logo
Advertisement

বিশ্বকাপে আবারও সেই ৭-১ এর রূপকথা লিখল জার্মানি

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
বিশ্বকাপে আবারও সেই ৭-১ এর রূপকথা লিখল জার্মানি
আবারও প্রতিপক্ষের জালে জার্মানদের ৭ গোল। ছবি: সংগৃহীত

স্কোরলাইনটা দেখলেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক ভয়াবহ রাতের কথা মনে পড়ে যাবে ব্রাজিল সমর্থকদের। ৭-১! জার্মানি আবার বিশ্বকাপে জিতেছে সেই ৭ গোলে। এবার প্রতিপক্ষ অবশ্য ব্রাজিল নয় প্রায় অখ্যাত দল কুরাসাও, বিশ্বকাপের নতুন মুখ, ছোট্ট ক্যারিবিয়ান দেশ। কিন্তু সংখ্যাটা এমনই যে, ফুটবলপ্রেমীদের মনে অনিবার্যভাবেই ফিরে এসেছে ২০১৪ সালের সেই ব্রাজিল-জার্মানি সেমিফাইনাল।

Advertisement

হিউস্টনে গ্রুপ ‘ই’র ম্যাচে কুরাসাওকে ৭-১ গোলে হারিয়েছে জার্মানি। কাগজে-কলমে ম্যাচটি জার্মানিরই হওয়ার কথা ছিল, তবে কুরাসাও প্রথমার্ধে একসময় সমতা ফিরিয়ে সামান্য হলেও চমক দেখিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা, গতি, ব্যক্তিগত মান ও বেঞ্চের গভীরতার পার্থক্যে ম্যাচ একতরফা করে ফেলে ইউলিয়ান নাগেলসম্যানের দল।

জার্মানির গোলের শুরুটা করেন ফেলিক্স এনমেচা। ৬ মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। তবে ২১ মিনিটে লিভানো কোমেনেন্সিয়ার গোলে কুরাসাও ইতিহাস গড়ে। বিশ্বকাপে নিজেদের অভিষেক ম্যাচে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির জালে গোল, স্কোরলাইন শেষে যতই বড় হোক, কুরাসাওর ফুটবল ইতিহাসে এই গোল আলাদা জায়গা পাবে।

কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। নিকো শ্লটারবেক কর্নার থেকে হেডে জার্মানিকে আবার এগিয়ে দেন। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করেন কাই হ্যাভার্টজ। বিরতিতে জার্মানি এগিয়ে যায় ৩-১ ব্যবধানে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই জামাল মুসিয়ালার গোল ম্যাচের বাকি উত্তেজনাও প্রায় শেষ করে দেয়। এরপর ন্যাথানিয়েল ব্রাউন, দেনিজ উনডাভ এবং শেষ দিকে হ্যাভার্টজের দ্বিতীয় গোল স্কোরলাইনকে নিয়ে যায় ৭-১-এ। উনডাভ বদলি নেমে গোলের সঙ্গে আক্রমণ গড়াতেও প্রভাব রেখেছেন। হ্যাভার্টজ করেছেন জোড়া গোল।

এই ৭-১ অবশ্য ২০১৪ সালের ৭-১ নয়। কুরাসাও বিশ্বকাপের অভিষিক্ত দল, আর ব্রাজিল ছিল স্বাগতিক, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, শিরোপার বড় দাবিদার। তবু ফুটবলে কিছু স্কোরলাইন শুধু স্কোরলাইন থাকে না, স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। জার্মানি আর ৭-১, এই দুই শব্দ একসঙ্গে এলেই বেলো হরিজন্তের মিনেইরাও স্টেডিয়ামের সেই রাত ফিরে আসে।

২০১৪ সালের ৮ জুলাই। বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল ও জার্মানি। ব্রাজিল ছিল ঘরের মাঠে, কিন্তু নেইমার চোটে বাইরে, অধিনায়ক থিয়াগো সিলভা নিষেধাজ্ঞায় নেই। তবু কেউ ভাবেনি, স্বাগতিকরা এমনভাবে ভেঙে পড়বে।

