
জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমিতে (নায়েম) প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে গবেষণা বিল ও প্রশিক্ষণ বাজেটের নামে আর্থিক অনিয়ম, অন্যদিকে অনিয়মগুলোকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তাদের মধ্যে কোন্দল শুরু হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে গতি হারাচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অস্থিরতা বিরাজ করছে।
এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সম্প্রতি ১৩টি গবেষণাকর্ম সম্পন্ন হওয়ার আগেই সেগুলোর বিল প্রক্রিয়াকরণ এবং অর্থছাড়ের জন্য দাবি করেন গবেষণা ও তথ্যায়ন বিভাগের পরিচালক ড. মো. আতিকুল ইসলাম পাঠান। নিজেই গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা সত্ত্বেও কোনো ধরনের মূল্যায়ন প্রতিবেদন ছাড়াই বিল দাখিলের চেষ্টা করেন তিনি। তবে সেটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন না হওয়ায় বিলে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক মো. শাহজাহান।
একইভাবে ইন্ডাকশন ট্রেনিং কোর্সের ইম্প্যাক্ট অ্যানালাইসিসের কাজও শেষ না হতেই বিল উত্তোলনের চেষ্টা করেন ড. আতিকুল পাঠান। সেই বিলও আটকে দেন প্রশাসন শাখার পরিচালক মো. শাহজাহান।
এ ছাড়া নায়েমের গবেষণা ও তথ্যায়ন বিভাগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক জার্নালও প্রকাশের আগেই চূড়ান্ত বিল সাবমিট করেন বিভাগের পরিচালক ড. আতিকুল। জার্নাল প্রকাশের প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারায় এই বিলও আটকে দেওয়া হয়। যদিও এসব বিষয় অস্বীকার করেছেন ড. পাঠান।
নায়েমের ২০৭তম এফটিসি কোর্সের অতিথি বক্তার সম্মানী ও কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানের ব্যয় বাবদ মোট ১৭ লাখ ৯৩ হাজার ১৯৩ টাকার একটি বিল অনুমোদন ও পরিশোধের জন্য প্রশিক্ষণ ও বাস্তবায়ন বিভাগ থেকে উপস্থাপন করা হয়। বিলটিতে ২০ লাখ ৩০ হাজার ৫২০ টাকা নিট ব্যয় দেখানো হয়। তবে সামারিতে উল্লেখিত নিট ব্যয়ের সঙ্গে হিসাবের সামঞ্জস্য না পাওয়ায় সেটি পুনরায় সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
কর্মকর্তাদের দাবি, এই প্রশিক্ষণ কোর্সগুলোতে আগে কোর্স উপদেষ্টা হিসেবে সব বিভাগের পরিচালকরা ধারাবাহিকভাবে সুযোগ পেতেন। তবে বর্তমান পরিচালক প্রিম রিজভী ও ড. আতিকুল ইসলাম ছাড়া ২০২৬-২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে আর কাউকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়নি।
অভিযোগ আছে, গবেষণা ও তথ্যায়ন বিভাগের পরিচালক ড. আতিকুল ইসলাম পাঠান বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছিলেন। শিক্ষা ক্যাডারে কোথাও তৃতীয় গ্রেড না থাকা সত্ত্বেও তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ অনুশাসনে তৃতীয় গ্রেড পেয়েছিলেন। এ বিষয়ের নথিপত্র এশিয়া পোস্টের হাতে এসেছে।
এ ছাড়া ২০২১ সালে তিনি নিজেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পরিচয় দিয়ে চাকরির সুপারিশ করেছিলেন। সে ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
জানতে চাইলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ড. আতিকুল ইসলাম পাঠান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরনের কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন কথা ছড়িয়ে কেবল আমার ক্ষতি করার বা আমাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র আজ নতুন নয়, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট চক্র আমাকে নানাভাবে অসম্মান করার চেষ্টা করে আসছে। তারা আমাকে বিভিন্ন সময় মানসিক কষ্ট দিলেও আল্লাহর রহমতে আমার বড় কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলোও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আমি যে গবেষণা বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করছি, সেটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হিসেবে পরিচিত। গবেষণা পরিচালকের কোনো নিজস্ব আর্থিক ক্ষমতা নেই; ১০ টাকা খরচ করতে হলেও তা প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের মাধ্যমে করতে হয়। কেনাকাটা থেকে শুরু করে সমস্ত খরচ নিয়ন্ত্রণ করে ওই বিভাগগুলো। তাই আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
এদিকে এসব অনিয়মের জের ধরে নায়েমের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ড. ওয়াসীম মো. মেজবাহুল হককে প্রশাসন বিভাগের পরিচালক মো. শাহজাহান ‘হেনস্তা’ করে তাকে ‘মারতে গিয়েছেন’ বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে গত ৪ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের কাছে মৌখিক অভিযোগ দেন কয়েকজন কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট। তারা জানান, এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
জানতে চাইলে প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক মো. শাহজাহান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গত ৪ আগস্ট নায়েমের প্রশাসনিক ভবনের ৮ম তলার কনফারেন্স কক্ষে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মূল্যায়ন বিষয়ে অনুষ্ঠিত ফোকাসড গ্রুপ ডিসকাশন (এফজিডি) প্রোগ্রামে ডিজি স্যার আসতে দেরি করেন। পরে আমি গবেষণার লিড রিসার্চার আতিকুল ইসলাম পাঠানের কাছে গবেষণার বিষয়বস্তু, গবেষণা পদ্ধতি, নির্বাচনপদ্ধতি এবং তথ্য সংগ্রহের আওতা সম্পর্কে জানতে চাই। রিসার্চ টিমের জবাবে গবেষণার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা (মাত্র দুই বিভাগ থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ) পেলে তাদের সেসব বিষয়ে কার্যকর উপায়ে কাজ করার বিষয়ে অনুরোধ জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডিজি মহোদয় কনফারেন্স কক্ষে এলে তিনি এফডিজি শুরু করার নির্দেশ দেন। আমি ডিজি মহোদয়কে কেবল দেশের দুটি জায়গায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে জানাই এবং রিসার্চকে ফলপ্রসূ করার জন্য এ বিষয়ে আরও আলোচনা করার অনুরোধ জানাই। তখন ডিজি মহোদয় জানান, আজকের প্রোগ্রামটি নির্ধারণ করা হয়েছে কেবল এফডিজি করার জন্য, এ প্রেক্ষিতে তিনি এফডিজিকে এগিয়ে নিতে চান। তিনি সবাইকে শুধু শোনার জন্য নির্দেশনা দেন এবং কোনো মন্তব্য না করতে নির্দেশনা দেন। আমি এটির প্রতিবাদ জানালে তিনি উত্তেজিত হয়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। এতে আমিসহ উপস্থিত ব্যক্তিরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। কিন্তু এ ঘটনাকেই উল্টো প্রচার করা হয়েছে আমি নাকি মারতে গিয়েছি।’
এ ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. ওয়াসীম মো. মেজবাহুল হক তার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠানে অনেক কিছুই হবে। সেটা আমরা নিজেরা সমাধান করে নেব।’
অনিয়মের বিষয়ে মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ড. ওয়াসীম মো. মেজবাহুল হক বলেন, ‘যদি এ রকম কিছু হয়ে থাকে, তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আছে, তারা তদন্ত করে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।’
তবে সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে নায়েমের সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরোধের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম করতে চাপ অনুভব করছেন বলে এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। তারা অবিলম্বে সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতনদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।



