বিশ্বকাপ বিদায়ের অদ্ভুত সব গল্প

বিশ্বকাপ শুধু মাঠে শুরু হয় না; তার আগেই শুরু হয়ে যায় আরেক ধরনের আয়োজন—বিদায়, আবেগ, প্রতীক আর জাতীয় পরিচয়ের প্রদর্শনী। কেউ দলকে বিদায় জানায় ‘ওয়াটার স্যালুট’ বা পানির আর্চে, কেউ শত গাড়ির বহর নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেয়, কেউ আবার খালি স্টেডিয়ামের মাঝমাঠে বসে ঐতিহ্যবাহী খাবার খেয়ে সারে শেষ দলীয় ভোজ।
বড় টুর্নামেন্টে যাওয়ার আগে জাতীয় দলকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানোর রীতি নতুন নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সেই বিদায় এখন আর নিছক আনুষ্ঠানিকতা থাকে না। প্রতিটি দেশ যেন নিজের সংস্কৃতি, আবেগ ও ফুটবল-পরিচয়কে দৃশ্যমান করতে চায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে দলগুলোর বিদায়-আয়োজনে সেই প্রবণতাই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শুরু করা যাক ব্রাজিল দিয়ে। যে দেশে ফুটবলকে প্রায় ধর্মের মর্যাদায় দেখা হয়, সেখানে বিশ্বকাপযাত্রার আগে বিমানের ‘বাপ্তিস্ম’ খুব অস্বাভাবিক শোনায় না। রিও দে জেনেইরোর গালেও বিমানবন্দর থেকে নিউ জার্সির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে ব্রাজিল দলকে বহনকারী বিমানকে দেওয়া হয় ওয়াটার স্যালুট (Water Salute)। রানওয়ের দুই পাশে দাঁড়ানো ফায়ার ট্রাক থেকে পানির ধারা ছুড়ে তৈরি করা হয় আর্চ। সেই পানির আর্চের নিচ দিয়ে এগিয়ে যায় বিমানটি।
এটি কোনো ধর্মীয় বাপ্তিস্ম নয়, বরং বিমান চলাচলের পুরোনো প্রতীকী রীতি। গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা, প্রথম ফ্লাইট বা বিশেষ উপলক্ষে এভাবে বিমানকে শুভেচ্ছা জানানো হয়। তবে ব্রাজিলের ক্ষেত্রে দৃশ্যটি আলাদা মাত্রা পেয়েছে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল, আর তাদের বহনকারী বিমান—সব মিলিয়ে সেটি হয়ে ওঠে ফুটবলীয় আশীর্বাদের দৃশ্য। নিউআর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরও একইভাবে পানির আর্চে ব্রাজিলকে স্বাগত জানানো হয়।
ব্রাজিল দলের বিদায়ের আবেগ শুধু বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে দলের সঙ্গে দেখা করেন ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী কোচ লুইজ ফেলিপে স্কলারি। কার্লো আনচেলত্তির দলের সামনে তাঁর উপস্থিতি ছিল এক ধরনের স্মৃতির সেতুবন্ধ—শেষবার ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতেছিল স্কলারির হাত ধরেই। বিদায়ের আগে মারাকানায় শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে পানামাকে ৬-২ গোলে হারানোও সেই আবহকে আরও ফুটিয়ে তুলেছে।
তুরস্কের বিদায় ছিল আরও বেশি শব্দ, আলো আর গতির। ২৪ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা দেশটি নিজেদের দলকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেয় এক বিশাল মোটরকেডে (মোটর শোভাযাত্রা)। ইস্তাম্বুলের রাস্তায় জাতীয় পতাকার লাল রঙে সাজানো শতাধিক গাড়ি, জিপ ও মোটরবাইক দলীয় বাসকে অনুসরণ করে। হর্ন বাজতে থাকে, বন্ধ করে দেওয়া রাস্তা ধরে কাফেলা পেরিয়ে যায় বসফরাসের ওপর ইয়াভুজ সুলতান সেলিম সেতু।
Yolumuz uzun, desteğimiz sonsuz! 🇹🇷
— Togg (@Togg2022) June 2, 2026
Millî Takımımızı dünya sahnesi yolculuğuna uğurlarken aynı gururu paylaşmanın heyecanını yaşıyoruz.
