো গ্রিক কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরেছে ঢাকা। বর্তমান ভিসাপ্রক্রিয়ার বিকল্প ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রাষ্ট্রদূত ব্যাখ্যা করে বলেন, বিকল্প স্থানে ভিসার আবেদন জমা দেওয়া এবং ভার্চুয়াল সাক্ষাৎকারের সুযোগ চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া চুক্তির আওতায় কর্মীদের ভিসার আবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এতে আবেদনকারীদের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবটির গুরুত্ব সম্পর্কে গ্রিক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে কারিগরি বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এ ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে গ্রিসের কনস্যুলার ও ভিসা প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে।

নাহিদা রহমান সুমনা জানান, গ্রিসের অভিবাসন ও আশ্রয়বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি। সমস্যার সমাধানে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমাও ঘোষণা করা হয়নি। তবে অগ্রগতি ধীরগতিতে হলেও কাজ এগোচ্ছে বলে জানান তিনি।

রাষ্ট্রদূতের মতে, চুক্তিটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি—এ বিষয়ে দুই পক্ষই একমত।

সচেতনতার অভাব ও নিয়োগসংক্রান্ত সমস্যা

ভিসা জটিলতাই চুক্তিটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের একমাত্র বাধা নয়। রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে বৈধ পথে গ্রিসে কাজ করতে যাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা এখনও সীমিত। সম্ভাব্য আবেদনকারীদের অনেকেই আবেদন প্রক্রিয়া, খরচ এবং প্রয়োজনীয় সময় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান না।

অন্যদিকে গ্রিসের সব নিয়োগদাতাও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পর্কে জানেন না বা এর আওতায় কর্মী নিয়োগের জন্য প্রস্তুত নন।

রাষ্ট্রদূত জানান, গ্রিসের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে কিছু নিয়োগদাতা সরকারি চ্যানেলের পরিবর্তে সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিচিতজনদের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ দিতে বেশি আগ্রহী। আবেদনকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ এবং যোগ্যতার শর্ত পূরণ করাও কঠিন হতে পারে।

সুমনা বলেন, এগুলো রাজনৈতিক নয় বরং বাস্তব কিছু সমস্যা। এসব জটিলতা দূর করে প্রক্রিয়াটি সহজ করার চেষ্টা করছি।

সরকারি নিয়োগ চ্যানেলের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ চুক্তিটি সম্পর্কে প্রচার চালানোর পাশাপাশি বোয়েসেল ও গ্রিক নিয়োগদাতাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

রাষ্ট্রদূত স্বীকার করেন, বছরে চার হাজার কর্মী নেওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় লক্ষ্য। এ ছাড়া ভিসা প্রক্রিয়ার উন্নতি, আরও বেশি নিয়োগদাতার অংশগ্রহণ এবং নিয়োগব্যবস্থা সহজ করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার মধ্যে পুরো কোটা পূরণের পরিবর্তে আগামী বছরগুলোতে টেকসইভাবে বৈধ কর্মী যাওয়ার সংখ্যা বাড়ানোর উপযোগী একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান এই কূটনীতিক।