ইবোলা কোয়ারেন্টাইন পেরিয়ে বিশ্বকাপে কঙ্গোর ‘জীবন্ত ভাস্কর্য’

মাঠে কঙ্গোর বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল পর্তুগালের বিপক্ষে ড্র দিয়ে। ফলটা ছিল গর্ব করার মতো। কিন্তু কঙ্গোলিজ সমর্থকদের চোখে সেই শুরুতে যেন একটা শূন্যতা ছিল। গ্যালারিতে ছিলেন না লুমুম্বা ভেয়া, সেই পরিচিত সমর্থক, যিনি ৯০ মিনিট স্থির দাঁড়িয়ে থেকে একাই হয়ে ওঠেন প্রতিরোধ, স্মৃতি আর জাতীয় গর্বের প্রতীক।
অবশেষে বিশ্বকাপে তার অপেক্ষা শেষ হলো। ইবোলা-সংক্রান্ত কোয়ারেন্টিনের কারণে প্রথম ম্যাচ মিস করার পর মেক্সিকোতে পৌঁছেছেন লুমুম্বা ভেয়া। গুয়াদালাহারা স্টেডিয়ামে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ডিআর কঙ্গোর ম্যাচে দেখা গেছে তাকে। মাঠে নামার আগেই যেন কঙ্গোর গ্যালারি ফিরে পেল তাদের সবচেয়ে পরিচিত মুখ।
লুমুম্বা ভেয়ার আসল নাম মিশেল কুকা এমবোলাদিঙ্গা। বয়স ৫০। ফুটবল দুনিয়ায় তিনি পরিচিত কঙ্গোর ‘জীবন্ত ভাস্কর্য’ হিসেবে। ডিআর কঙ্গোর পতাকার রং, হলুদ, নীল ও লালের পোশাক পরে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। ডান হাত উঁচু করে স্থির ভঙ্গিতে পুরো ম্যাচ কাটিয়ে দেন। তার এই ভঙ্গি কঙ্গোর স্বাধীনতার নায়ক ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা।
লুমুম্বা শুধু রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, কঙ্গোর স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রতীক। ১৯৬১ সালে তাকে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যু আফ্রিকার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি। সেই ইতিহাসই নিজের শরীরী ভাষায় গ্যালারিতে বহন করেন এমবোলাদিঙ্গা। তাই তার উপস্থিতি শুধু সমর্থনের নয়, স্মরণেরও।
সর্বশেষ আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সে লুমুম্বা ভেয়া আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসেন। কঙ্গোর ম্যাচে তার স্থির দাঁড়িয়ে থাকা ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষ সমর্থকরাও তার সঙ্গে ছবি তুলতে চাইতেন। তিনি চিৎকার করেন না, পতাকা নাড়ান না, উন্মত্ত উদ্যাপনও করেন না। তবু তার উপস্থিতিই গ্যালারির সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্য হয়ে ওঠে।
Lumumba Vea — real name Michel Kuka Mboladinga — is a former baker turned impersonator who pays tribute to DR Congo's first prime minister, Patrice Lumumba.
— The Athletic | Football (@TheAthleticFC) June 24, 2026
He is in position in Guadalajara for his country's game against Colombia.
“He has this special aura. He’s a proper… pic.twitter.com/nrfJINDWVx
এই বিশ্বকাপে তার শুরুটা সহজ ছিল না। ডিআর কঙ্গোতে ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কারণে তাঁকে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়। সেই কারণে পর্তুগালের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। অথচ সে ম্যাচে কঙ্গো ১-১ ড্র করে বড় বার্তা দিয়েছিল। মাঠে দল লড়েছে, কিন্তু গ্যালারিতে অনুপস্থিত ছিল তাদের সেই প্রতীকী মুখ।
কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তাই তার উপস্থিতি কঙ্গো সমর্থকদের জন্য আলাদা অর্থ বহন করেছে। কঙ্গোর জন্য এই বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয়। ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপ মঞ্চে ফেরা, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার পটভূমি, আর দেশের ভেতর স্বাস্থ্য সংকট—সব মিলিয়ে এই দল এক বড় আবেগ বহন করছে। লুমুম্বা ভেয়া সেই আবেগের দৃশ্যমান রূপ।
কলম্বিয়ার বিপক্ষে ফল কঙ্গোর পক্ষে যায়নি। ১-০ গোলে হেরে গ্রুপ ‘কে’-তে তাদের পথ কঠিন হয়ে গেছে। ড্যানিয়েল মুনিয়োসের গোলে জয় পেয়ে কলম্বিয়া শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে। তবে লুমুম্বা ভেয়ার উপস্থিতি ম্যাচের বাইরেও একটি গল্প রেখে গেছে। বিশ্বকাপ শুধু গোল, পয়েন্ট আর টেবিলের হিসাব নয়; কখনো কখনো গ্যালারির একটি মুখও একটি দেশের ইতিহাস, ব্যথা ও আশা তুলে ধরে।
এখন ডিআর কঙ্গোর সামনে শেষ গ্রুপ ম্যাচ। প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তান। ম্যাচটি কঙ্গোর জন্য বাঁচা-মরার হতে পারে। শেষ ৩২-এর আশা ধরে রাখতে হলে তাদের জিততেই হবে, পাশাপাশি অন্য হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সেই ম্যাচেও গ্যালারিতে থাকবেন কি না, সেটি সময় বলবে। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে লুমুম্বা ভেয়ার উপস্থিতি কঙ্গোর গল্পকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তিনি না দৌড়ান, না গান ধরেন, না স্লোগান দেন। তবু তাঁর স্থির ভঙ্গিই বলে দেয়, কঙ্গো এখানে শুধু খেলতে আসেনি, নিজেদের ইতিহাসও নিয়ে এসেছে।





