পদ্ধতিগত ভুলে ভেস্তে গেছে ওষুধ খাতের বড় সংস্কার
• চিকিৎসার ৬৪ ভাগই যায় ওষুধের পেছনে
• নতুন করে হবে কমিটি
• বাতিলের সিদ্ধান্তে কোম্পানিগুলো খুশি হলেও দীর্ঘমেয়াদি ফাঁদে পড়ার শঙ্কা

দেশে চিকিৎসার পেছনে ১০০ টাকা খরচ হলে ৬৪ টাকাই গিলে খায় ওষুধের বাজার। আর এই চড়া দামের ওষুধ কিনতে গিয়ে প্রতি বছর নতুন করে চরম দারিদ্র্যের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্ধকোটিরও বেশি মানুষ। সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার এই লড়াইয়ে স্বস্তি ফেরাতে তিন দশকের স্থবিরতা ভেঙে আমূল পরিবর্তনের পথ দেখিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া নতুন ওষুধ নীতি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা রূপ নিল এক বিশাল নীতিগত বিপর্যয়ে।
আইনি ও পদ্ধতিগত ত্রুটির পাশাপাশি ওষুধশিল্প মালিকদের অদৃশ্য চাপ আর নীতিনির্ধারকদের একঘেয়েমির ফলে স্বাস্থ্য খাতের বহু প্রতীক্ষিত এই বড় সংস্কার কার্যকর হওয়ার আগেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। জনস্বার্থকে পরাস্ত করে পুরো ওষুধ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এক ধাক্কায় ছিটকে গেছে তিন দশক আগের পুরোনো ধাঁচেই।
৩০ বছর পেছাল ওষুধ খাত
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ১৯৯৪ সালে তৎকালীন সরকার মাত্র ১১৭টি ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ বা জরুরি তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছিল। গত তিন দশকে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে, নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে এবং চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারের নির্ধারিত জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সেই তালিকা বাড়েনি একটিও।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এই তিন দশকের অচলাবস্থা ভাঙতে চেষ্টা করে। চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনতে ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই ১৮ সদস্যের একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলমকে সভাপতি ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সাবেক যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খানকে করা হয় সদস্য সচিব। টাস্কফোর্সের মূল ম্যান্ডেট ছিল—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন মেনে দেশের রোগপ্রবণতা, চিকিৎসার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা বিবেচনায় একটি যুগোপযোগী ‘জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা’ এবং সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি তৈরি করা।
টাস্কফোর্স কমিটি ছয় মাস ধরে দফায় দফায় বৈঠক ও নিবিড় পর্যালোচনা চালিয়ে ২৯৭টি জরুরি ওষুধের নতুন তালিকা চূড়ান্ত করে, যা আগের পুরোনো তালিকার তুলনায় ১৮০টি বেশি। জীবনরক্ষাকারী এসব ওষুধের যুক্তিসংগত দাম বাঁধার সুনির্দিষ্ট রূপরেখাসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিলে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদ তাতে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।
তবে গেজেট প্রকাশের পর থেকেই অন্তরালে শুরু হয় তীব্র টানাপোড়েন। ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ওষুধশিল্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বাপি)। গত ৩০ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে নীতিটি পর্যালোচনার জোরালো দাবি জানায় তারা।
ওষুধ প্রস্তুতকারকদের অভিযোগ, তালিকা সম্প্রসারণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে এবং ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটির (ডিসিসি) কারিগরি উপকমিটিতে শিল্প সমিতির কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। অবশেষে গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে কোনো প্রকার পরিমার্জন ছাড়াই এক সিদ্ধান্তে গেজেটটি বাতিল করা হয়। এতে মুহূর্তের মধ্যে দেশের পুরো ওষুধ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিটকে পড়ে তিন দশক আগের পুরোনো ও অকার্যকর কাঠামোতে।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে আদালতে এ-সংক্রান্ত রিট থাকায় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
যে কারণে ভেস্তে গেল সংস্কার
গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের আইনগত পরামর্শ না নিয়ে টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল, যা প্রক্রিয়াগত আইনি ত্রুটি। পাশাপাশি বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট চলমান থাকায় গেজেটটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে সরকার।
বিষয়টির সত্যতা জানতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা টাস্কফোর্সের একাধিক সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পদ্ধতিগত ত্রুটির বিষয়টি তারা কেউ কেউ স্বীকার করেন। তারা জানান, সে সময় তাদের এই ত্রুটি জানা ছিল। তবে সেটি নিয়ে কেউ কেউ কথা বললেও তা শোনা হয়নি বলে দাবি করেন তারা। তবে এটি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি কেউ।
