logo
Advertisement
সংসদে বিল উত্থাপন

সম্পত্তি দান করলেও ভোগদখল থাকবে মা-বাবার, বাস্তবায়ন চায় পরিবারগুলো

এশিয়া পোস্ট নিউজ
সম্পত্তি দান করলেও ভোগদখল থাকবে মা-বাবার, বাস্তবায়ন চায় পরিবারগুলো
সন্তানকে সম্পত্তির দলিল হস্তান্তরের এআই জেনারেটেড প্রতীকী ছবি

সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগদখলের অধিকার প্রবর্তনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ উত্থাপিত হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা সংযোজন করে এই ধরনের দানের সম্পর্ক নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

Advertisement

সংশোধিত আইনের ফলে মা অথবা বাবা সন্তান কিংবা নাতি-নাতনিকে এভাবে সম্পত্তি দিতে পারবেন। দাদা-দাদি বা নানা-নানিও নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দিতে পারবেন। আবার সন্তান বা নাতি-নাতনিও বিপরীতভাবে বাবা-মা বা দাদা-দাদি, নানা-নানিকে সম্পত্তি দিতে পারবেন। তবে আইনটি পাস হলে দ্রুত এর বাস্তবায়ন চান পরিবারের সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের জন্য ‘ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করেন।

বিলটি উত্থাপনের পর পরীক্ষা করে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। বিলে ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ নামে সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন একটি পদ্ধতি যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং অন্যান্য যোগ্য দাতা নির্দিষ্ট রক্ত-সম্পর্কীয় ব্যক্তি বা স্বামী-স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনি অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

আইনমন্ত্রীর দেওয়া বিলটির উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন ধরন থাকলেও দাতার আজীবন ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করে দান করার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা সংযোজন করে আজীবন ভোগের অধিকার সংরক্ষণকারী দানকে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র ধরন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিধান সব ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে।

সরকার জানিয়েছে, নতুন এ ব্যবস্থা প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের হেবা কিংবা আইনস্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের অন্যান্য পদ্ধতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না এবং এসব বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো বিরোধও সৃষ্টি করবে না।

এর আগে গত ৩০ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী জানান, ১৯৬৩ সালের আদালতের একটি রায়ের আলোকে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ইউসুফ্রাক্ট রাইট (অন্যের সম্পত্তি নষ্ট বা অপচয় না করে ভোগদখলের অধিঅকার বা জীবনস্বত্ব) বিধান যুক্ত করে এই আইনের সংশোধনী আনা হবে।

কারা সম্পত্তি লিখে দিতে পারবেন

প্রস্তাবিত ১২২এ ধারায় এই ধরনের দানের সম্পর্ক নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। মা অথবা বাবা সন্তান কিংবা নাতি-নাতনিকে এভাবে সম্পত্তি দিতে পারবেন। দাদা-দাদি বা নানা-নানিও নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দিতে পারবেন। আবার সন্তান বা নাতি-নাতনিও বিপরীতভাবে বাবা-মা বা দাদা-দাদি, নানা-নানিকে সম্পত্তি দিতে পারবেন। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যেও এই পদ্ধতিতে সম্পত্তি দান করা যাবে। স্থাবর সম্পত্তি হলে নিবন্ধিত দলিল করতে হবে।

মালিকানা গেলেও থাকবে ভোগের অধিকার

নতুন এই আইনে মালিকানা ও ভোগের অধিকার আলাদা থাকবে। ধরা যাক, কোনো বাবা তার বাড়ি সন্তানের নামে লিখে দিলেন। দলিল নিবন্ধনের পর মালিকানা সন্তানের কাছে চলে যাবে। তবে দলিলে ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার’ সংরক্ষিত থাকবে। এতে বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই বাড়ি ব্যবহার বা ভোগ করতে পারবেন। তার মৃত্যুর পর সেই অধিকার শেষ হবে।

গ্রহীতা আগে মারা গেলে কী হবে

দাতার আগে গ্রহীতা দাতার জীবদ্দশায় মারা গেলেও দান বাতিল হবে না। সে ক্ষেত্রে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে চলে যাবে। তবে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে। অর্থাৎ সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর সন্তান আগে মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তির মালিক হবেন, কিন্তু মূল দাতা বেঁচে থাকা পর্যন্ত তার ভোগাধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।

