ডিসি ফিটলিস্টের খসড়ায় ‘রাতের ভোটের’ কর্মকর্তারা
• প্রাথমিক তালিকায় ৩০তম বিসিএসের ১৪৮ কর্মকর্তা
• জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাও রয়েছেন শর্টলিস্টে
• ফিটলিস্ট চূড়ান্ত করার আগে পর্যালোচনার দাবি

জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের খসড়া ফিটলিস্টে ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোটে’ দায়িত্বে থাকা বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম রয়েছে। ওই নির্বাচনের সময় ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা। এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, এমন অন্তত ১৮ জনের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
খসড়া তালিকায় ৩০তম বিসিএসের ১৪৮ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা রয়েছেন। ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনে সহায়তার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাও রয়েছেন তালিকায়।
খসড়া তালিকা প্রণয়নের পর এখন এটি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্র বলছে, তালিকা থেকে বিতর্কিতদের বাদ না দিলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত কর্মকর্তারা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পদায়ন পেতে পারেন। এতে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
গত ৩০ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফিটলিস্টে থাকা কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা লিখিত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। অধিকাংশ প্রার্থীকে টেলিফোনে বিষয়টি জানানো হয়।
খসড়া তালিকার বিষয়ে অবগত একজন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে জানান, মূলত বাইরের চাপ এড়াতে প্রার্থীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। এর পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়।
সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণকারীদের একজন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় যারা ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ওই সরকারকে সহায়তা করেছেন, তাদের ডিসি করার চেষ্টা চলছে। এ ধরনের নিয়োগ জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ক্ষুণ্ন করবে।’
চিঠি ছাড়া ডাকা এই সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি অনুবিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। তবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সচিব বা উচ্চপদস্থদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।
মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে সিনিয়র সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা দক্ষ, যোগ্য কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। যাদের দায়িত্ব দিলে তারা প্রশাসনের সুনাম বজায় রাখবেন এমন কর্মকর্তাদের বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। এতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।’
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের যে কোনো ধরনের চেষ্টা অবশ্যই এড়িয়ে চলা উচিত। আর আওয়ামী লীগ আমলে নিজেদের ‘বঞ্চিত’ দাবি করা কর্মকর্তারা বলছেন, ডিসি ফিটলিস্টের সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া সব কর্মকর্তাদের জন্য উন্মুক্ত ও যাচাইযোগ্য পদ্ধতিতে হওয়া উচিত ছিল।
সাধারণত উপজেলা পর্যায়ে ভোট পরিচালনায় রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সহায়তা করেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা। ৩০তম ব্যাচের যেসব কর্মকর্তা ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে পদোন্নতি পান, তাদের অনেকের নামই বর্তমান তালিকায় রয়েছে।
এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, ডিসি ফিটলিস্টে থাকা উল্লেখযোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন নিকারুজ্জামান, বারিউল করিম খান, কাজী হাফিজুল আমিন, নাজমুল আলম, হাবিবুল হাসান, আল ইমরান রুহুল ইসলাম, পঙ্কজ বড়ুয়া, বিকাশ বিশ্বাস, স্নেহাশীষ দাস, আলমগীর কবির, শিমুল কুমার সাহা, আবু রায়হান দুলন, কাজী আরিফুর রহমান, সজীব দেবনাথ, জেবুন নাহার শাম্মী ও সেঁজুতি ধর। এ ছাড়া মো. শিমুল আকতার, মো. মাসুম রেজা, মো. নজরুল ইসলাম, চিত্রা শিকারী এবং আরিফা সিদ্দিকার নাম রয়েছে তালিকায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তাদের কয়েকজনের দায়িত্বের বিবরণ তুলে ধরা হলো।
বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কর্মরত নিকারুজ্জামান ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় উখিয়ার ইউএনও ছিলেন। তার বাবা ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। ছোট ভাই তানভীর চৌধুরী নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত।
পরিকল্পনা বিভাগের বর্তমান উপপ্রধান জয়ন্তী রুপা রায় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের ভোটের সময় ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় ইউএনও ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার ছিলেন। বেপজার নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) সমীর বিশ্বাস ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ইউএনও ছিলেন। ইউএনও হিসেবে ২০১৮ সালের ভোটে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের উপসচিব বিভীষণ কান্তি দাশের নাম রয়েছে ডিসি ফিটলিস্টে। ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত তিনি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার ইউএনও ছিলেন।
শিমুল কুমার সাহা ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় খুলনার কয়রা উপজেলার ইউএনও ছিলেন। ওই নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অর্থ বিভাগের বর্তমান উপসচিব দেবাংশু কুমার সিংহ। তিনি ছিলেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায়।
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলায় ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় ইউএনও ছিলেন বৈশাখী বড়ুয়া। তিনি সেখানে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। পাবনার সুজানগর উপজেলায় সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ছিলেন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় সহকারী রিটার্নিং অফিসার ছিলেন বর্তমান উপসচিব পঙ্কজ বড়ুয়া। তখন তিনি সেখানকার ইউএনও ছিলেন। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় ছিলেন চিত্রা শিকারী।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কাজী আরিফুর রহমান ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেটের বিয়ানীবাজারের ইউএনও ছিলেন। একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কে এম ইয়াসির আরাফাত ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত কুমিল্লার লালমাইয়ের ইউএনও ছিলেন।
নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) লিংকন বিশ্বাস ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় ইউএনও ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ছিলেন। এখন তিনি উপসচিব হিসেবে কর্মরত।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ওই কর্মকর্তারাই আসলে বলতে পারবেন, অতীতে তারা কী করেছেন।’
পরিকল্পনা বিভাগের বর্তমান উপপ্রধান প্রিয়াংকা দত্ত বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তিনি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছিলেন। ভোটে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
অর্থ বিভাগের বর্তমান উপসচিব প্রণতি বিশ্বাসের নামও রয়েছে ফিটলিস্টে। ২০১৭ থেকে ২০১৮ সময়কালে তিনি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করেছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এএফএম সোলায়মান চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দায়িত্বে থেকে যেসব কর্মকর্তা সরকারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন তাদের জেলা প্রশাসক পদের যোগ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা নীতিবিরুদ্ধ কাজ। যে কোনো সরকারের দেশ ও জাতিবিরোধী স্বৈরাচারী কাজে যারা সহযোগিতা করেছেন, সেই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির তালিকায় রাখা যাবে না। স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে সরকারকে খুশি করার জন্য হোক কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে, বিতর্কিত কাজে নিজেদের জড়ানোর কারণে তারা ডিসি পদের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়েছেন।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগ দেওয়ার আগে সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন বারিউল করিম খান। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই পদে থাকার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তার একধরনের প্রভাব বা সুযোগ ছিল।
বর্তমানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) উপসচিব কাজী হাফিজুল আমিন আগে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) ও কালিয়াকৈরের ইউএনও ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের কিছুদিন আগে তাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পদায়ন করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় তিনি মানিকগঞ্জে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তালিকায় জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের দমনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাও আছেন। তাদের একজন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের আবদুল্লাহ আল জাকি।




