কোহলির ঝোড়ো ফিফটির পরও ম্যাচসেরা কাম্বোজ

ব্যাট হাতে ৫১ বলে ৭৪ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেছেন বিরাট কোহলি। বল হাতে চার উইকেট নিয়েছেন আর্শদীপ সিং। তবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের জয়ের পর ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠেছে অন্য একজনের হাতে। তিনি অংশুল কাম্বোজ। ১০ ওভারে মাত্র ২২ রান দিয়ে দুই উইকেট নিয়েছেন এই পেসার। তার ৬০ বলের মধ্যে ৪৬টিই ছিল ডট। এমন দুর্দান্ত বোলিংয়ের পর কোহলি-আর্শদীপকে পেছনে ফেলে ম্যাচসেরা হয়েছেন কাম্বোজ। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে ৫ উইকেটে হারিয়ে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরু করেছে ভারত।
বুধবার (৪ নভেম্বর) অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে মুখোমুখি হয় ভারত। টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে ৪০ দশমিক ২ ওভারে ১৮৫ রানে অলআউট হয় স্বাগতিকরা। জবাবে বৃষ্টির কারণে ভারতের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩২ ওভারে ১৪৩ রান। সেই লক্ষ্য ২২ দশমিক ৪ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়েই পেরিয়ে যায় শুভমান গিলের দল। তাতে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল সফরকারীরা।
ম্যাচের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় কোহলির ব্যাটিং। তবে জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন ভারতীয় পেসাররাই। বিশেষ করে কাম্বোজের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে মাঝের ওভারগুলোয় রান তুলতেই হিমশিম খেয়েছেন নিউজিল্যান্ডের ব্যাটাররা।
যশপ্রীত বুমরাহ, মোহাম্মদ সিরাজ ও প্রসিধ কৃষ্ণার অনুপস্থিতিতে ভারতের পেস আক্রমণ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন আর্শদীপ, গুরনুর ব্রার ও কাম্বোজ।
ভারতের হয়ে প্রথম আঘাত হানেন আর্শদীপ। দলীয় ২২ রানে উইল ইয়ংকে ফিরিয়ে দেন তিনি। এরপর হেনরি নিকোলসকেও সাজঘরের পথ দেখান বাঁহাতি এই পেসার। প্রথম ১০ ওভারে মাত্র ৪৫ রান তুলতেই ২ উইকেট হারায় নিউজিল্যান্ড।
এরপর গুরনুর ব্রারের গতি ও বাউন্সের সামনে সমস্যায় পড়েন স্বাগতিক ব্যাটাররা। টিম সেইফার্টকে ফেরানোর পর নিজের বলে দারুণ ক্যাচ নিয়ে টম ল্যাথামকেও আউট করেন তিনি। ৩৮ রান করা সেইফার্ট ছিলেন নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।
রোহিত শর্মার সরাসরি থ্রোতে ড্যারিল মিচেল রানআউট হলে আরও বিপাকে পড়ে নিউজিল্যান্ড। ২৮ রান করে ফিরতে হয় তাকে। দলীয় ৯৭ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলে স্বাগতিকরা।
এরপর ম্যাচে নিজের প্রভাব আরও স্পষ্ট করেন কাম্বোজ। মিচেল স্যান্টনারকে বোল্ড করার পর নাথান স্মিথকেও ফেরান তিনি। স্মিথের ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে আসা বল দ্বিতীয় স্লিপে দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত করেন কোহলি। মাত্র ১ রান করে ফিরতে হয় নিউজিল্যান্ডের এই ব্যাটারকে।
তবে কাম্বোজের বোলিংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল রান আটকে রাখার দক্ষতা। পুরো ১০ ওভারে মাত্র ২২ রান দিয়েছেন তিনি। ওভারপ্রতি খরচ করেছেন ২ দশমিক ২০ রান। দুটি মেডেনের পাশাপাশি তার করা ৪৬টি ডট বল প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