নিবন্ধনের পর একতরফা বাতিল হবে না

প্রস্তাবিত বিলের ১২২বি ধারায় বলা হয়েছে, জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে করা দান নিবন্ধনের পর সাধারণভাবে অপরিবর্তনীয় হবে। দাতা একতরফাভাবে সেটি বাতিল করতে পারবেন না। তবে দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই সম্মত হলে নিবন্ধিত নতুন দলিলের মাধ্যমে দান পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে। আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক প্রয়োজন বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন থাকলে এই সুযোগ ব্যবহার করা যাবে।

একজন সম্মতি না দিলে আদালতে প্রতীকার

দাতা বা গ্রহীতার একজনের সম্মতি নেওয়া সম্ভব না হলেও পরিবর্তন বা বাতিলের একটি পথ রাখা হয়েছে। কেউ অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে, নিখোঁজ থাকলে, মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত দিতে অক্ষম হলে, আইনি অক্ষমতা থাকলে বা অন্য কোনো যথেষ্ট কারণ থাকলে অপর পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দানের শর্ত পরিবর্তন, বাতিল বা সংশ্লিষ্ট অধিকার নিয়ে অন্য ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি দিতে পারবেন জেলা জজ।

তবে আদেশ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তিকে নোটিশ দিতে হবে। আদালত প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান করবে এবং আবেদনটি সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও সন্তুষ্ট হতে হবে।

কী বলছেন পরিবারের সদস্য ও আইন বিশেষজ্ঞরা

এশিয়া পোস্টের চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন পরিবারের সদস্য ও জেলা আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা হলো।

চট্টগ্রাম বিজিএমইএর পরিচালক ও সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম আবু তৈয়ব এশিয়া পোস্টকে বলেন, 'বর্তমানে সমাজে একধরনের ডিজঅর্ডার দেখা দিয়েছে। মাঝেমধ্যেই দেখছি সম্পত্তির জন্য বাবা-মায়ের সঙ্গে বিরোধে জড়াচ্ছে সন্তানরা। বর্তমানে দেশে অনেক প্রবীণ মা-বাবা সন্তানকে স্নেহের বশে জমি বা বাড়ি লিখে দেওয়ার পর অবহেলা, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ বা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর শিকার হন। সব সন্তান এমন তা বলছি না। কিন্তু এমন কিছু ঘটনা তো মিডিয়ায় দেখছি। এমনকি সম্পত্তির জন্য মৃত্যুর পর লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। এমন বাস্তবতায় এই বিলটা আমি ভালো বলেই মনে করি। এটা মানুষকে বৃদ্ধ বয়সে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। যা তাদের শেষ বয়সের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তাবেষ্টনী হিসেবে কাজ করবে।'

চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট নিলুফার সুলতানা বলেন, ‘এটা ইতিবাচকভাবেই দেখছি। তবে নিশ্চিত করতে হবে বিক্রির ক্ষেত্রে মা-বাবার অনুমতি নিতে তাদের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না। এর বাইরে হেবা করার পরও জীবদ্দশায় মা-বাবার ভোগদখলের অধিকার থাকা তাদের সুরক্ষা দেবে। আবার সন্তানকেও সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করবে। ফলে পারিবারিক কলহ কমবে বলেই আমি মনে করি।'

রাজশাহীর মো. ইমরান আলী পেশায় তিনি একজন সরকারি চাকরিজীবী। সম্প্রতি তিনি রাজশাহী মহানগীরর কয়েরডারা এলাকায় বসতবাড়ি করেছেন। সেই বাড়িতে স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার ও ছেলে তানভীর আহমেদকে নিয়ে বসবাস করছেন। ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন’ সংশোধনের পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয় তাদের সঙ্গে।