টাস্কফোর্স কমিটির অন্যতম সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যেটি বাতিল হয়েছে, সেটি নিয়ে আর কোনো কথা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। হ্যাঁ, অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নে ওষুধ প্রস্তুকারক কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি, তাদের মতামতও নেওয়া হয়নি। এটি সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল।’
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তৎকালীন সরকারের (অন্তর্বর্তী সরকার) পুরো সিদ্ধান্তেই বড় ধরনের “প্রসিডিউর মিসটেক” বা পদ্ধতিগত ভুল ছিল। আইন অনুযায়ী ওষুধ উপদেষ্টা কমিটির পরামর্শ নিয়ে কাজ করা বাধ্যতামূলক হলেও তা করা হয়নি। এই প্রসিডিউর মিসটেকের কারণেই হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত নীতিটি বাতিল করা হয়েছে।’
সংশোধনের পথ খোলা যেত
স্বাস্থ্য খাত-সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন ও নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট অভিমত, আইনি ত্রুটি থাকলেও সেটিই একমাত্র কারণ নয়। দেশে চলমান ডলার-সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে ঢাল বানিয়ে মূল চাপটা এসেছিল ওষুধশিল্পের প্রভাবশালী গোষ্ঠী থেকেই।
টাস্কফোর্স কমিটির অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘নীতিটি বাজারে বাস্তবে কার্যকর হওয়ার আগেই পুরোপুরি রহিত করা হলো। হুট করে পুরো নীতিটি বাতিল না করে সংশোধন বা রিভাইজ করা যেত। রিভাইজ করলে কাজের একটি ধারাবাহিকতা বজায় থাকত। এখন আবার শূন্য থেকে নতুন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে, যার চূড়ান্ত ফল নতুন কিছু হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’
একই সুরে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগ বাতিল সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও জনস্বাস্থ্যনীতির পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেন, ‘১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতিতে ফিরে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক অন্তঃসারশূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং দেশীয় ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচাপ ও ফাঁদের মুখে পড়বে।’
মুশতাক হোসেন বলেন, ‘প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কথা বলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। ওষুধ নীতিতে কোনো ত্রুটি থাকলে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে গাইডলাইন ঠিক রেখে তালিকার পরিধি আরও বিস্তৃত করা যেত। তা না করে একেবারে ১৯৯৪ সালের পুরনো নীতিতে ফিরে যাওয়া হলো।’
সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ওষুধ কোম্পানির কোনো প্রভাব আছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ওষুধমালিকদের একটি অংশ সাময়িক সুবিধায় খুশি হলেও তারা মূলত দীর্ঘমেয়াদি ফাঁদে পড়তে যাচ্ছেন। বাতিলের সিদ্ধান্তের কারণে দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো মারাত্মক প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে এবং মাল্টিন্যাশনাল বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাজার দখলের সুযোগ পাবে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ছাড় বা ট্রিপস ওয়েভারের কথা উল্লেখ করে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ওষুধে পেটেন্ট বা রয়্যালটি না দেওয়ার যে সুবিধা পাচ্ছিল, খোলা বাজারে ওষুধ ছেড়ে দিলে সেই সুবিধা হাতছাড়া হবে। আন্তর্জাতিক রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ও মার্কিন বাণিজ্য চাপের কারণে বাংলাদেশকে তখন পেটেন্ট রয়্যালটি দিতে বাধ্য করা হতে পারে।’
সরকার ও ওষুধ কোম্পানির মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কেউ প্রকাশ্যে কথা না বললেও নাম প্রকাশ করার শর্তে এক শীর্ষ কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘জনস্বার্থের পলিসি (নীতি) তৈরিতে সরাসরি ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি না রাখা একটি আন্তর্জাতিক সর্বজনস্বীকৃত নীতি। তা সত্ত্বেও তালিকা প্রণয়নের সময় বিভিন্নভাবে তাদের মতামত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিজেদের একচেটিয়া বাণিজ্যিক স্বার্থ শতভাগ সিদ্ধ হয়নি বলেই তারা শুরু থেকে এর বিরোধিতায় নেমেছিলেন।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রীর ভাই ওষুধশিল্প মালিকদের একজন। ফলে দল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সরকারের কাছে চাপ দিয়ে আসছিল কোম্পানিগুলো। ফলে সংশোধন হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা একেবারে বাতিল করা হয়।’
যদিও শিল্পমালিকদের চাপ ও কৌশলগত বিরোধিতার কারণে সরকার নতি স্বীকার করেছে, এমন অভিযোগ মানতে নারাজ বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান।
এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘যে সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই আইন লঙ্ঘন করে নেওয়া হয়েছে, তা সংশোধনের কোনো আইনি ভিত্তি থাকতে পারে না। অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা তৈরি ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কেমন হবে তা ঠিক করবে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ। আমরা সেটাই চেয়েছি। কিন্তু সরকার আইন না মেনে গায়ের জোরে কমিটি গঠন করেছিল। আমাদের বাদ দিয়ে একপেশে নীতি তৈরি করায় মাঠপর্যায়ের বাস্তব সংকটগুলো আড়াল হয়ে গিয়েছিল।’
নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলে হালিমুজ্জামান আরও দাবি করেন, ‘সরকারের কর্মকর্তাদের ধারণা, শিল্পমালিকদের সম্পৃক্ত করলেই নাকি নীতি নিজেদের সুবিধামতো প্রভাবিত করা হবে। এটি একটি ভুল মানসিকতা। নীতির প্রধান অংশীজন হিসেবে আমাদের বাস্তবসম্মত মতামত নেওয়ার অধিকার ছিল।’
নতুন করে হচ্ছে কমিটি
আইনের ত্রুটি দূর করে নতুন করে অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ কমিটি গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আইনের যে ত্রুটি করা হয়েছিল, তা সংশোধন করা হচ্ছে। নতুন উপদেষ্টা পরিষদের গেজেট প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের বাদ দেওয়া হয়েছিল। নতুন খসড়ায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং একজন শীর্ষ বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করে গেজেটের জন্য আবার ক্যাবিনেটে (মন্ত্রিসভা) পাঠানো হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, ক্যাবিনেটের অনুমোদন মিললেই নতুন গেজেট প্রকাশিত হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় উপদেষ্টা কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করবে।
নতুন কমিটি গঠনের অগ্রগতির বিষয়ে স্বাস্থ্যসচিব বলেন, ‘অধিকাংশ কমিটি ও প্রাথমিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যেই এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। একই সঙ্গে নতুন মূল্য নির্ধারণ কমিটিও হচ্ছে। কমিটিগুলোর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলে ওষুধ ও স্বাস্থ্য খাতের জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা কেটে যাবে বলে আমরা আশা করছি।’
চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৪ শতাংশ চলে যাচ্ছে ওষুধে
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ‘ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস’-এর সর্বশেষ সরকারি হিসাব যেন এক আতঙ্কের ছবি। দেশে একজন মানুষের চিকিৎসার পেছনে ১০০ টাকা খরচ হলে তার মধ্যে ৬৪ টাকাই খালি হয় শুধু ওষুধ কিনতে।
যেখানে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা মেনে সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও দাম নির্ধারিত থাকে, সেখানে বাংলাদেশে ৯৫ শতাংশ ওষুধ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়া সত্ত্বেও তার ওপর সরকারের কার্যকর মূল্য নিয়ন্ত্রণ নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ সতর্ক করে বলেন, ‘জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বেপরোয়া বাজার নিয়ন্ত্রণে যদি সরকারের শক্ত নজরদারি ও স্পষ্ট নীতিমালা না থাকে, তবে প্রতিদিন চিকিৎসাসামগ্রী কিনতে গিয়ে নিঃস্ব হতে থাকবে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ।’
তবে ওষুধের ব্যয় কমাতে হলে সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডিসিএল) শক্তিশালী করার বিকল্প নেই বলে মনে করেন ডা. মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেন, ‘সময়ের প্রয়োজনে ডায়াবেটিস, ক্যানসার, কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো অসংক্রামক রোগ ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের বিষয়গুলো বিবেচনা করে অত্যাবশকীয় তালিকা আরও আগে হালনাগাদ করা উচিত ছিল। অথচ তা না করে ওষুধ তালিকা সংকুচিত করা হয়েছে। আমাদের দেশে রোগীর চিকিৎস খরচের প্রায় বেশির ভাগই চলে যায় ওষুধ কিনতে। সরকার যদি এসেনশিয়াল ড্রাগ বা প্রয়োজনীয় ওষুধ নির্দিষ্ট তালিকায় না রাখে এবং বিনামূল্যে বা সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা না করে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউএইচসি) অর্জনের লক্ষ্য ব্যাহত হবে।’
মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সব প্রয়োজনীয় ওষুধ ইডিসিএলে তৈরি করার কথা থাকলেও বিগত সরকারগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করে রেখেছিল। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাম বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে ইডিসিএলকে দিয়ে ওষুধ তৈরি করাতে হবে। বেসরকারি খাত বানালেও সরকারের থেকে প্রণোদনা নিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে তা বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।’





