logo
বিশ্বকাপের বাকি ১০ দিন

পিকলস নামের কুকুর আর হারানো বিশ্বকাপ ট্রফির গল্প

পিকলস নামের কুকুর আর হারানো বিশ্বকাপ ট্রফির গল্প
পিকেলস ও ‍জুলেস রিমে ট্রফি। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে সাধারণত আলোচনায় থাকে দল, স্কোয়াড, ইনজুরি, ফেভারিট, প্রস্তুতি ম্যাচ। কে জিতবে, কে বাদ পড়বে, কোন তারকা আলো ছড়াবেন, এইসব নিয়েই উত্তাপ বাড়ে। কিন্তু ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক মাস আগে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল এক অদ্ভুত প্রশ্ন: বিশ্বকাপ ট্রফিটা গেল কোথায়?

শুনতে অবিশ্বাস্য, কিন্তু সত্যি। যে ট্রফির জন্য পৃথিবীর সেরা দলগুলো লড়তে যাচ্ছিল, সেই জুলে রিমে ট্রফিই বিশ্বকাপের আগে চুরি হয়ে গিয়েছিল। আয়োজক ইংল্যান্ডের জন্য এটি ছিল শুধু নিরাপত্তা ব্যর্থতা নয়, জাতীয় অস্বস্তি। বিশ্বকাপ তখনও শুরু হয়নি, মাঠে বল গড়ায়নি, কিন্তু আয়োজকের হাতে নেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ, লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের মেথডিস্ট সেন্ট্রাল হলে একটি স্ট্যাম্প প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছিল জুলে রিমে ট্রফি। প্রদর্শনীর নাম ছিল “স্পোর্টস উইথ স্টাম্পস”। নিরাপত্তা থাকার কথা ছিল সার্বক্ষণিক। কিন্তু সেই নিরাপত্তার ফাঁক গলেই ট্রফিটি উধাও হয়ে যায়। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়, প্রদর্শনীতে লাখ লাখ পাউন্ড মূল্যের বিরল স্ট্যাম্পও ছিল, কিন্তু চোর সেগুলো না নিয়ে নিয়ে যায় বিশ্বকাপ ট্রফি।

এই ঘটনা ইংল্যান্ডের ফুটবল প্রশাসনকে বিপদে ফেলে দেয়। কয়েক মাস পরই বিশ্বকাপ, অথচ ট্রফি নেই। পুলিশ তদন্ত শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে শোরগোল পড়ে যায়। আয়োজকদের জন্য ব্যাপারটি ছিল লজ্জার, কারণ বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে ট্রফির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও যে সম্ভব হয়নি, সেটি গোটা ফুটবল দুনিয়াকে অবাক করেছিল।

jules rimeet trophy
jules rimeet trophy

চুরির পরদিনই নাটক আরও ঘনীভূত হয়। ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত জো মিয়ার্সের কাছে ফোন আসে। জানানো হয়, স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে একটি প্যাকেট রাখা হয়েছে। সেই প্যাকেটে ছিল মুক্তিপণের দাবি। ১৫ হাজার পাউন্ড চাওয়া হয় ট্রফি ফেরানোর জন্য। জাতীয় ফুটবল জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, প্যাকেটে ট্রফির একটি খুলে নেওয়া অংশও পাঠানো হয়েছিল প্রমাণ হিসেবে।

এ যেন ফুটবল নয়, গোয়েন্দা উপন্যাস। একদিকে বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন, অন্যদিকে চুরি যাওয়া ট্রফি, মুক্তিপণের দাবি, পুলিশের গোপন অভিযান। এ ঘটনায় এডওয়ার্ড বেচলি নামের একজনকে পরে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ট্রফি তার কাছে পাওয়া যায়নি। ফলে আসল রহস্য রয়ে যায়: ট্রফি কোথায়?

তারপর গল্পে ঢোকে এক অপ্রত্যাশিত চরিত্র।

pickels
pickels

এক সপ্তাহ পর, ২৭ মার্চ, দক্ষিণ লন্ডনের বিউলা হিল এলাকায় ডেভিড করবেট তার কুকুর পিকলসকে নিয়ে হাঁটছিলেন। পিকলস হঠাৎ একটি ঝোপের নিচে পড়ে থাকা প্যাকেটের গন্ধ পায়। প্যাকেটটি পুরোনো সংবাদপত্রে মোড়া, দড়ি দিয়ে বাঁধা। করবেট সেটি খুলে দেখেন, ভেতরে আছে একটি ট্রফি। নিচের অংশে আগের বিজয়ীদের নাম দেখে তিনি বুঝতে পারেন, এটি সাধারণ কোনো জিনিস নয়। এটি সেই হারিয়ে যাওয়া জুলে রিমে ট্রফি।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রফি উদ্ধার করল পুলিশ নয়, কোনো গোয়েন্দা নয়, কোনো নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞও নয়। উদ্ধার করল পিকলস নামের এক কুকুর।

ঘটনাটি এতটাই অদ্ভুত যে, প্রথমে করবেটকেও সন্দেহের মুখে পড়তে হয়েছিল। পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে, কারণ যে মানুষ হারানো বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়ে থানায় হাজির হন, তাকে সন্দেহ না করে উপায়ও ছিল না। পরে তার সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় সন্দেহ কেটে যায়। পিকলস হয়ে ওঠে রাতারাতি তারকা। টিভি অনুষ্ঠান, সংবাদপত্র, পুরস্কার—সব জায়গায় উঠে আসে তার নাম।

laika and trophy
laika and trophy

এই চুরির গল্পে সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা হলো, ১৯৬৬ বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত জিতেছিল ইংল্যান্ডই। যে দেশ ট্রফি হারিয়ে বিশ্বকাপের আগে বিব্রত হয়েছিল, তারাই ওয়েম্বলিতে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ জেতে। কিন্তু ফাইনালের জয়ের আগে পিকলস না থাকলে গল্পটা আরও অনেক বেশি বিব্রতকর হতে পারত।

জুলে রিমে ট্রফির জীবন নিজেই ছিল নাটকীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এটি নিরাপদে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে চুরি হয়ে আবার ফিরে আসে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জেতার পর ট্রফিটি স্থায়ীভাবে তাদের দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনেইরোতে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে এটি আবার চুরি হয়। এবার আর ফেরেনি।

তাই ১৯৬৬-এর গল্প শুধু একবারের চুরি নয়; এটি ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান প্রতীকের অদ্ভুত ভাগ্যের একটি অধ্যায়। একদিকে মানুষের লোভ, অন্যদিকে এক কুকুরের কৌতূহল। একদিকে বিশ্বকাপের নিরাপত্তা ব্যর্থতা, অন্যদিকে এমন এক উদ্ধারকাহিনি, যা কোনো চিত্রনাট্যকার লিখলেও হয়তো অতিরঞ্জিত মনে হতো।

বিশ্বকাপের বাকি ১০ দিন। আজকের বিশ্বকাপে ট্রফির নিরাপত্তা সামরিক মানের, চলাচল নিয়ন্ত্রিত, ছবি তোলা নিয়ন্ত্রিত, স্পর্শ করার অধিকারও সীমিত। কিন্তু একসময় সেই ট্রফি প্রদর্শনীর কাঁচের বাক্স থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। কয়েক দিন ধরে ফুটবল দুনিয়া জানত না, বিশ্বকাপের প্রতীক কোথায় আছে। তারপর দক্ষিণ লন্ডনের এক ঝোপের নিচে, সংবাদপত্রে মোড়া অবস্থায়, সেটি খুঁজে পেল এক কুকুর।