এই আইন কতটা যুগোপযোগী, এমন প্রশ্নে সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মা-বাবা অনেক সময় নিজের শেষ সম্বলটুকুও সন্তানের নামে লিখে দেন। কিন্তু বয়স হলে যদি সেই সন্তানই বলে, ‘এটা এখন আমার সম্পত্তি, আপনি এখান থেকে চলে যান’, তাহলে মা-বাবা কোথায় যাবেন? তাই সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও জীবদ্দশায় ভোগদখলের অধিকার থাকা খুবই প্রয়োজন। আমার মনে হয়, বর্তমান সমাজব্যবস্থায় এই আইন সময়োপযোগী।’

ইমরান আলী বলেন, ‘বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দেন ভালোবাসা থেকে, বিনিময়ে কোনো নিরাপত্তা চান না। কিন্তু বাস্তবে সব সন্তান একই রকম নয়। তাই সম্পত্তি দেওয়ার পরও বাবা-মায়ের অধিকার আইন দিয়ে নিশ্চিত করা দরকার। তবে আইনটি এমন হতে হবে, যাতে সন্তানদের সঙ্গে অযথা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ তৈরি না হয়।’

বর্তমান বাস্তবতায় এ আইন কতটা কার্যকর হবে? এমন প্রশ্নে বরিশাল-এর বাবুগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী আরিফুর রহমান বলেন, এই আইন বর্তমানে শহরে বাস্তবায়ন হলেও গ্রামে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আাছে। কারণ গ্রামের মানুষ আইন সচেতন নয়। এর ওপর প্রশাসনের কাছে সাহায্য চাওয়ার সাহস অনেকের থাকে না। আবার কেউ নিজেরা লাঞ্চনার শিকার হলেও সন্তান বিপদে পড়ুক চান না। তাই শতভাগ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

বরিশাল নগরীর বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী শেখ শামীম বলেন, বলেন, আইন হয় তবে আইন কার্যকর হয় না। ফলে আইনের শতভাগ প্রয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি আইনটিকে প্রচারনার মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে হবে। কারন শহরের মানুষ দ্রুত এসব বিষয় জানলেও গ্রামের মানুষ জানে না। ফলে প্রচারনার কোন বিকল্প নেই। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে আইনটি কার্যকরে ভূমিকা রাখে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবার ভিলেট এর সহকারী রেজিস্ট্রার মেহেদী হাসান শুভ বলেন, বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই আইন নিয়ে কঠোর অবস্থান না থাকলে পরিবারে সদস্যদের লাঞ্ছিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকবে।

দেওয়ানি মামলার সংখ্যা কমে আসবে কি না, এমন প্রশ্নে বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট হাফিজ আহমেদ বাবলু এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই আইনের ফলে বাবা-মাকে আর বৃদ্ধাশ্রম যেতে হবে না। মা-বাবার প্রতি সন্তান যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। এ ছাড়া পারিবারিক কলহ দূর হবে। আশা করি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যথাযথ কাজ করে মাঠপর্যায়ে আইনটি শক্তিশালী করে তুলবে। পাশাপাশি পারিবারিক মামলাগুলো পরিবার থেকেই মীমাংসা হয়ে যাবে।

বয়স্ক মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিরোধ কমানোর লক্ষ্যে প্রস্তাবিত এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন খুলনার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে আইনটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে রয়েছে নানা মত। কেউ মনে করছেন, এতে মা-বাবার নিরাপত্তা বাড়বে ও পারিবারিক কলহ কমবে; আবার কারও মতে, আইন থাকলেও সন্তানের মানসিকতা ও পারিবারিক বাস্তবতার ওপর এর কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে।

খুলনার ব্যবসায়ী মুজাহিদ বলেন, ‘আমি এই আইনকে বাস্তবমুখী উদ্যোগ হিসেবে দেখছি। এতে বাবা-মা ও সন্তান—উভয়েই উপকৃত হবে। বর্তমানে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা সন্তানদের সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর তারা আর বাবা-মায়ের যথাযথ দেখভাল করে না। ফলে পরবর্তীতে পারিবারিক বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি হয়। এই আইনটি কার্যকর হলে সমাজে পারিবারিক কলহ অনেকটাই কমে আসবে। তবে আইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা জরুরি। আমার বিশ্বাস, আইনটি প্রায় ৮০ শতাংশ কার্যকর হবে। মানুষ এর সুফল পাবে।

