ক্লাব নেই, দাম ৭১ লাখ; তবু স্পেনকে থামালেন ভোজিনিয়া

বিশ্বকাপে এমন গল্পই সবচেয়ে বেশি বেঁচে থাকে। একদিকে শিরোপার দাবিদার স্পেন, দলে রদ্রি, পেদ্রি, গাভি, লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস। অন্যদিকে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দে, আর গোলপোস্টের নিচে ৪০ বছর বয়সী এক গোলরক্ষক, যার বাজারমূল্য মাত্র ৫০ হাজার ইউরো। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭১ লাখ টাকা। সেই ভোজিনিয়ার দেয়ালই ভাঙতে পারল না স্পেন।
আটলান্টায় কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র স্পেনের জন্য বড় হতাশা। কিন্তু একই ম্যাচ ভোজিনিয়ার জন্য হয়ে থাকল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাত। পুরো নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। ফুটবল দুনিয়ায় পরিচিত ভোজিনিয়া নামে। বয়স ৪০। উচ্চতা ১.৮৯ মিটার। পর্তুগালের দ্বিতীয় স্তরের ক্লাব জিডি শাভেসের এই গোলরক্ষক বিশ্বকাপ অভিষেকে এমন পারফরম্যান্স করলেন, যা তাঁর নামকে টুর্নামেন্টের প্রথম বড় গল্পগুলোর একটিতে তুলে দিল।
স্পেন ম্যাচে ভোজিনিয়ার পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে তাঁর রাতটা কত বড় ছিল। ৭ সেভ, ১ ক্লিয়ারেন্স, আকাশে লড়াইয়ে জয়, ৬৫টি সম্পৃক্ততা, ৪২ পাস। পাস সফলতার হার ৬৯ শতাংশ। এই সংখ্যাগুলো শুধু একজন গোলরক্ষকের ভালো ম্যাচের হিসাব নয়, একটি ছোট দেশের বিশ্বকাপ ইতিহাস রক্ষার দলিল।
স্পেন ম্যাচে ২৭ শট নিয়েছে, ৭টি ছিল লক্ষ্যে। বল দখল ছিল ৭৪ শতাংশের বেশি। প্রত্যাশিত গোল ২.২৯। সম্পন্ন পাস ৮০১। শেষ তৃতীয়াংশে পাস ৪৪৩। সাধারণত এমন পরিসংখ্যান মানে বড় জয়। কিন্তু আটলান্টায় স্কোরবোর্ডে স্পেনের পাশে ছিল শূন্য। কারণ গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন ভোজিনিয়া।
প্রথমার্ধেই স্পেন বুঝে যায়, রাতটা সহজ হবে না। পেদ্রির শট, ফেরান তোরেসের সুযোগ, মিকেল ওয়ারজাবালের হেড—সবকিছুতেই ভোজিনিয়া বা তাঁর রক্ষণভাগ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ৩৯ মিনিটে ফেরান তোরেসের শট ক্রসবারে লাগে। ফিরতি বলে ওয়ারজাবালের হেড দারুণ সেভে ফিরিয়ে দেন ভোজিনিয়া। সেই সেভই যেন স্পেনের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়—আজ গোল আসবে তো?
