logo

সালাহর মিসরের সামনে আটকে গেল ডি ব্রুইনার বেলজিয়াম

সালাহর মিসরের সামনে আটকে গেল ডি ব্রুইনার বেলজিয়াম
ম্যাচের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই হোঁচট খেল বেলজিয়াম। সিয়াটলে গ্রুপ ‘জি’র ম্যাচে মিসরের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে রুডি গার্সিয়ার দল। এমাম আশুরের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল মিসর। দ্বিতীয়ার্ধে রোমেলু লুকাকু মাঠে নামার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মোহাম্মদ হানির আত্মঘাতী গোলে সমতায় ফেরে বেলজিয়াম।

স্কোরলাইন বলবে, বেলজিয়াম এক পয়েন্ট পেয়েছে। কিন্তু ম্যাচের গল্প বলবে, এই এক পয়েন্টও তারা কষ্টে উদ্ধার করেছে। অনেক সময় বল দখলে রাখলেও বেলজিয়াম ছিল বিবর্ণ, ধীর এবং আক্রমণে ধারহীন। অন্যদিকে মিসর ছিল পরিকল্পনায় পরিষ্কার, শৃঙ্খলিত এবং পাল্টা আক্রমণে বিপজ্জনক।

ম্যাচের আগে প্রশ্ন ছিল, রুডি গার্সিয়া কেন প্রথাগত নাম্বার নাইন ছাড়া শুরু করছেন। চার্লস দে কেটেলারে ফলস নাইন হিসেবে শুরু করলেও প্রথমার্ধে প্রায় অকার্যকর ছিলেন। বেলজিয়ামের আক্রমণ ছিল, কিন্তু বক্সে উপস্থিতি ছিল না। ডোকু মাঝে মাঝে গতি দেখিয়েছেন, ডি ব্রুইনা কিছু পাসে আলো ছড়াতে চেয়েছেন, কিন্তু মিসরের রক্ষণভাগ খুব ভালোভাবে জায়গা বন্ধ রেখেছে।

হোসাম হাসানের পরিকল্পনা প্রথমার্ধে দুর্দান্ত কাজ করে। মিসর ডি ব্রুইনাকে আলাদা নজরে রেখেছিল। বেলজিয়ামের মাঝমাঠ থেকে সামনে ওঠার পথ বন্ধ করার জন্য তারা মাঝমাঠে চাপ তৈরি করে, ত্রোসার ও ডোকুর সঙ্গে সংযোগ কাটতে দেয়নি। অনানা বল পেলেও তাঁকে জায়গা দেওয়া হয়েছিল, কারণ তাঁর বল ছাড়তে সময় লাগছিল। সেই ধীরতাই বেলজিয়ামের আক্রমণকে আরও জটিল করে তোলে।

মিসর বল পেলেও অযথা নষ্ট করেনি। তাদের আক্রমণ ছিল মাপা, কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত। মোহাম্মদ সালাহকে দেওয়া হয়েছিল কিছুটা স্বাধীন ভূমিকা। তিনি কখনো ডান দিক থেকে ভেতরে এসেছেন, কখনো আক্রমণাত্মক মাঝমাঠের এলাকায় বল নিয়েছেন। প্রথমবার যখন তিনি জায়গা পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন, তখনই তৈরি হলো ম্যাচের প্রথম গোল।

ম্যাচের ২০ মিনিটের মাথায় সালাহ বক্সের বাইরে ফাঁকায় থাকা এমাম আশুরকে খুঁজে পান। বেলজিয়াম রক্ষণ তাঁকে অতিরিক্ত জায়গা দিয়ে ফেলে। আশুর দেরি করেননি। ডান পায়ের জোরালো শটে থিবো কোর্তোয়ার নাগালের বাইরে বল পাঠান তিনি। এগিয়ে যায় মিসর।

গোলের পরও মিসর নিজেদের পরিকল্পনা বদলায়নি। তারা নিচে নেমে বেলজিয়ামকে বল রাখতে দিয়েছে, কিন্তু বিপজ্জনক জায়গায় ঢুকতে দেয়নি। ডোকুকে দ্বৈত মার্কিং, ডি ব্রুইনাকে সীমিত করা, দে কেটেলারের সঙ্গে দুই সেন্টার ব্যাকের লড়াই—সব মিলিয়ে বেলজিয়াম প্রথমার্ধে খুব কমই পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বরং মিসরই দ্বিতীয় গোলের কাছাকাছি গিয়েছিল। প্রথমার্ধের শেষ দিকে বেলজিয়ামের ভুলে ওমর মারমুশ সুযোগ পেয়ে যান। কোর্তোয়া দারুণ সেভে দলকে বাঁচান।

