বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার অদ্ভুত অভিশাপ

বিশ্বকাপে গোল করা মানে ইতিহাসে নাম লেখা। আর পুরো টুর্নামেন্টে সবার চেয়ে বেশি গোল করা মানে সেই ইতিহাসের সবচেয়ে ঝলমলে পাতায় জায়গা পাওয়া। কিন্তু অদ্ভুতভাবে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার গল্প সবসময় ট্রফি হাতে শেষ হয় না। বরং অনেক সময় গোল্ডেন বুট হয়ে ওঠে এক ধরনের ভার—যেখানে ব্যক্তিগত গৌরবের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে দলের অপূর্ণতা, অতিরিক্ত প্রত্যাশা, পরের মৌসুমের চাপ, কখনো ক্যারিয়ারের বাকবদলও।
ফিফা বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার এখন গোল্ডেন বুট নামে পরিচিত। পুরস্কারটি ১৯৮২ সালে প্রথম গোল্ডেন শু নামে চালু হয়, পরে ২০১০ সালে এর নাম হয় গোল্ডেন বুট। গোল সমান হলে আগে দেখা হয় অ্যাসিস্ট, তারপরও সমতা থাকলে কম মিনিট খেলা ফুটবলার এগিয়ে থাকেন। পেনাল্টি শুটআউটের গোল অবশ্য এই হিসাবের মধ্যে পড়ে না।
এই পুরস্কারের ইতিহাসে বড় নামের অভাব নেই—ইউসেবিও, গার্ড মুলার, পাওলো রসি, রোনালদো নাজারিও, মিরোস্লাভ ক্লোসা, টমাস মুলার, জেমস রদ্রিগেজ, হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পে। কিন্তু একটি বিষয় চোখে পড়ে: সর্বোচ্চ গোল করলেই বিশ্বকাপ জেতা যায় না। বরং আধুনিক যুগে গোল্ডেন বুটজয়ীদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত দলীয় শিরোপা ছুঁতে পারেননি।
২০২২ বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন। ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেও ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে যায়। ব্যক্তিগতভাবে এমবাপ্পে ছিলেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বিধ্বংসী ফরোয়ার্ড, কিন্তু বিশ্বকাপের রাতে ট্রফি ওঠে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার হাতে।
২০১৮ সালে একই গল্পের আরেক রূপ দেখা যায়। হ্যারি কেইন ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন, কিন্তু ইংল্যান্ডের যাত্রা থামে সেমিফাইনালে। ২০১৪ সালে জেমস রদ্রিগেজ ৬ গোল করে বিশ্বকাপের পোস্টার বয় হয়ে ওঠেন, কলম্বিয়া যায় কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত। জেমসের সেই পারফরম্যান্স তাকে বিশ্ব ফুটবলের আলোয় এনেছিল, কিন্তু বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

এই ‘অভিশাপ’ অবশ্য পুরোপুরি অলৌকিক কিছু নয়। এর পেছনে ফুটবলীয় ব্যাখ্যা আছে। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার জন্য শুধু বড় দল নয়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিও দরকার। দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বড় জয়, পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব, দলীয় আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া, গ্রুপ পর্বে দ্রুত গোলের সুযোগ—এসব অনেক সময় গোলসংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে লাগে আরও ভারসাম্য: শক্তিশালী ডিফেন্স, মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ, বেঞ্চের গভীরতা, চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং নকআউট ম্যাচে সামগ্রিক দলীয় স্থিরতা।
এই কারণেই অনেক সময় সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এমন দলের খেলোয়াড়, যারা আক্রমণে উজ্জ্বল কিন্তু শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ চ্যাম্পিয়ন দল নয়। ১৯৫৮ সালে জাস্ট ফন্টেইন এক বিশ্বকাপে রেকর্ড ১৩ গোল করেন, কিন্তু ফ্রান্স চ্যাম্পিয়ন হয়নি। ১৯৬৬ সালে ইউসেবিও ৯ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন, কিন্তু পর্তুগাল সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হারে। ১৯৭০ সালে গার্ড মুলার ১০ গোল করেন, পশ্চিম জার্মানি শেষ করে তৃতীয় হয়ে।
তবে ব্যতিক্রমও আছে, আর সেখানেই গল্পটি আরও আকর্ষণীয়। ১৯৭৮ সালে মারিও কেম্পেস ৬ গোল করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতান। ১৯৮২ সালে পাওলো রসি ৬ গোল করে ইতালির নায়ক হন। ২০০২ সালে রোনালদো নাজারিও ৮ গোল করে ব্রাজিলকে পঞ্চম বিশ্বকাপ এনে দেন।