Bayrağımız, tüm coşkumuz ve inancımızla her kilometrede yanınızda olmak bizim için #BirGururMeselesi <❤️🤍>
Yolunuz açık olsun #BizimÇocuklar pic.twitter.com/WRT6s1iQ4t
এই আয়োজন ছিল তুর্কি ফুটবল-উন্মাদনার প্রকাশ। দেশটির জাতীয় দলের বাসকে ঘিরে এই মোটরকেড শুধু বিদায় ছিল না, ছিল ২৪ বছরের অপেক্ষার বিস্ফোরণ। বিমানবন্দরে পৌঁছে তুর্কি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ইব্রাহিম হাজিওসমানওগলু প্রত্যেক খেলোয়াড়কে আলাদা করে শুভকামনা জানান। বিশ্বকাপে ফেরা যে কত বড় আবেগ, তুরস্ক সেটি রাস্তায় নামিয়ে দেখিয়েছে।
সেনেগালের আয়োজন ছিল তুলনামূলক শান্ত, কিন্তু তাতে ছিল গভীর সাংস্কৃতিক ছাপ। ডাকারের আবদুলায়ে ওয়াদে স্টেডিয়ামের ৫০ হাজার আসন সেদিন ছিল খালি। কিন্তু মাঠের মাঝখানে সাজানো লম্বা টেবিলে বসেছিলেন সেনেগাল দলের ফুটবলার ও স্টাফরা। তাঁদের সামনে ছিল ঐতিহ্যবাহী সেনেগালিজ খাবার। পাশে বেজেছে কোরা—২১ তারের হার্পজাতীয় বাদ্যযন্ত্র। কোনো জনসমুদ্র নয়, কোনো গাড়ির বহর নয়, তবু সেটি ছিল নিজের শিকড়কে সঙ্গে নেওয়ার এক নীরব ও সুন্দর আয়োজন।
À l’initiative des joueurs et du sélectionneur, un dîner de convivialité s’est tenu au stade Stade Abdoulaye Wade afin de renforcer l’esprit de groupe avant le départ de l’équipe prévu ce mercredi. Étaient présents les joueurs ainsi que les staffs techniques et administratifs. ✨ pic.twitter.com/oJ4XPheIpA
— Equipe du Sénégal (@GaindeYi) May 27, 2026
জাপানের বিদায়ও ছিল সরল, কিন্তু হৃদয়স্পর্শী। বিশ্বকাপের আগে দেশজুড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে জাতীয় দলের জন্য শুভকামনার বার্তা পাঠাতে বলা হয়েছিল। সেই বার্তাগুলোর একটি বিশেষভাবে নজর কাড়ে কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর। বিমানবন্দরে দলকে বিদায় জানাতে অপেক্ষা করছিলেন সমর্থকেরা। ডিফেন্ডার ইউতো নাগাতোমো ঐতিহ্যবাহী জাপানি ‘হাচিমাকি’ (এক ধরনের হেডব্যান্ড) পরে নজর কাড়েন, যা লড়াইয়ের মানসিকতার প্রতীক। মেক্সিকোর মনতেরেইয়ে পৌঁছে জাপান দলকে দেওয়া হয় কাউবয় হ্যাট—আয়োজক দেশের সংস্কৃতির এক মজার স্বাগত।
国税庁✕日本サッカー協会 その②
— サッカー日本代表 🇯🇵 (@jfa_samuraiblue) June 2, 2026
全国各地の小学生から送られてきた応援メッセージの中に森保一監督の出身校・長崎県深堀小学校のものも🏫
後輩たちからのメッセージに目を細める森保監督でした👀#最高の景色を #サッカー日本代表 pic.twitter.com/dZfXWZCm0p
আর্জেন্টিনার বিদায়েও ছিল প্রতীকী ছোঁয়া। মেসিদের বহনকারী আকাশি-সাদা বিমানটি যেন নিজেই হয়ে উঠেছিল আলবিসেলেস্তেদের চলমান ইতিহাস। বিমানের লেজে ছিল লিওনেল মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর। বিমানের নিচে তিনটি সোনালি তারা—আর্জেন্টিকার তিন বিশ্বকাপ জয়ের স্মারক। এমনকি ফ্লাইট নম্বর ‘১৯৭৮’-ও ছিল ইচ্ছাকৃত, আর্জেন্টিনার ঘরের মাঠে জেতা প্রথম বিশ্বকাপের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার গল্প আলাদা। মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে যাচ্ছে তারা; ফলে ঘরের মাঠে উন্মাদনা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। সারায়েভোর গ্রবাভিচা স্টেডিয়ামে শেষ অনুশীলনে খেলোয়াড়দের ঘিরে ধরেন সমর্থকেরা। অটোগ্রাফের অপেক্ষা, ছবি তোলার চাওয়া, বিমানবন্দরের পথে আবেগ—সব মিলিয়ে দেশটির জন্য বিশ্বকাপযাত্রা ছিল বিরল আনন্দের উৎসব।