দ্বিতীয়ার্ধে বেলজিয়াম কিছুটা ভালো শুরু করে। ডি ব্রুইনার ফ্রি-কিক ৫৩ মিনিটে পোস্টে লাগে। সেটিই ছিল বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। এরপর আরেক সেট পিসেও তিনি বিপদ তৈরি করেন। কিন্তু মিসরও ভীত হয়নি। তারা পাল্টা আক্রমণে মারমুশ ও সালাহকে ব্যবহার করে বারবার বেলজিয়াম রক্ষণকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

৫৫ মিনিটে কোর্তোয়া সেভ করার পর ফিরতি বল থেকে আশুর সুযোগ নষ্ট করেন। ৫৯ মিনিটে মারমুশ দারুণ এক ‍সুযোগ নষ্ট করেন। ৬৪ মিনিটেও তিনি বেলজিয়াম রক্ষণের পেছনে জায়গা পেয়েছিলেন, কিন্তু কঠিন কোণ থেকে নেওয়া শট প্রতিপক্ষের গায়ে লেগে কর্নারে যায়।

ম্যাচ যখন মিসরের নিয়ন্ত্রণেই থাকার মতো দেখাচ্ছিল, তখন অবশেষে লুকাকুকে নামান গার্সিয়া। ৬৬ মিনিটে দে কেটেলারের জায়গায় মাঠে আসেন বেলজিয়ামের অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৯০ গোল করা লুকাকু এই ম্যাচের শুরুতে বেঞ্চে ছিলেন, কিন্তু নামার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর উপস্থিতি ম্যাচ বদলে দেয়।

মাঠে নামার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বক্সে ঢুকে পড়েন লুকাকু। টমা মুনিয়েরের নিচু ক্রসে তিনি এমনভাবে আক্রমণ করেন যে বল স্পর্শ না করেও মিসর রক্ষণকে ভুলে বাধ্য করেন। তাঁর চাপেই মোহাম্মদ হানি ঠিকমতো বল সরাতে পারেননি, বল নিজের জালে পাঠান। আত্মঘাতী গোল, কিন্তু গোলটির বড় কারণ লুকাকুর বক্সে উপস্থিতি।

এই মুহূর্তই দেখিয়ে দিল, বেলজিয়াম প্রথম থেকেই কী হারাচ্ছিল। একজন প্রকৃত নাম্বার নাইন, যে শুধু বল ছুঁয়ে নয়, উপস্থিতি দিয়েও রক্ষণকে ভুল করাতে পারে। দে কেটেলারে ফলস নাইন হিসেবে মিসর রক্ষণের মধ্যে কোনো আতঙ্ক তৈরি করতে পারেননি। লুকাকু সেটি করলেন কয়েক সেকেন্ডেই।

সমতায় ফেরার পর বেলজিয়াম কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। লুকাকুর উপস্থিতিতে আক্রমণ সরাসরি হয়। ডি ব্রুইনাও কিছুটা জায়গা পেতে শুরু করেন। পরে গার্সিয়া আরও বদলি আনেন, ডি ব্রুইনা ও ডোকুকেও তুলে নেন। কিন্তু জয়সূচক গোল আর আসেনি।

শেষ দিকে লুকাকুর সামনে সুযোগ এসেছিল। ৮৭ মিনিটে তিনি শট নেন, কিন্তু সেটি বার উঁচিয়ে যায়। ব্র্যান্ডন মেশেলের হেডও ঠেকিয়ে দেন মিসর গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। অন্যদিকে মিসরও ম্যাচ ছেড়ে দেয়নি। সালাহ উঠে যাওয়ার পরও তারা পাল্টা আক্রমণে ভয় দেখিয়েছে, কর্নার আদায় করেছে, শেষ পর্যন্ত পয়েন্ট ধরে রেখেছে।

পরিসংখ্যানেও ম্যাচের ভারসাম্য ধরা পড়ে। বেলজিয়ামের বল দখল ছিল ৫৩.৫ শতাংশ, মিসরের ৪৬.৫ শতাংশের কাছাকাছি। প্রত্যাশিত গোলে বেলজিয়াম সামান্য এগিয়ে, ১.৩১ বনাম মিসরের ১.০৭। শটে ব্যবধানও খুব বেশি নয়—বেলজিয়াম ১৫, মিসর ১৪। কর্নারে বরং মিসর এগিয়ে, ৭-২।