logo

বাংলাদেশে ব্রাজিল-প্রেম নিয়ে ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে ব্রাজিল-প্রেম নিয়ে ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন
ব্রাজিল বাংলাদেশের ফুটবলের এক অবিচ্ছেদ্য নাম হয়ে দাড়িয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে যেন আলাদা এক ফুটবল-ঋতু শুরু হয়। লাল-সবুজের দেশে তখন দেয়াল, ছাদ, গলি, বাজার আর পাড়ার মোড় রঙিন হয়ে ওঠে অন্য রঙে। কোথাও ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ, কোথাও আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না, কিন্তু বিশ্বকাপের আবেগ থেকে দেশটি কখনোই দূরে থাকে না।

এবার সেই পরিচিত দৃশ্যই নজর কেড়েছে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমের। দেশটির জনপ্রিয় ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম জিই বাংলাদেশের ব্রাজিল-উন্মাদনা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ব্রাজিল থেকে প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরের বাংলাদেশেও বিশ্বকাপ ঘিরে শুরু হয়েছে সবুজ-হলুদের উৎসব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও দেখা যাচ্ছে, দেশের নানা জায়গায় ব্রাজিলের পতাকা, দেয়ালচিত্র ও সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত সমর্থকেরা।

২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল তাদের অভিযান শুরু করছে মরক্কোর বিপক্ষে। নিউ জার্সিতে গ্রুপ ‘সি’র সেই ম্যাচের আগে শুধু ব্রাজিলেই নয়, বাংলাদেশেও চলছে সমর্থকদের প্রস্তুতি। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন যেন এখানকার হাজার হাজার ভক্তেরও নিজের স্বপ্ন হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্রাজিল উন্মাদনা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ব্রাজিল উন্মাদনা। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের নিজস্ব ফুটবল বাস্তবতা অবশ্য একেবারেই ভিন্ন। জনসংখ্যায় বড় দেশ হলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে জাতীয় দলের অবস্থান নিচের দিকে, আর বিশ্বকাপের মূল পর্বে বাংলাদেশ কখনো খেলেনি। এই শূন্য জায়গাটাই অনেকটা পূরণ করেছে বিদেশি দল ঘিরে গড়ে ওঠা সমর্থন-সংস্কৃতি।

এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় দুই নাম ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। শহর থেকে গ্রাম, চায়ের দোকান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বিশ্বকাপ এলেই দুই দলের সমর্থনে দেশ যেন ভাগ হয়ে যায়। কারও কাছে পেলে, রোনালদো, রোনালদিনিও, নেইমার; কারও কাছে ম্যারাডোনা, বাতিস্তুতা, মেসি। প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু আবেগের রং বদলায়নি।

ব্রাজিলের প্রতি বাংলাদেশের এই টান নতুন নয়। ষাটের দশকে পেলে-গারিঞ্চাদের ব্রাজিল যখন বিশ্ব ফুটবলের শিখরে উঠছিল, তখন থেকেই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে জায়গা করতে শুরু করে সেলেসাওরা। পরে টেলিভিশনের যুগে জিকো, সক্রেটিস, রোমারিও, রোনালদো থেকে নেইমার পর্যন্ত সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

পাড়া-মহল্লাতেও চলে ব্রাজিল উন্মাদনা। ছবি: সংগৃহীত
পাড়া-মহল্লাতেও চলে ব্রাজিল উন্মাদনা। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের এই ফুটবল-আবেগ নিয়ে তৈরি হয়েছে ডকুমেন্টারিও। গ্লোবোপ্লের ‘ঢাকা ভাইব্রা’ নামের ডকুমেন্টারিতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে বাংলাদেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে আলাদা এক পরিচয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও উৎসবের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। পরিচালক রাফায়েল বেরগামাস্কি বাংলাদেশের রাস্তায় ব্রাজিলের পতাকা, দেয়ালচিত্র ও সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখে মুগ্ধ হওয়ার কথাও বলেছেন।

তবে এই আবেগের আরেকটি দিকও আছে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থন অনেক সময় শুধু আনন্দে সীমাবদ্ধ থাকে না। সম্প্রতি হবিগঞ্জে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। ফুটবলের আনন্দ যখন উত্তেজনায় রূপ নেয়, তখন উৎসবের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। বিশ্বকাপের আবেগ তাই আনন্দের জায়গাতেই থাকা জরুরি।

তার পরও বাংলাদেশের ফুটবল-উন্মাদনার মূল ছবিটা রঙিন। পাড়ার ছাদে বিশাল পতাকা, দেয়ালে পেলে-রোনালদোর ছবি, বাজারের দোকানে ব্রাজিলের জার্সি, রাত জেগে ম্যাচ দেখার আয়োজন, সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ বাংলাদেশে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, সামাজিক উৎসবও।

ব্রাজিল মাঠে নামবে নিউ জার্সিতে, কিন্তু তাদের জন্য গলা ফাটবে ঢাকার গলি, হবিগঞ্জের মাঠ, চট্টগ্রামের আড্ডা কিংবা দেশের অগণিত পাড়া-মহল্লায়। ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব সেখানে কোনো বাধা নয়। ফুটবলের ভাষায় দূরত্ব ছোট হয়ে যায়, আর রং হয়ে ওঠে আবেগের পরিচয়।

বাংলাদেশের নিজের পতাকা লাল-সবুজ। কিন্তু বিশ্বকাপ এলে সেই লাল-সবুজের মাঝেই জায়গা করে নেয় ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ, আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা। এই মিশ্রণই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সংস্কৃতিকে আলাদা করে তোলে। দেশটি বিশ্বকাপে নেই, কিন্তু বিশ্বকাপের উন্মাদনায় বাংলাদেশ কখনো অনুপস্থিত নয়।