যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫.১২ শতাংশ, নীতি সহায়তা বাড়ানোর দাবি

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির চাপের মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ ৭ হাজার ৪৯৫ দশমিক ৬১ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই রপ্তানি ছিল ৭ হাজার ১৩০ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ডলার।
তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। সেই তুলনায় প্রাপ্তি কম হলেও খাতসংশ্লিষ্টরা এটিকে উল্লেখযোগ্য অর্জন বলছেন। তাদের দাবি, সরকার নীতিগত সহায়তা বাড়ালে রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব।
ওভেন পোশাকের চেয়ে নিটওয়্যার রপ্তানি বেড়েছে বেশি হারে। নিটওয়্যার রপ্তানি ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ১৯৩ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০১ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় উত্থান
প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সর্বোচ্চ। দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬১২.৯২ মিলিয়ন ডলার। এতে মোট পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ২০ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ।
নন-ট্র্যাডিশনাল বা অপ্রচলিত বাজারেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে চোখে পড়ার মতো। এসব বাজারে রপ্তানি ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২৩ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলারে। ফলে মোট রপ্তানিতে এই বাজারগুলোর অংশও বেড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে ধীরগতি
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক গন্তব্য বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) প্রবৃদ্ধি হয়েছে তুলনামূলক কম। ইইউতে রপ্তানি ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৩ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার। এতে মোট রপ্তানিতে ইইউর অংশ ৪৭ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশ।
যুক্তরাজ্য ও কানাডায় রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। মোট রপ্তানিতে এই দুই দেশের অংশ প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ৮০৪ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ০ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি।
নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ, স্পেনে ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। তবে ফ্রান্সে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং পর্তুগালে কমেছে ১৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
তুরস্কে রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ, রাশিয়া-চীনে ধাক্কা
নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারগুলোর মধ্যে তুরস্কে রপ্তানি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। দেশটিতে রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ডলার, যা সব বাজারের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।
ব্রাজিলে রপ্তানি বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেড়েছে ২৪ দশমিক ২১ শতাংশ।
রাশিয়া, চীন ও ভারতে অবশ্য বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। রাশিয়ায় কমেছে ৩৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, চীনে কমেছে ১৬ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং ভারতে কমেছে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার এবং নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারের বৈচিত্র্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। বিপরীতে, রপ্তানির বড় অংশ ধরে রাখা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার বাড়ছে ধীরগতিতে, এবং মোট রপ্তানিতে এর অংশ কমছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী মন্দার মতো অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। পোশাক রপ্তানিতে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কম নয়, বরং এটি উল্লেখযোগ্য।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভালো করেছি। তবে কম চাহিদার কারণে ইউরোপীয় বাজার এখনও সংকটে রয়েছে। অন্যদিকে নতুন বাজারগুলোতে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি উৎসাহব্যঞ্জক।’
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘নতুন বাজারগুলোতে রপ্তানি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এজন্য সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে, যা বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে।’
বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রপ্তানি টিকিয়ে রাখা এবং আরও বাড়ানোর জন্য বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর নেতারা সরকারের কাছে বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন।
পোশাক রপ্তানিকারকরা রপ্তানির ওপর বিদ্যমান উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ দশমিক ৬৫ শতাংশ করার এবং আগামী পাঁচ বছর তা অপরিবর্তিত রাখার দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া নগদ প্রণোদনার ওপর শূন্য শতাংশ কর আরোপেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের মজুরি ও বোনাস পরিশোধের জন্য ব্যাংকের তারল্য সুবিধা, বিশেষ করে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে— কৃত্রিম তন্তু আমদানির ওপর কর প্রত্যাহার, সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানার ওপর কর কমানো, কারখানার আয়কর হার স্থিতিশীল রাখা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বকেয়া নগদ প্রণোদনা দ্রুত ছাড় করা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।