রূপসার কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আইনটি আমাদের মতো মা-বাবার জন্য খুবই যুগোপযোগী। সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পরও যদি মা-বাবার ভোগদখল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকা যায়। তবে শুধু আইন করলেই হবে না, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সহজ আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

তবে প্রস্তাবিত আইনটির বাস্তব প্রয়োগ ও আইনি কাঠামো নিয়ে সতর্ক করেছেন আইনজীবীরা। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, বাংলাদেশ ল’ ইয়ার্স কাউন্সিল খুলনা বার শাখার সেক্রেটারি এবং খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম পান্না এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সম্পত্তি লিখে দেওয়া বলতে দান, হেবা বা উইল—যে নামেই বলা হোক, এই অর্থে বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। তারপরও বিষয়টি আরও যাচাই করে দেখা দরকার। আমার দৃষ্টিতে এটি সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বাবা-মা একাধিক সন্তানের মধ্যে কোনো একজনকে সম্পত্তি লিখে দেন। কিন্তু কয়েক বছর পর ওই সম্পত্তি লিখে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে পরিবারের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। আবার অনেক বয়স্ক বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর সন্তান তাদের সঙ্গে থাকবে কি না, কিংবা কারও প্ররোচনায় সেই সম্পত্তি বিক্রি করে দেবে কি না—এমন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও থাকেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তান বাবা-মাকে সম্পত্তি লিখে দিতে বাধ্য করে—এমন ঘটনাও দেখা যায়।’

ময়মনসিংহ-এর তারাকান্দা উপজেলার তারাটি গ্রামের রফিকুল ইসলাম ও লিপি দম্পতি। তাদের দুই ছেলে। এই দম্পতির ভাষ্য, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সম্পত্তি লিখে দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সম্পত্তি দেওয়ার পর যদি নিজেরই থাকার জায়গা বা ভোগদখলের অধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি বাবা-মায়ের জন্য বড় ঝুঁকি।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সন্তানকে সম্পত্তি দিতে কোনো বাবা-মায়ের আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর যদি সন্তান মনে করে, এখন থেকে বাবা-মায়ের আর কোনো অধিকার নেই, তখন সমস্যা তৈরি হয়। জীবিত থাকা পর্যন্ত বাবা-মায়ের থাকার ও ভোগ করার অধিকার নিশ্চিত করা হলে আমরা অন্তত একটা আইনি নিরাপত্তা পাব।’

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন এই উপজেলার রামপুর গ্রামের আছিয়া বেগম। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি চার ছেলের ওপর নির্ভরশীল। তার মতে, আইনটি শুধু সম্পত্তির দখল নিশ্চিত করলেই হবে না; বাবা-মায়ের দৈনন্দিন নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

আছিয়া বেগম বলেন, ‘সম্পত্তি আমার ছেলেদেরই হবে, এটা নিয়ে আমাদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু আমি যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন যেন আমাকে আমার নিজের ঘর থেকে কেউ সরিয়ে দিতে না পারে, এই আইন যদি সেটা নিশ্চিত করে। তাহলে দেশের সবার জন্য এটা খুব দরকারি আইন।

সম্মতি ছাড়া সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর বন্ধ হলে কি বাবা-মা আরও লাঞ্ছনার শিকার হতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর কালিবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, ‘আইন যদি বলে সন্তান বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়া সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে না, সেটা ভালো। কিন্তু সন্তান যদি একই বাড়িতে থেকেও বাবা-মাকে খাবার না দেয়, কথা না বলে, ঘরে তালা দেয় বা মানসিক চাপ দেয়, তাহলে শুধু সম্পত্তির আইন দিয়ে কী হবে?’

