স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারির কথা জানত সবাই, ৮ বছর পর খাজার বিস্ফোরক দাবি

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় ২০১৮ সালের স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে বল বিকৃতির ঘটনায় নিষিদ্ধ হয়েছিলেন স্টিভ স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার ও ক্যামেরন ব্যানক্রফট।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তদন্তে উঠে এসেছিল, স্যান্ডপেপার দিয়ে বল বিকৃতির পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতেন কেবল এই তিন ক্রিকেটারই। তবে ঘটনার আট বছর পর সেই তদন্তের ফল নিয়েই বড় প্রশ্ন তুললেন উসমান খাজা। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই ওপেনারের দাবি, স্যান্ডপেপার ব্যবহারের বিষয়টি দলের সবার জানা ছিল। শুধু তা-ই নয়, কেপটাউনে ধরা পড়ার আগের টেস্টেও নাকি স্যান্ডপেপার ব্যবহার করেছিল অস্ট্রেলিয়া।
শনিবার (৭ নভেম্বর) অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম সিডনি মর্নিং হেরাল্ডে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার ও নিজের আত্মজীবনীর অংশে এমন বিস্ফোরক দাবি করেছেন খাজা। আগামী ১০ নভেম্বর প্রকাশিত হতে যাওয়া তার আত্মজীবনী 'সবর' -এ বিস্তারিত তুলে ধরেছেন আট বছর আগের সেই ঘটনা।
খাজার দাবি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। কারণ তার বক্তব্য ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তদন্তের ফল এবং পরবর্তী সময়ে দলের চার বোলারের দেওয়া বিবৃতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
২০১৮ সালের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপটাউনে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে বল বিকৃতির চেষ্টা করতে গিয়ে টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়েছিলেন ব্যানক্রফট। তাকে স্যান্ডপেপার দিয়ে বলের এক পাশ ঘষতে দেখা যায়। পরে সেই স্যান্ডপেপার ট্রাউজারের ভেতরে লুকানোর চেষ্টা করেন তিনি। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই ক্রিকেটবিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়।
তদন্ত শেষে অধিনায়ক স্মিথ ও সহ-অধিনায়ক ওয়ার্নারকে ১২ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। ব্যানক্রফট পান ৯ মাসের নিষেধাজ্ঞা। নেতৃত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয় স্মিথ ও ওয়ার্নারকে। তদন্তে সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না মিললেও ঘটনার পর প্রধান কোচের দায়িত্ব ছেড়ে দেন ড্যারেন লেম্যান।
কিন্তু আট বছর পর খাজা জানালেন, এই কেলেঙ্কারির বিষয়ে কেবল তিনজন নয়, পুরো দলই অবগত ছিল। তার ভাষায়, ‘এটা আমাদের সবার ব্যাপার ছিল। শুধু ব্যাটাররা নয়, শুধু বোলাররা নয়, শুধু কোচিং স্টাফ নয়, আমরা সবাই।’
খাজার দাবি অনুযায়ী, স্যান্ডপেপার ব্যবহারের পরিকল্পনা প্রথম তৈরি হয়েছিল কেপটাউনের আগের টেস্টেই। পোর্ট এলিজাবেথে, বর্তমানে যেটি গেবেখা নামে পরিচিত, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালে বলের এক পাশ রুক্ষ করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে ড্রেসিংরুমে খোলামেলা আলোচনা হয়েছিল।
তার আত্মজীবনীর বর্ণনা অনুযায়ী, সেন্ট জর্জ পার্কের ড্রেসিংরুমে সেই আলোচনার একপর্যায়ে স্যান্ডপেপার ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। বলের এক পাশ রুক্ষ করে রিভার্স সুইং আদায়ের এই উপায় কার্যকর হতে পারে বলে মনে করা হয়েছিল।
খাজা জানিয়েছেন, সেই আলোচনা চলাকালে স্মিথ হাত তুলে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি এ বিষয়ে আর কিছু জানতে চান না। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইনিংস চলাকালে স্যান্ডপেপার ব্যবহারের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেন ব্যানক্রফট।
খাজার দাবি, পোর্ট এলিজাবেথ টেস্টেই স্যান্ডপেপার ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই সময় বলের অস্বাভাবিক সুইং নিয়েও মাঠে আলোচনা হয়েছিল ক্রিকেটারদের মধ্যে। তবে তার এই দাবির পক্ষে এখনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
পরের টেস্টে কেপটাউনে আবারও একই ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন খাজা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ম্যাচে ব্যানক্রফটের পাশেই বসেছিলেন তিনি। কোচিং স্টাফের এক সদস্যের সঙ্গে ব্যানক্রফটের কথোপকথনও তার নজরে এসেছিল। এরপরই আবার স্যান্ডপেপার ব্যবহারের ঘটনা ঘটে, যা টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
