ড্র, ধাক্কা আর দাপট: প্রথম ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপের ছবি

২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের পালা শেষ। ৪৮ দলই একটি করে ম্যাচ খেলেছে। কেউ দাপট দেখিয়েছে, কেউ হোঁচট খেয়েছে, কেউ আবার শুরুতেই বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি। ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটের প্রথম বিশ্বকাপ শুরুতেই একটি কথা পরিষ্কার করে দিয়েছে, এবার শুধু নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা যাবে না।
প্রথম ২৪ ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বড় শিক্ষা, বড় দলগুলো সবাই একই ছন্দে নেই। আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ভালো শুরু করেছে। কিন্তু ব্রাজিল, পর্তুগাল, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও উরুগুয়ের মতো দল প্রথম ম্যাচেই পয়েন্ট হারিয়েছে। টুর্নামেন্টের শুরুতেই ফেভারিটদের ভেতরে তাই দুই ছবি তৈরি হয়েছে। কেউ দ্রুত ছন্দ পেয়েছে, কেউ এখনো নিজেদের খুঁজছে।
ব্রাজিলের ১-১ ড্র ছিল প্রথম ম্যাচগুলোর সবচেয়ে আলোচিত সতর্কবার্তাগুলোর একটি। মরক্কোর বিপক্ষে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ব্যক্তিগত ঝলকে হার এড়ালেও দলগতভাবে ভয় ধরাতে পারেনি। মাঝমাঠের ভারসাম্য, ডান পাশের দুর্বলতা, নেইমারের অনিশ্চয়তা এবং কার্লো আনচেলত্তির পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্রাজিল এখনো বিপদে নয়, তবে হাইতির বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ তাদের জন্য চাপ কমানোর সুযোগ হয়ে গেছে।

পর্তুগালের অবস্থাও কাছাকাছি। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ ড্র তাদের জন্য বিপর্যয় নয়, তবে সতর্কবার্তা। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ, অভিজ্ঞতা ও প্রতিভায় ভরা স্কোয়াড, সব মিলিয়ে প্রত্যাশা বড়। কিন্তু প্রথম ম্যাচ দেখিয়েছে, নামের ভার দিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ডিআর কঙ্গো শুধু লড়াই করেনি, পর্তুগালকে অস্বস্তিতেও রেখেছে।
স্পেনও প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছে। এটিই এই বিশ্বকাপের অন্যতম বড় বার্তা। কেপ ভার্দে শুধু নতুন দল নয়, এই আসরের বদলে যাওয়া বাস্তবতারও প্রতীক। স্পেনের মতো টেকনিক্যালি শক্তিশালী দলের বিপক্ষে পয়েন্ট নেওয়া দেখিয়েছে, ৪৮ দলের বিশ্বকাপ মানেই শুধু দলসংখ্যা বাড়ানো নয়। কিছু দল সত্যিই প্রস্তুত হয়েই এসেছে।
অন্যদিকে কিছু বড় দল শুরুতেই শক্ত বার্তা দিয়েছে। জার্মানি কুরাসাওকে ৭-১ গোলে হারিয়ে গোল পার্থক্যে বড় সুবিধা নিয়েছে। আর্জেন্টিনা আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নসুলভ শুরু করেছে। ইংল্যান্ড ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়েছে, ফ্রান্স সেনেগালের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানে জিতেছে। এই দলগুলো শুধু তিন পয়েন্ট পায়নি, নিজেদের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে।

তবে বড় ব্যবধানের জয়ের পাশাপাশি এই বিশ্বকাপ দেখিয়েছে, অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত দলগুলো আগের চেয়ে বেশি সাহসী। কাতার সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ ড্র করেছে, কানাডা-বসনিয়া ম্যাচও ১-১, বেলজিয়াম-মিশর ১-১, ইরান-নিউজিল্যান্ড ২-২, নেদারল্যান্ডস-জাপান ২-২। অনেক ম্যাচেই আন্ডারডগরা শুধু রক্ষণ করে বসে থাকেনি। তারা পাল্টা আক্রমণ করেছে, চাপ দিয়েছে, গোল করেছে।
নতুন ফরম্যাটের আরেকটি বড় প্রভাব হলো, প্রথম ম্যাচের ড্র এখন অনেক বড় কৌশলগত ঘটনা। আগের বিশ্বকাপে চার দলের গ্রুপে দুই দল উঠত, এবারও গ্রুপের সেরা দুই দল উঠবে। তবে এবার সেরা আট তৃতীয় দলও শেষ ৩২-এ যাবে। ফলে ১ পয়েন্ট পাওয়া দলগুলো এখনো ভালোভাবে লড়াইয়ে আছে। কিন্তু সেই নিরাপত্তা আপাতদৃষ্টিতে যতটা, বাস্তবে ততটা নয়। কারণ তৃতীয় দলের হিসাব এলে গোল পার্থক্য, গোলসংখ্যা ও শৃঙ্খলা বড় হয়ে উঠবে।