দেওয়ানি মামলার বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নূরুল আলম রিপন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বর্তমানে সম্পত্তির মালিকানা, দখল, দলিল বাতিল, উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক বণ্টন নিয়ে মামলা হয়। নতুন আইনে বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় ভোগদখলের অধিকার স্পষ্ট হলে অন্তত কিছু বিরোধের ক্ষেত্রে আইনি অবস্থান পরিষ্কার হবে। ফলে মামলা কমার সম্ভাবনা আছে।’

গাজীপুর শহরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যে আইটি হতে যাচ্ছে, এটি খুবই যুগোপযোগী। কেননা আমি বাবা হিসেবে মনে করি, যার মেয়ে রয়েছে, তাদের সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও পিতা-মাতা জীবদ্দশায় ভোগ করে যেতে পারবেন। সন্তানরা চাইলেও এটি বিক্রি করে দিতে পারবে না। এই আইনটির মাধ্যমে পারিবারিক কলহ যেমন কমবে, তেমনি পিতা-মাতার অনিশ্চয়তাও কাটবে। ঝগড়াঝাঁটি কমে যাবে, মন চাইলেই বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিতে পারবে না। উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়া নিয়ে আদালতে যে বিভিন্ন রকম সমস্যার তৈরি হয়, সেটিও অনেকটা কমে যাবে।’

আলেখা খাতুন নামে এক চাকরিজীবী বলেন, ‘সামাজিক অবক্ষয় আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। যার কারণে এই আইনটি করার মতো সিদ্ধান্তে যেতে হচ্ছে সরকারকে। এই আইনের খুবই গুরুত্ব রয়েছে। আমরা চাই এটি বাস্তবায়ন হোক। এতে পিতা-মাতা বিশেষ করে বয়স্ক পিতা-মাতার অধিকারের নিশ্চয়তা তৈরি করবে।’

গাজীপুর বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সামিম হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আধুনিক সমাজব্যবস্থায় আমরা সবাই এখন সচেতন। এই আইন বাস্তবায়ন হবে বলে বিশ্বাস করি। প্রাথমিক অবস্থায় কিছুটা সমস্যা হলেও পরে এটার সুফল পাবে জাতি। যেসব সন্তান অবাধ্য, তাদের বিষয়টি ভিন্ন, জমি লিখে দেওয়া না দেওয়া তাদের ক্ষেত্রে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানদের জমি-সংক্রান্ত মামলা খুব বেশি হয় না। তবে কিছু জটিলতা তৈরি হয়, সেটি কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।’

নারায়ণগঞ্জ সদরের মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন বাবা শরিফ উদ্দিন সবুজ বলেন, ‘সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিলেও মা-বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তির ভোগদখল তাদের থাকবে—সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত যুগোপযোগী। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মা-বাবা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই তাদের আর আগের মতো মূল্যায়ন থাকে না। জীবনের শেষ সময়টা অনেক কষ্টের মধ্যে কাটাতে হয়। এই আইন মা-বাবাকে সুরক্ষা দেবে।’

একই এলাকার নিম্নবিত্ত পরিবারের একজন মা শিরিন আক্তার বলেন, ‘সারা জীবন কষ্ট করে আমরা যা কিছু করেছি, সবই তো ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য। সম্পত্তি ওদের নামে করে দিতেও আমাদের কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু শেষ বয়সে যেন নিজের ঘর-বাড়িতে শান্তিতে থাকতে পারি, এই নিশ্চয়তাটুকু আমরা চাই। আইন যদি থাকে, সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দিলেও মা-বাবা যত দিন বাঁচবে, তত দিন ওই সম্পত্তি ভোগদখল করতে পারবে, তাহলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হবে। আমরা তো সন্তানদের সঙ্গে কোনো ঝামেলা চাই না, শুধু চাই শেষ বয়সে যেন নিজের সন্তানদের কাছেই সম্মান আর নিরাপত্তা নিয়ে থাকতে পারি।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনের ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। পিতা-মাতা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে সন্তান বিপথগামী হয়ে তাদের প্রতি দায়িত্ব ও অধিকার যথাযথভাবে পালন করে না। এমনকি ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধে পিতা-মাতার যে অধিকার রয়েছে, সেটিও অনেকে বাস্তবায়ন করেন না। সে কারণে পিতা-মাতার সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই উদ্যোগকে আমি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করি। আইনে পিতা-মাতার অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকলে পারিবারিক বিরোধ কমবে। এতে সৃষ্ট মামলা কমবে এবং আদালতের মামলাজটও কমতে পারে।’