কিন্তু রোনালদোর পর থেকে পুরুষদের বিশ্বকাপে আর কোনো গোল্ডেন বুটজয়ী একই আসরে শিরোপা জেতেননি। ২০০৬ সালে মিরোস্লাভ ক্লোসা, ২০১০ সালে টমাস মুলার, ২০১৪ সালে জেমস রদ্রিগেজ, ২০১৮ সালে হ্যারি কেইন, ২০২২ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পে—প্রত্যেকে ব্যক্তিগত পুরস্কার পেয়েছেন, কিন্তু বিশ্বকাপ নয়। এই ধারাবাহিকতাই ‘গোল্ডেন বুট কার্স’ বা সর্বোচ্চ গোলদাতার অভিশাপ ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তোলে।
এখানে আরেকটি মানসিক দিকও আছে। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠা একজন খেলোয়াড়কে রাতারাতি বদলে দেয়। ১৯৯০ সালে সালভাতোরে স্কিলাচ্চি ইতালির ঘরের বিশ্বকাপে ৬ গোল করে জাতীয় নায়ক হয়ে যান। ১৯৯৪ সালে হ্রিস্টো স্টইচকভ বুলগেরিয়ার ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল যাত্রার মুখ হয়ে ওঠেন। ২০১৪ সালে জেমস রদ্রিগেজ রিয়াল মাদ্রিদে যান, কিন্তু সেই বিশ্বকাপের জেমসকে ধরে রাখা তার জন্য সহজ হয়নি। গোল্ডেন বুট অনেক সময় ক্যারিয়ারের শিখর নয়, বরং এমন এক উচ্চতা, যেখান থেকে নামার ঝুঁকিই বেশি।
অন্যদিকে এমবাপ্পের মতো খেলোয়াড় এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জও করেন। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপজয়ী, ২০২২ সালে গোল্ডেন বুটজয়ী, দুই আসর মিলিয়ে তার গোল ১২। গোল্ডেন বুট তার জন্য অভিশাপ নয়, বরং আরও বড় রেকর্ডের সিঁড়ি। ফিফার তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬; রোনালদোর ১৫, গার্ড মুলারের ১৪, মেসি ও ফন্টেইনের ১৩, পেলে ও এমবাপ্পের ১২।

২০২৬ বিশ্বকাপে তাই প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে উঠবে। ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে ম্যাচ বাড়বে, গোলের সুযোগও বাড়তে পারে। বড় দলের তারকারা তুলনামূলক সহজ গ্রুপ ম্যাচে গোলসংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, সর্বোচ্চ গোল করা আর বিশ্বকাপ জেতা একই জিনিস নয়। একজন স্ট্রাইকার টুর্নামেন্ট জ্বালিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু বিশ্বকাপ জেতে দল।
তাই বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট এক অদ্ভুত পুরস্কার। এটি একজন ফুটবলারকে অমর করে, কিন্তু তাকে পূর্ণতা দেয় না সবসময়। কখনো এটি রোনালদোর মতো মুক্তি, কখনো এমবাপ্পের মতো বেদনার গৌরব, কখনো জেমসের মতো এক ঝলক আলো। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসল অভিশাপ হয়তো এই তিনি সবার আগে চোখে পড়েন, কিন্তু শেষ দৃশ্যে ট্রফি হাতে থাকার নিশ্চয়তা তার নেই।
ফ্যাক্ট বক্স
পুরস্কার: ফিফা বিশ্বকাপ গোল্ডেন বুট
প্রথম চালু: ১৯৮২, গোল্ডেন শু নামে
নাম বদল: ২০১০ সাল থেকে গোল্ডেন বুট
টাইব্রেকার: গোল সমান হলে অ্যাসিস্ট, এরপর কম মিনিট
এক আসরে সর্বোচ্চ গোল: জাস্ট ফন্টেইন, ১৩ গোল, ১৯৫৮
শেষ গোল্ডেন বুটজয়ী যিনি একই আসরে বিশ্বকাপ জিতেছেন: রোনালদো নাজারিও, ব্রাজিল, ২০০২
সর্বশেষ গোল্ডেন বুটজয়ী: কিলিয়ান এমবাপ্পে, ৮ গোল, ২০২২
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা: মিরোস্লাভ ক্লোসা, ১৬ গোল

