আবারও কি এক হচ্ছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন
• ব্যায় সংকুলান এবং জটিলতা দূর করতে চায় সরকার
• নগর বিশেষজ্ঞরা, সংস্কার কমিশন এবং বিএনপি নেতারাও একক করপোরেশনের পক্ষে
• বাস্তবমুখি পদক্ষেপ চায় জামায়াত

ব্যয় সংকোচন, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে পুনরায় একত্রিত করার কথা ভাবছে সরকার। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
বিএনপি সূত্র জানায়, দুই ভাগে বিভক্ত ঢাকাকে এখনই এক করা হবে, নাকি পরবর্তী কোনো সময়ে করা হবে তা নিয়ে সরকার পর্যালোচনা করছে। মূলত সামনে আসতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টিকেও এক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আলাদা নাকি একত্রিত সিটি করপোরেশন থাকলে দলীয় প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে, ক্ষমতাসীন দল সেটি হিসেব-নিকেশ করে দেখছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত ‘স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন’ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে পুনরায় একীভূত করার সুপারিশ করেছিল। বিএনপি সরকার এখন সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করে প্রস্তাবটির নানা দিক খতিয়ে দেখছে।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ভেঙে ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)’ এবং ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)’ এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। প্রশাসনিক গতিশীলতা আনা ও নাগরিক সেবা বাড়ানোর অজুহাতে তৎকালীন সরকার এই সিদ্ধান্ত নিলেও তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি অভিযোগ করে, তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে পদচ্যুত করতেই এই বিভাজন করা হয়েছিল।
একই সঙ্গে ঢাকার মতো একটি শহরে দুটি আলাদা সিটি করপোরেশন রাখার কার্যকারিতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলে আসছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স-এর সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকাকে দুই ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্তটি ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এই বিভাজনের ফলে নগরবাসীর সেবার মান বা সুবিধার কোনো উন্নতি হয়নি। বিশ্বের কোথাও একটি শহরকে দুটি আলাদা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের অধীনে ভাগ করার এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই।
এই নগর পরিকল্পনাবিদ আরও বলেন, বিভক্ত হওয়ার পর থেকে নগরবাসী নানা ধরনের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হয়েছেন। পাশাপাশি দুটি বিশাল করপোরেশনের জন্য আলাদা জনবল, যানবাহন ও প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখতে গিয়ে সরকারের খরচও অনেক বেড়ে গেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেরও একটি বড় অংশ দুই করপোরেশনকে আবার এক করার পক্ষে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ঢাকাকে দুই ভাগ করা ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একটি স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত। সে সময় জনগণের ইচ্ছার কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত খেয়ালখুশিতে এটি করা হয়েছিল।
ঢাকার মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী রিপন মনে করেন, ঢাকাকে একটি একক সিটি করপোরেশনের অধীনে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত যৌক্তিক একটি পদক্ষেপ হবে এবং এতে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।
তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম জানান, বিএনপি সরকার ঢাকাকে একীভূত করতে পারে, তবে সেটি সম্ভবত এখনই নয়। এই প্রক্রিয়ায় আরও কিছু সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এশিয়া পোস্টকে বলেন, দুই করপোরেশনকে আবার এক করা একটি অনেক বড় কাজ। এক্ষেত্রে জনগনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবমুখি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সরকার এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে চাইলে আমরা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে আমাদের মতামত দেব।
তিনি উল্লেখ করেন, নিউ ইয়র্ক, লন্ডন বা ইস্তাম্বুলের মতো বড় শহরগুলোতে একাধিক প্রশাসনিক এলাকা বা সিটি কাউন্সিল থাকলেও পুরো শহর কিন্তু একক মেয়ারাল কাঠামোর অধীনেই পরিচালিত হয়। বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এ বিষয়গুলো পর্যালোচনা করার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, মানুষ বর্তমান দুই সিটি করপোরেশন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কে এই ব্যবস্থা চালু করেছিল সেটা এখন আর বড় বিষয় নয়; জনগণ এটি মেনে নিয়েছে এবং এতে তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হয় না।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনে প্রতিটি ৯ থেকে ১৫টি ওয়ার্ড সমন্বয়ে মোট ২০টি ‘সিটি কাউন্সিল’ গঠনের এবং সেগুলোকে একজন মূল মেয়রের অধীনে পরিচালিত করার সুপারিশ করা হয়।
বিভাজনের প্রায় ১৫ বছর পর, ঢাকা কি এক থাকবে নাকি দুই ভাগেই পরিচালিত হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক দল, সরকার ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। শুধু ২০১১ সালের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই নয়; বরং প্রশাসনিক দক্ষতা, নাগরিক সেবা এবং আর্থিক সাশ্রয়ের বিষয়গুলোও এই বিতর্কে মুখ্য হয়ে উঠেছে।
বাজেটের অতিরিক্ত চাপ
ঘোষিত বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৪,০০৪.৬০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে (যেটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৬,৭৬০.৭৪ কোটি টাকা)। অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৪,৫২৭.৭৪ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে (যেটি পূর্ববর্তী অর্থবছরে ছিল ৬,০৬৯.৯৫ কোটি টাকা)।
অথচ বিভাজনের আগে ২০১১-১২ অর্থবছরে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ বাজেট ছিল মাত্র ২,৭১৫ কোটি টাকা। যদিও দায়িত্বের পরিধি ও রাজস্ব কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে পূর্বের বাজেটের সঙ্গে বর্তমানের সরাসরি তুলনা সম্ভব নয়, তবুও দুটি আলাদা সংস্থা চালাতে গিয়ে সরকারের প্রশাসনিক ও পরিচালনা ব্যয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও হিসেব-নিকেশ
সিটি করপোরেশন একীভূতকরণের পেছনে রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশও একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র জানিয়েছে, দলটি আগামী দিনের মেয়র নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছে।
দলীয় নেতাদের একাংশের মতে, দুটি করপোরেশন বহাল থাকলে এবং বিরোধী দলগুলোর সমর্থন অন্য কোনো প্রার্থীর দিকে গেলে তা ক্ষমতাসীন দলের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিগত সংসদ নির্বাচনে ঢাকার প্রায় অর্ধেক আসনে জামায়াত এবং দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এর বাইরের কিছু আসনেও তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিলো উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী যদি কোনো একটি করপোরেশনে ইতিবাচক ফল করে, তবে তা বর্তমান সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই একক নাকি বিভক্ত কোন কাঠামো দলীয় প্রার্থীর বিজয়ে সহায়ক হবে, বিএনপি এখন সেই রাজনৈতিক সমীকরণই মেলানোর চেষ্টা করছে।