প্রথমার্ধের শেষ দিকে লাপোর্তের হেডও ফিরিয়ে দেন তিনি। দ্বিতীয়ার্ধে ফাবিয়ান রুইসের ফাঁকায় নেওয়া হেড, মেরিনোর শট, কুকুরেয়ার নিচু হেড—সবকিছুই জমা পড়ে ভোজিনিয়ার গ্লাভসে। স্পেন যত চেষ্টা করেছে, কেপ ভার্দের গোলরক্ষক তত বড় হয়ে উঠেছেন।
ভোজিনিয়ার গল্পটা আরও বিস্ময়কর তাঁর ক্যারিয়ারপথের কারণে। বড় কোনো ক্লাবের তারকা তিনি কখনো ছিলেন না। বরং তাঁর ফুটবল-জীবন ছড়িয়ে আছে নানা দেশে, নানা লিগে। কেপ ভার্দের বাতুকে ও সিএস মিনদেলেন্সে খেলেছেন, আঙ্গোলার প্রোগ্রেসোতে খেলেছেন, মলদোভার জিমব্রু কিশিনাউ, পর্তুগালের জিল ভিসেন্তে ও শাভেস, সাইপ্রাসের এইএল লিমাসল, স্লোভাকিয়ার এএস ত্রেনচিন—এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে তৈরি হয়েছে তাঁর ক্যারিয়ার।
শিরোনামে ক্লাবহীন শব্দেও অনেকের খটকা লাগতে পারে। স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের নায়ক হয়ে ওঠার সময় ভোজিনিয়ার ক্লাব-ভবিষ্যৎ আসলেও অনিশ্চিত। পর্তুগালের দ্বিতীয় স্তরের ক্লাব জিডি চাভেসের সঙ্গে তাঁর দুই মৌসুমের পথচলা শেষ হয়েছে। বিশ্বকাপের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্লাবটিকে বিদায় জানিয়ে ভোজিনিয়া লিখেছিলেন, চাভেসের জার্সি পরা তাঁর জন্য ছিল সম্মানের। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন কোনো ক্লাব এখনো নিশ্চিত নয় বলেই তাঁকে আপাতত ‘ক্লাবহীন’ বলা হচ্ছে।
সাফল্যের তালিকাও খুব বড় নয়। ২০১৯ সালে সাইপ্রাস কাপ জিতেছিলেন। ক্লাব ফুটবলে তিনি কখনো বৈশ্বিক আলোচনার চরিত্র ছিলেন না। কিন্তু জাতীয় দলে তাঁর জায়গা আলাদা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ব্লু শার্কসদের গোলপোস্টের নির্ভরতার নাম।
স্পেনের বিপক্ষে এই পারফরম্যান্স তাঁকে বিশ্বকাপ ইতিহাসেও বিশেষ জায়গা দিয়েছে। ৪০ বছর ১২ দিন বয়সে বিশ্বকাপে অভিষেক করা ভোজিনিয়া এখন বেশি বয়সে বিশ্বকাপ অভিষেক করা গোলরক্ষকদের আলোচনায়। এই আসরেই কুরাসাওর হয়ে জার্মানির বিপক্ষে ৩৭ বছর ১৮২ দিন বয়সে অভিষেক করেছিলেন এলয় রুম। তাঁকে ছাড়িয়ে গেলেন ভোজিনিয়া। অবশ্য বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে খেলার রেকর্ড এখনো মিসরের এসাম এল হাদারির, যিনি ৪৫ বছর ১৬১ দিন বয়সে খেলেছিলেন।
তবে সংখ্যা দিয়ে ভোজিনিয়ার প্রভাব পুরো বোঝা যাবে না। স্পেনের আক্রমণভাগে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, সেটির বড় কারণ ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস। প্রথম কয়েকটি সেভের পর স্পেনের শটগুলোতে চাপ দেখা গেছে। কখনো তাড়াহুড়া, কখনো ভুল সিদ্ধান্ত, কখনো বাড়তি পাস। গোলরক্ষক যখন এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডরাও গোলপোস্ট ছোট দেখতে শুরু করে।
স্পেন লামিনে ইয়ামালকে নামিয়েছে, নিকো উইলিয়ামসকে নামিয়েছে, দানি ওলমোকে নামিয়েছে। কিন্তু কোনো বদলই ভোজিনিয়ার দেয়াল ভাঙতে পারেনি। শেষ দিকে দানি ওলমোর ক্রস থেকে ওয়ারজাবালের সুযোগও পিকো লোপেস ঠেকিয়ে দেন। কেপ ভার্দে শুধু গোলরক্ষকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকেনি, দল হিসেবে লড়েছে। তবে এই লড়াইয়ের মুখ নিঃসন্দেহে ভোজিনিয়া।
কেপ ভার্দের জন্য এই ড্র জয়ের সমান। প্রথম বিশ্বকাপ, প্রথম ম্যাচ, প্রতিপক্ষ স্পেন—তবু তারা গোল খায়নি। আর ভোজিনিয়ার জন্য এটি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্মৃতি। যে গোলরক্ষকের বাজারমূল্য স্পেনের অনেক তারকার সাপ্তাহিক বেতনের চেয়েও কম, তিনিই শিরোপার দাবিদারদের আটকে দিলেন।
স্পেনের জন্য রাতটি হতাশার। কেপ ভার্দের জন্য ইতিহাসের। আর ভোজিনিয়ার জন্য—এটি সেই রাত, যখন মাত্র ৫০ হাজার ইউরোর বাজারমূল্যের এক গোলরক্ষক বিশ্বকাপের আলো নিজের দিকে টেনে নিলেন।