এই জায়গাতেই গোল পার্থক্য প্রথম ম্যাচ শেষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। জার্মানির ৭-১, সুইডেনের ৫-১, যুক্তরাষ্ট্রের ৪-১, নরওয়ের ৪-১, আর্জেন্টিনার ৩-০, এসব ফল শুধু জয় নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও। অন্যদিকে কুরাসাও, তিউনিসিয়া, ইরাক, আলজেরিয়া, প্যারাগুয়ের মতো দল প্রথম ম্যাচেই গোল পার্থক্যে ধাক্কা খেয়েছে। এখন তাদের শুধু পয়েন্ট পেলেই হবে না, ব্যবধানও সামলাতে হবে।
এই বিশ্বকাপ আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, আফ্রিকা ও এশিয়ার দলগুলো আর শুধু আবেগের গল্প নয়, প্রতিযোগিতার বাস্তব অংশ। মরক্কো ব্রাজিলকে আটকে দিয়েছে, জাপান নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ড্র করেছে, ঘানা পানামাকে হারিয়েছে, আইভরি কোস্ট ইকুয়েডরকে হারিয়েছে, ইরান নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে রোমাঞ্চকর ড্র করেছে। সেনেগাল হারলেও ফ্রান্সকে লড়াই দিয়েছে। এই অঞ্চলগুলোর দলগুলো এখন বড় ম্যাচে মানসিকভাবে অনেক বেশি প্রস্তুত।
তরুণদের বিশ্বকাপও শুরু হয়ে গেছে। মরক্কোর আইয়ুব বুয়াদ্দি ব্রাজিলের মাঝমাঠের বিপক্ষে পরিণত ফুটবল খেলেছেন। নরওয়ের নতুন প্রজন্ম ইরাকের বিপক্ষে নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে। জার্মানির বড় জয়েও নতুন মুখদের অবদান আছে। এই বিশ্বকাপ শুধু মেসি, রোনালদো, নেইমার, এমবাপ্পে বা হালান্ডদের নয়; নতুন প্রজন্মও নিজেদের জায়গা দাবি করতে শুরু করেছে।
মাঠের বাইরে আবেগের গল্পও কম নয়। কুরাসাও বিশ্বকাপে সবচেয়ে ছোট জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ইতিহাস গড়েছে। কেপ ভার্দে স্পেনকে আটকে দিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। হাইতি ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে লড়াই করেছে। উজবেকিস্তান নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই গোল করেছে। ইরাক ৪০ বছর পর ফিরেছে। এই দলগুলোর জন্য বিশ্বকাপ শুধু ফল নয়, জাতীয় স্মৃতি তৈরির মঞ্চও।
প্রথম ম্যাচ শেষে আরেকটি শিক্ষা, দ্বিতীয় ম্যাচগুলো আরও বেশি তীব্র হবে। ব্রাজিল, পর্তুগাল, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, উরুগুয়ে, সবাই এখন জয়ের চাপ নিয়ে নামবে। যারা প্রথম ম্যাচ জিতেছে, তারা দ্বিতীয় ম্যাচেই নকআউটের পথ অনেকটা পরিষ্কার করতে চাইবে। আর যারা বড় ব্যবধানে হেরেছে, তাদের সামনে এখন প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে ৪৮ দলের বিশ্বকাপ শুরুটা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি খোলা হয়েছে। কিছু ম্যাচে বড় ব্যবধান আছে, কিন্তু সামগ্রিক ছবিতে প্রতিযোগিতা কমেনি। বরং আরও বেশি গল্প তৈরি হয়েছে। বড় দলগুলো বুঝেছে, নাম দিয়ে ভয় দেখানো যাবে না। অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলো বুঝিয়েছে, তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি।
প্রথম ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপ আমাদের সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা দিয়েছে, তা হলো, এবারের টুর্নামেন্টে নিরাপদ কেউ নয়। ফেভারিটদেরও লড়তে হবে, আন্ডারডগদেরও গুরুত্ব দিতে হবে, আর প্রতিটি গোলের হিসাব শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে উঠতে পারে।