Final training completed at Grbavica Stadium in Sarajevo. Fans and players spent time together after. Now it is time to go to 🇺🇸 tomorrow!✅ #FIFAWorldCup 📸: N/FS BiH pic.twitter.com/DDCMQprriH
— Bosnian Football (@BosniaNTBall) June 1, 2026
আর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে যাওয়া কেপ ভার্দে যেন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করবে। ‘ব্লু শার্কস’ নামে পরিচিত দলটি ছোট আটলান্টিক দ্বীপপুঞ্জের রাস্তায় সমর্থকদের শুভেচ্ছা নিয়ে এগিয়েছে। পরে বোস্টনগামী বিমানে ওঠার আগে ও ভেতরে সংগীতের তালে নেচেছেন ফুটবলাররা। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেও তারা পেয়েছে উষ্ণ অভ্যর্থনা। বিমানবন্দরের কর্মী থেকে শুরু করে সমর্থকেরা কেপ ভার্দের পতাকা হাতে নেচে তাঁদের স্বাগত জানান।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিদায় ছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে বাফানা বাফানা। তার আগে প্রিটোরিয়ার সেফাকো মাখগাথো প্রেসিডেনশিয়াল গেস্টহাউসে বিদায়ী নৈশভোজে দলের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। তিনি ফুটবলারদের বলেছেন, তাঁরা দেশের আশার দূত এবং জাতীয় পতাকার বাহক।
প্যারাগুয়ের বিদায়েও ছিলেন দেশের প্রেসিডেন্ট। গত সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার পর যে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছিলেন, তিনিই এবার নতুন জাতীয় হাই-পারফরম্যান্স সেন্টার উদ্বোধনের পর দলকে বিদায় জানান। বিশ্বকাপ শুধু খেলোয়াড়দের নয়, রাষ্ট্রেরও গৌরব—প্যারাগুয়ে সেটিই দেখিয়েছে।
তবে সবচেয়ে আবেগী বিদায়ের একটি এসেছে তেহরান থেকে। ইরান দল উত্তর আমেরিকায় যাওয়ার আগে প্রথমে তুরস্কে অনুশীলন ক্যাম্পে যায়। তার আগে তেহরানের এনকেলাব স্কয়ারে হাজারো সমর্থক দলকে বিদায় জানাতে জড়ো হন। যুদ্ধ, ভিসা অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ইরানের এই বিশ্বকাপযাত্রা এমনিতেই ভারী। সেই বাস্তবতায় সমর্থকদের বিদায় সমাবেশ ছিল আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
এই সব আয়োজনের মধ্যে একটি সাধারণ সুর আছে। বিশ্বকাপ দলগুলো শুধু খেলতে যায় না; তারা সঙ্গে নিয়ে যায় নিজেদের দেশ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, অপেক্ষা ও প্রত্যাশা। ব্রাজিলের বিমান যখন পানির আর্চ পেরোয়, তুরস্কের বাস যখন শত গাড়ির বহরে বিমানবন্দরে যায়, সেনেগাল যখন খালি স্টেডিয়ামে ঐতিহ্যবাহী খাবার খায়, কিংবা কেপ ভার্দে যখন প্রথম বিশ্বকাপযাত্রায় বিমানে নাচে—সবকিছুই একই গল্প বলে।
বিশ্বকাপ মাঠে শুরু হওয়ার আগে প্রতিটি দেশ নিজস্ব ভাষায় বলে দেয়, এই টুর্নামেন্ট তাদের কাছে কী অর্থ বহন করে। কারও কাছে এটি বিশ্বাস, কারও কাছে প্রত্যাবর্তন, কারও কাছে প্রথম স্বপ্ন, কারও কাছে যুদ্ধের মধ্যেও আশার প্রদীপ।
আর তাই বিশ্বকাপের বিদায়-অনুষ্ঠানগুলোও এখন নিজেই এক ধরনের শিল্প। মাঠের ফল পরে জানা যাবে। কিন্তু যাত্রার আগেই দেশগুলো নিজেদের গল্প লিখে ফেলছে—পানির ফোয়ারা, গাড়ির বহর, খালি স্টেডিয়ামের ভোজ, পতাকা, গান আর চোখভরা স্বপ্নে।
