আইসিসির বিশেষ দায়িত্বে বাংলাদেশের আম্পায়ার গাজী সোহেল

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের আম্পায়ারদের জন্য নতুন এক অর্জন। এবার আইসিসির লেভেল-২ আম্পায়ার মাস্টার এডুকেটর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন গাজী আশরাফুল আফসার সোহেল। বিশ্বের ১৩টি দেশের মাত্র ২০ জনকে নিয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষকদের এই তালিকায় জায়গা পেয়েছেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ এই আম্পায়ার। নতুন এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি তিনি। এশিয়া অঞ্চল থেকে নির্বাচিত তিনজনের একজনও সোহেল।
গত ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে লেভেল-২ মাস্টার এডুকেটরদের ২০ সদস্যের তালিকা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত চার দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন তারা। বিশ্বের পাঁচটি অঞ্চল থেকে পূর্ণ সদস্য ও সহযোগী সদস্যদেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
আইসিসির প্রকাশিত তালিকায় এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছে সোহেলের নাম। তার সঙ্গে নির্বাচিত অন্য দুজন হলেন ভারতের সাবেক আন্তর্জাতিক আম্পায়ার সুন্দরম রবি ও ভ্রিন্দা ঘনশ্যাম রাঠি। অর্থাৎ এশিয়ার তিন প্রতিনিধির মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে জায়গা পেয়েছেন সোহেল।
তবে আইসিসির এই স্বীকৃতি সরাসরি মাঠে আম্পায়ারিংয়ের জন্য নয়। মাস্টার এডুকেটর হিসেবে তার দায়িত্ব হবে সংস্থাটির নতুন লেভেল-২ আম্পায়ার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনায় ভূমিকা রাখা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আম্পায়ারদের দক্ষতা বৃদ্ধি, ম্যাচ পরিচালনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা উন্নয়নের লক্ষ্যে এই প্রশিক্ষণব্যবস্থা চালু করেছে আইসিসি।
সংস্থাটি জানিয়েছে, বিশ্বের পাঁচটি অঞ্চল থেকে নির্বাচিত ১৩ দেশের ২০ জনকে নিয়ে ম্যানিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। চার দিনের কর্মসূচিতে কোর্স পরিচালনার পদ্ধতি, শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার এবং প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষতা মূল্যায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মূলত বিভিন্ন দেশে যাতে একই মানদণ্ডে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সে লক্ষ্যেই মাস্টার এডুকেটরদের প্রস্তুত করেছে আইসিসি। নতুন কোর্সের মাধ্যমে সদস্যদেশগুলোর আম্পায়ারদের উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।
আইসিসির নতুন লেভেল-২ কোর্স বর্তমানে সদস্যদেশগুলোর জন্য চালু করা সর্বোচ্চ পর্যায়ের আম্পায়ার প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃতি কার্যক্রম। এর আগে ফাউন্ডেশন ও লেভেল-১ পর্যায়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। নতুন কোর্সের মাধ্যমে আম্পায়ারদের উন্নয়নের জন্য আরও একটি ধাপ যুক্ত হয়েছে।
গত ৩১ অক্টোবর ম্যানিলাতেই নতুন কোর্সটির প্রথম আঞ্চলিক কার্যক্রম শুরু হয়। পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আটটি সদস্যদেশের ১৮ জন আম্পায়ার এতে অংশ নেন। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চার দিনের সেই কোর্স শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে আইসিসির মহাব্যবস্থাপক (উন্নয়ন) উইল গ্লেনরাইট জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ পরিচালনার মান উন্নত করতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে সদস্যদেশগুলোর আম্পায়াররা যেন সমানভাবে উচ্চমানের প্রশিক্ষণের সুযোগ পান, সেটিও নিশ্চিত করতে চায় সংস্থাটি।
গ্লেনরাইটের মতে, বিশ্বের পাঁচটি অঞ্চল থেকে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের একত্র করে নতুন কর্মসূচি পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সদস্যদেশগুলোর আম্পায়ারদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন জিম্বাবুয়ের আন্তর্জাতিক আম্পায়ার ও লেভেল-২ মাস্টার এডুকেটর ল্যাংটন রুসেরেও। তার মতে, ভালো আম্পায়ার হতে শুধু ক্রিকেটের আইন জানাই যথেষ্ট নয়। চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস ও বিচক্ষণতাও প্রয়োজন। নতুন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের আম্পায়ারদের সেই দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা সম্ভব হবে।
আইসিসির তথ্য অনুযায়ী, তাদের বৈশ্বিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি কোর্স সম্পন্ন হয়েছে। শুধু আম্পায়ারিংয়ের ফাউন্ডেশন, লেভেল-১ ও টিউটর লেভেল-১ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৬ হাজার। নতুন লেভেল-২ কোর্সের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের আম্পায়ারিংয়ে পরিচিত মুখ গাজী সোহেল। দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ম্যাচেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০১২ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ২০১৮ সালের নভেম্বরে আইসিসির ইন্টারন্যাশনাল প্যানেলে জায়গা পান এই বাংলাদেশি আম্পায়ার।
বয়সভিত্তিক বিশ্বকাপেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে সোহেলের। ২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনা করেন তিনি। সেবার দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠের আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের এই প্রতিনিধি।
চলতি বছরের পুরুষদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সোহেল। বাংলাদেশের আরেক আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকতের সঙ্গে ২৪ সদস্যের আম্পায়ার প্যানেলে জায়গা পেয়েছিলেন তিনি।
তবে শরফুদ্দৌলা আইসিসির এলিট প্যানেলের সদস্য হলেও সোহেল রয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল প্যানেলে। নতুন মাস্টার এডুকেটর স্বীকৃতির ফলে তার মাঠে আম্পায়ারিংয়ের প্যানেল পরিবর্তন হয়নি। বরং ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