খাজার এই বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার চার বোলার প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়ন যৌথ বিবৃতিতে দাবি করেছিলেন, বল বিকৃতির উদ্দেশ্যে কোনো বাইরের বস্তু মাঠে নেওয়া হয়েছিল বলে তারা জানতেন না।
অথচ খাজা বলছেন, স্যান্ডপেপার ব্যবহারের আলোচনা দলের মধ্যে গোপন ছিল না। ব্যাটার, বোলার কিংবা কোচিং স্টাফ, সবাই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
শুধু ঘটনার বিবরণই নয়, কেপটাউন কেলেঙ্কারির পর দলের ভেতরে কী ঘটেছিল, সেটিও তুলে ধরেছেন খাজা। তার দাবি, ঘটনার পর ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের সম্মিলিতভাবে দায় স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
খাজা বলেন, 'আমি তখনই বলেছিলাম, দল হিসেবে আমাদের দায় নেওয়া উচিত। আমরা সবাই জানতাম কী ঘটছে। তাই দায়টাও দলের নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই তিনজনকেই সবকিছুর মূল্য দিতে হয়েছে।'
তবে সেই প্রস্তাবে সাড়া মেলেনি। শেষ পর্যন্ত স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফটকেই শাস্তির মুখে পড়তে হয়। খাজার মতে, পুরো ঘটনার দায় কেবল তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় হয়েছে।
এতদিন পর মুখ খোলার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই সাবেক ওপেনার। তিনি ভেবেছিলেন, গত আট বছরে কেউ না কেউ পুরো ঘটনা প্রকাশ করবেন। বিশেষ করে ওয়ার্নার কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো ক্রিকেটারের কাছ থেকে সত্য সামনে আসবে বলে আশা করেছিলেন তিনি।
খাজা বলেন, ‘আদর্শ পরিস্থিতিতে আমি এসব বলতে চাইতাম না। সত্যটা প্রকাশ করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে চাইনি। কিন্তু আট বছর পরও পুরো সত্য সামনে আসেনি। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো ওয়ার্নার কিংবা অন্য কেউ বিষয়টি প্রকাশ করবে।’
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খাজা। তার দাবি, কেপটাউন টেস্টে ব্যানক্রফটের পাশেই বসেছিলেন তিনি। তা সত্ত্বেও ঘটনার তদন্তের সময় তার সঙ্গে কোনো কথা বলা হয়নি।
খাজার ধারণা, তিনি পুরো দলের সম্মিলিত দায় স্বীকারের পক্ষে ছিলেন বলেই হয়তো তদন্তকারীরা তার সাক্ষাৎকার নেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি।
এদিকে খাজার বক্তব্য প্রকাশের পর নিজেদের পুরোনো তদন্তের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০১৮ সালের তদন্তে পাওয়া সব প্রাসঙ্গিক তথ্য যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল। সেই তদন্তের ফল নিয়ে এখনো সন্তুষ্ট তারা।
তবে নতুন কোনো প্রাসঙ্গিক তথ্য থাকলে সেটি জমা দেওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে বলে জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
খাজার দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন ঘটনার সময় অস্ট্রেলিয়ার প্রধান কোচের দায়িত্বে থাকা ড্যারেন লেম্যানও। শনিবার এবিসি স্পোর্টকে তিনি জানিয়েছেন, স্যান্ডপেপার ব্যবহারের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে তার ব্যক্তিগতভাবে কোনো ধারণা ছিল না।
লেম্যান বলেন, দলের সবাই স্যান্ডপেপার ব্যবহারের বিষয়টি জানতেন বলে তিনি মনে করেন না। তবে সেই সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিভিন্ন উপায়ে বলের অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা প্রচলিত ছিল বলেও স্বীকার করেছেন সাবেক এই কোচ।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া খাজা অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৮৮টি টেস্ট খেলেছেন। তার আত্মজীবনী 'সবর' প্রকাশিত হওয়ার কথা আগামী মঙ্গলবার। বইটির একটি অধ্যায়েই উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের বহুল আলোচিত এই কেলেঙ্কারির বিস্তারিত বিবরণ।
আট বছর আগে ক্রিকেটবিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া ঘটনার দায় শেষ পর্যন্ত তিন ক্রিকেটারের ওপরই বর্তেছিল। কিন্তু খাজার নতুন বক্তব্য সেই তদন্ত এবং অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন ড্রেসিংরুমের ভূমিকা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে। যদিও তার অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াও তদন্তের আগের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। ফলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হলেও স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারির পূর্ণাঙ্গ সত্য নিয়ে মতবিরোধ এখনো কাটেনি।