থমাস মুলার ১১ মিনিটে গোল করে শুরু করেন। এরপর ২৩ মিনিটে মিরোস্লাভ ক্লোসে গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান। তারপর যেন সবকিছু ঝড়ের মতো ঘটে। টনি ক্রুস ২৪ ও ২৬ মিনিটে দুই গোল করেন। ২৯ মিনিটে সামি খেদিরা গোল করলে আধঘণ্টার মধ্যেই ব্রাজিল পিছিয়ে পড়ে ৫-০ ব্যবধানে।

মিনেইরাও তখন স্তব্ধ। ব্রাজিলিয়ান দর্শকদের কান্না, অবিশ্বাস, হতবাক মুখ, সব মিলিয়ে সেই রাত ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত বিপর্যয়ের একটি হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ার্ধে আন্দ্রে শুরলে আরও দুই গোল করেন। ৯০ মিনিটে অস্কারের গোল শুধু স্কোরলাইনকে ৭-১ করে, ব্রাজিলের অপমান কমাতে পারেনি।

সেই ম্যাচের নামই হয়ে যায় ‘মিনেইরাজো’। ১৯৫০ সালের মারাকানাজোর পর ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের আরেক গভীর ক্ষত। একদিকে জার্মানির শৃঙ্খলা, নির্মমতা ও দলীয় ফুটবলের নিখুঁত প্রদর্শন; অন্যদিকে ব্রাজিলের মানসিক ভাঙন, রক্ষণে শূন্যতা এবং পরিকল্পনার সম্পূর্ণ পতন।

২০২৬ সালের ৭-১ তাই ভিন্ন প্রেক্ষাপটের হলেও আলোচনায় ২০১৪-কে ফিরিয়ে আনবেই। কারণ জার্মানি আবার একই ব্যবধানে জিতেছে বিশ্বকাপে। তবে এবার গল্পের চরিত্র আলাদা। কুরাসাওর কাছে ৭ গোল খাওয়া বড় ধাক্কা হলেও তাদের জন্য বিশ্বকাপে উপস্থিতিই ইতিহাস। বরং কোমেনেন্সিয়ার গোল তাদের রাতকে একেবারে অন্ধকার হতে দেয়নি।

জার্মানির জন্য এই জয় আত্মবিশ্বাস ফেরানোর। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর জার্মান ফুটবল প্রশ্নের মুখে ছিল। কুরাসাওর বিপক্ষে বড় জয় তাই শুধু তিন পয়েন্ট নয়, নিজেদের আক্রমণাত্মক শক্তি দেখানোর সুযোগও। মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান ভির্ৎস, হ্যাভার্টজ, উনডাভরা দেখালেন, এই জার্মানির আক্রমণে বৈচিত্র্য আছে।

তবে এই জয়কে অতিরিক্ত বড় করে দেখারও সুযোগ নেই। প্রতিপক্ষ ছিল বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট দেশগুলোর একটি, অভিষিক্ত কুরাসাও। সামনে আইভরি কোস্ট ও ইকুয়েডরের মতো কঠিন প্রতিপক্ষ আছে। আসল পরীক্ষা তখনই হবে।

ফল

জার্মানি ৭-১ কুরাসাও

গোল

জার্মানি: ফেলিক্স এনমেচা ৬ মিনিট, নিকো শ্লটারবেক ৩৮ মিনিট, কাই হ্যাভার্টজ ৪৫+৫ ও ৮৮ মিনিট, জামাল মুসিয়ালা ৪৭ মিনিট, ন্যাথানিয়েল ব্রাউন ৬৮ মিনিট, দেনিজ উনডাভ ৭৮ মিনিট

কুরাসাও: লিভানো কোমেনেন্সিয়া ২১ মিনিট

বিশ্বকাপে আবারও সেই ৭-১ এর রূপকথা লিখল জার্মানি