নিউজিল্যান্ডের জার্সিতে আর দেখা যাবে না উইলিয়ামসনকে

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক কেইন উইলিয়ামসন। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হচ্ছে অবিলম্বে। ফলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চলমান টেস্ট সিরিজের বাকি ম্যাচগুলোতেও আর দেখা যাবে না ৩৫ বছর বয়সি এই ব্যাটসম্যানকে।
লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টই হয়ে থাকল উইলিয়ামসনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সেই টেস্টে দুই ইনিংসে তিনি করেন ০ ও ১৮ রান। তিন ম্যাচের সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হওয়ার কথা ১৭ জুন, ওভালে। তবে তার আগেই আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ করে দিলেন নিউজিল্যান্ডের সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান।
উইলিয়ামসন বিদায় নিচ্ছেন নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক রানসংগ্রাহক হিসেবে। ২০১০ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩৭৮ ম্যাচে তার রান ১৯ হাজার ৩৪৬। সেঞ্চুরি ৪৮টি, ডাবল সেঞ্চুরি ছয়টি।
টেস্ট ক্রিকেটে ব্ল্যাক ক্যাপসদের সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যানও উইলিয়ামসন। ১১০ টেস্টে ৫৪.০৬ গড়ে করেছেন ৯ হাজার ৫১৫ রান। সেঞ্চুরি ৩৩টি, ফিফটি ৩৮টি। ১০ হাজার টেস্ট রানের মাইলফলক থেকে মাত্র ৪৮৫ রান দূরে থেমে গেল তার পথচলা।
নিউজিল্যান্ডকে দীর্ঘ সময় নেতৃত্বও দিয়েছেন উইলিয়ামসন। সব সংস্করণ মিলিয়ে ২০৬ ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেছেন তিনি—৪০ টেস্ট, ৯১ ওয়ানডে ও ৭৫ টি-টোয়েন্টি। তার নেতৃত্বেই নিজেদের সোনালি সময় কাটিয়েছে নিউজিল্যান্ড। ২০২১ সালে প্রথম বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে ব্ল্যাক ক্যাপসরা। একই সময়ে ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালেও ওঠে দলটি।
অবসরের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উইলিয়ামসন জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি কিছুদিন ধরেই ভাবছিলেন। শেষ কয়েক দিনে তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, সরে দাঁড়ানোর এটাই সঠিক সময়। নিউজিল্যান্ডের হয়ে খেলার প্রতি নিজের নিবেদন নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।
উইলিয়ামসনের ভাষায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রতি তার ক্ষুধা সবসময়ই প্রবল ছিল। নিউজিল্যান্ডের হয়ে প্রতিটি ম্যাচে নিজের সবটুকু দেওয়ার গর্ব নিয়েই তিনি বিদায় নিচ্ছেন। পুরো মনোযোগ ও তাড়না ছাড়া খেলে যাওয়া তার কাছে ঠিক মনে হয়নি।
জাতীয় দল নিয়ে আশাবাদও রেখে গেছেন তিনি। বর্তমান নিউজিল্যান্ড দলে অনেক প্রতিভা আছে এবং বিশেষ কিছু করার ইচ্ছাও প্রবল—এমন বিশ্বাস উইলিয়ামসনের। দীর্ঘ সময় যে দলকে ভালোবেসে খেলেছেন, সেই দল তার হৃদয়ে সবসময় থাকবে বলেও জানিয়েছেন সাবেক অধিনায়ক।
নিউজিল্যান্ডের প্রধান কোচ রব ওয়াল্টার উইলিয়ামসনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তার মতে, উইলিয়ামসনের পরিসংখ্যান ও ব্যাটিং দক্ষতা নিজেই কথা বলে। তবে ব্ল্যাক ক্যাপস দলের সংস্কৃতি, মানসিকতা ও মানদণ্ডে তার প্রভাবই সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।
উইলিয়ামসনকে অসাধারণ ক্রিকেটার, দারুণ সতীর্থ, চমৎকার নেতা ও খেলাটির বড় দূত হিসেবে উল্লেখ করেছেন ওয়াল্টার। তার মতে, উইলিয়ামসন সবসময় দলকে আগে রেখেছেন। তাই তাকে হারানো কষ্টের হলেও নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি শান্তিতে আছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি অলরাউন্ডার স্যার রিচার্ড হ্যাডলিও উইলিয়ামসনকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। তার চোখে উইলিয়ামসন ছিলেন অসাধারণ ক্রিকেটার ও অটল নেতৃত্বের প্রতীক; নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের অনেক বড় মুহূর্তের স্থপতি।
উইলিয়ামসনের বিদায়ে টেস্ট ক্রিকেটের বিখ্যাত ‘ফ্যাব ফোর’ থেকেও আরেকজন সরে গেলেন। বিরাট কোহলির টেস্ট অবসরের পর এবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়লেন উইলিয়ামসন। এখন সেই প্রজন্মের টেস্ট ব্যাটিংয়ের বড় প্রতিনিধি হিসেবে রয়ে গেলেন জো রুট ও স্টিভ স্মিথ।
মার্টিন ক্রোর পর নিউজিল্যান্ড ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার বহন করেছেন উইলিয়ামসন। নরম হাতে দেরিতে খেলা, বলকে থার্ড ম্যান অঞ্চলে চালনা করার অদ্ভুত দক্ষতা, চাপের মধ্যেও শান্ত থাকা—এসব গুণ তাকে আলাদা করেছে সমসাময়িকদের থেকে।
২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের বেদনা, ২০২১ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের আনন্দ—দুটিই উইলিয়ামসনের ক্যারিয়ারের প্রতীক হয়ে থাকবে। একদিকে অবিশ্বাস্য ভদ্রতা ও সংযম, অন্যদিকে ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতা ও নেতৃত্বে স্থিরতা।