এই পারফরম্যান্সে বিশেষ একটি পরিসংখ্যানেও নাম লিখিয়েছেন কাম্বোজ। ২০০৫ সালের পর ভারতের কোনো পেসারের পূর্ণ ১০ ওভারের ওয়ানডে স্পেলে এটিই যৌথভাবে সবচেয়ে সাশ্রয়ী বোলিং। এর আগে আশিস নেহরা, অজিত আগারকার ও যশপ্রীত বুমরাহও ১০ ওভারে ২২ রান দিয়েছিলেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একই কীর্তি গড়েছিলেন বুমরাহ।
কাম্বোজের জন্য পারফরম্যান্সটি আরও বিশেষ। কারণ গত অক্টোবরেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে ১০ ওভারে ৮২ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি তিনি। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই সেই হতাশা কাটিয়ে ম্যাচসেরা হলেন ২৫ বছর বয়সী এই পেসার।
অন্যদিকে চার উইকেট নিলেও আর্শদীপের ১০ ওভারে রান খরচ হয়েছে ৭০। বিশেষ করে শেষ দিকে ব্লেয়ার টিকনারের আক্রমণের মুখে পড়েন তিনি। তার শেষ ওভারে তিনটি ছক্কা হাঁকান নিউজিল্যান্ডের এই পেসার।
টিকনারের ২৩ বলে ৩৪ রানের ইনিংসে শেষ পর্যন্ত ১৮৫ রানে পৌঁছায় নিউজিল্যান্ড। শেষ উইকেটে জ্যাকব ডাফির সঙ্গে ৩৯ রান যোগ করেন তিনি। গুরনুর ৪৪ রানে ৩ এবং কাম্বোজ ২২ রানে ২ উইকেট নেন। অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডের ১০ উইকেটের মধ্যে ৯টিই নিয়েছেন ভারতের পেসাররা। অন্যটি এসেছে রানআউট থেকে।
তবে লক্ষ্য তাড়ায় ভারতের শুরুটা ছিল হতাশার। প্রথম ওভারেই রানের খাতা না খুলে ফেরেন রোহিত শর্মা। কাইল জেমিসনের বলে মিচেল স্যান্টনারের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। ছয় বল খেলে শূন্য রানে বিদায় নেন ভারতীয় ওপেনার।
এরপর অবশ্য অধিনায়ক শুভমান গিলকে নিয়ে ইনিংস সামলান কোহলি। বৃষ্টির কারণে একাধিকবার খেলা বন্ধ হলেও ব্যাটিংয়ের ছন্দ হারাননি ভারতের অভিজ্ঞ এই ব্যাটার।
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিলেন কোহলি। মাত্র ৩৫ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৫১ বলে ১৩টি চার ও একটি ছক্কায় ৭৪ রান করেন। ওয়ানডেতে তিন নম্বরে ব্যাট করে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১৩ হাজার রানের মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন তিনি।
অন্যদিকে গিল তুলনামূলক ধীরগতিতে ব্যাট করলেও এক প্রান্ত আগলে রাখেন। ৫৬ বলে ৩৭ রান করেন ভারতীয় অধিনায়ক। দ্বিতীয় উইকেটে দুজনের ১১৩ রানের জুটিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সফরকারীদের হাতে।
তবে শেষ দিকে দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে ভারত। দলীয় ১১৪ রানে গিল ফেরার পর ১২৪ রানের মধ্যেই বিদায় নেন কোহলি ও অক্ষর প্যাটেল। শ্রেয়াস আইয়ার ১৫ রান করলেও শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকতে পারেননি।
মাত্র ২২ রানের ব্যবধানে চার উইকেট হারিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে সফরকারীরা। নিউজিল্যান্ডের হয়ে জ্যাকব ডাফি তিন উইকেট নিয়ে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেন। তবে ভারতের লক্ষ্য তখন নাগালের মধ্যেই ছিল।
শেষ পর্যন্ত লোকেশ রাহুল ও নামান ধির অপরাজিত থেকে দলের জয় নিশ্চিত করেন। নামানের ব্যাট থেকে আসে জয়সূচক বাউন্ডারি। ২২ দশমিক ৪ ওভারে ৫ উইকেটে ১৪৩ রান তুলে মাঠ ছাড়ে ভারত।


