logo

স্পেনের বিশ্বকাপ দলে কেন নেই রিয়ালের কোনো ফুটবলার?

স্পেনের বিশ্বকাপ দলে কেন নেই রিয়ালের কোনো ফুটবলার?
রিয়ালের দুই স্প্যানিশ ফুটবলার ডিন হুইসেন ও আলভারো কারেরাস। ছবি: সংগৃহীত

স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে রিয়াল মাদ্রিদের নাম আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। ক্লাবটির খেলোয়াড়রা বহু বিশ্বকাপেই স্পেনের মুখ ছিলেন। ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী দলেও ছিলেন ইকার ক্যাসিয়াস, সের্হিও রামোস, জাবি আলোনসো ও আলভারো আরবেলোয়ার মতো রিয়াল প্রতিনিধিরা। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে স্পেনের দল ঘোষণায় দেখা গেল বিরল এক দৃশ্য, ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে নেই রিয়াল মাদ্রিদের একজন খেলোয়াড়ও।

১৯৩৪ সাল থেকে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া স্পেনের ১৭টি আসরের ইতিহাসে এমন ঘটনা এবারই প্রথম। সোমবার মাদ্রিদে বিশ্বকাপ দল ঘোষণা করেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। দলে জায়গা পেয়েছেন লা লিগা চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনার ৮ ফুটবলার। আছেন আতলেতিকো মাদ্রিদ, অ্যাথলেটিক ক্লাব, রিয়াল সোসিয়েদাদ, সেল্তা ভিগো ও ওসাসুনার প্রতিনিধিরাও। বিদেশি লিগ থেকে আছেন আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার সিটি, ক্রিস্টাল প্যালেস, চেলসি, পিএসজি ও বায়ার লেভারকুসেনের খেলোয়াড়।

রিয়ালের মধ্যে সবচেয়ে কাছাকাছি ছিলেন ২১ বছর বয়সি সেন্টারব্যাক ডিন হুইসেন। এক বছর আগে বোর্নমাউথে থাকাকালীন স্পেনের একাদশে জায়গা পাকা করার মতো পারফরম্যান্স করেছিলেন তিনি। কিন্তু গত গ্রীষ্মে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডে রিয়ালে যোগ দেওয়ার পর ক্লাব পর্যায়ে তার ফর্ম ওঠানামা করেছে। শেষ পর্যন্ত তার বদলে বার্সেলোনার পাউ কুবারসি ও আতলেতিকো মাদ্রিদের মার্ক পুবিলকে বেছে নিয়েছেন দে লা ফুয়েন্তে।

২০২৪ ইউরো জেতা স্পেন দলে রিয়ালের দানি কারভাহাল ছিলেন সহ-অধিনায়ক। কিন্তু ৩৪ বছর বয়সি এই রাইটব্যাক চোট ও ক্লাব পর্যায়ের ফর্মের কারণে জাতীয় দল থেকে অনেকটাই ছিটকে গেছেন। দে লা ফুয়েন্তের ৫৫ সদস্যের প্রাথমিক তালিকাতেও তিনি ছিলেন না। চলতি গ্রীষ্মে চুক্তি শেষ হলে রিয়াল ছাড়ার কথাও রয়েছে তার।

রিয়ালের অন্য সম্ভাবনাগুলোও খুব শক্ত ছিল না। ফ্রান গার্সিয়া ২০২৩ সালের অক্টোবরে দে লা ফুয়েন্তের অধীনে দুটি ম্যাচ খেললেও এরপর আর ডাক পাননি। রাউল আসেনসিও ২০২৫ সালের মার্চে নেশনস লিগের দলে ডাক পেয়েছিলেন, তবে খেলেননি এবং পরে আলোচনার বাইরে চলে যান। গনসালো গার্সিয়া স্পেন অনূর্ধ্ব-২১ দলে ৭ ম্যাচে ৬ গোল করলেও এখনও সিনিয়র পর্যায়ে ওঠেননি। তবে ৪ জুন ইরাকের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচের আগে অনুশীলনে অতিরিক্ত খেলোয়াড় হিসেবে দলের সঙ্গে থাকবেন তিনি।

লেফটব্যাক আলভারো কারেরাসও স্পেনের বয়সভিত্তিক দলে নজর কাড়লেও রিয়ালে প্রথম মৌসুম কঠিন গেছে তার। গত জুলাইয়ে বেনফিকা থেকে ৫০ মিলিয়ন ইউরোতে বার্নাব্যুতে যোগ দেওয়ার পর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি ২৩ বছর বয়সি এই ডিফেন্ডার।

মৌসুমের শুরুতে বার্নাব্যুতে অনেকেই ভাবছিলেন, নতুন কোচ জাবি আলোনসোর অধীনে হুইসেন, কারেরাস ও গনসালো গার্সিয়াদের নিয়ে রিয়ালে স্প্যানিশ তরুণদের নতুন কোর তৈরি হবে। কিন্তু জানুয়ারিতে আলোনসোকে বরখাস্ত করা হয়। তার জায়গায় আলভারো আরবেলোয়া এলেও পরিস্থিতির বড় উন্নতি হয়নি।

রিয়ালের সাম্প্রতিক ব্যর্থ মৌসুমের প্রভাব শুধু স্পেন দলে নয়, অন্য জাতীয় দলেও পড়েছে। ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলের আস্থা জিততে পারেননি। এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গাও ক্লাব পর্যায়ের বাজে মৌসুমের কারণে ফ্রান্স দলে জায়গা হারিয়েছেন। আর্জেন্টিনার তরুণ ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনোর বিশ্বকাপ যাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে রিয়ালের যুব ব্যবস্থা থেকে উঠে আসা ভিক্টর মুনোজ এখন স্পেন দলে। গত গ্রীষ্মে মাত্র ৫ মিলিয়ন ইউরোতে ওসাসুনায় যোগ দেওয়ার আগে রিয়ালের মূল দলে মাত্র ৪৭ মিনিট খেলেছিলেন তিনি। ওসাসুনায় ৩৬ ম্যাচে ৭ গোল ও ৫ অ্যাসিস্ট করে নজর কাড়েন ২২ বছর বয়সি এই উইঙ্গার। মার্চে স্পেনের সিনিয়র দলে অভিষেক ম্যাচেই গোল করেন তিনি। এবার বিশ্বকাপেও যাচ্ছেন।

স্পেনের দল রিয়ালশূন্য হলেও বিশ্বকাপে রিয়াল মাদ্রিদের তারকার অভাব হবে না। ফ্রান্সের হয়ে থাকবেন কিলিয়ান এমবাপে ও অরেলিয়েন চুয়ামেনি, ব্রাজিলের হয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ইংল্যান্ডের হয়ে জুড বেলিংহাম, তুরস্কের হয়ে আরদা গুলার, উরুগুয়ের হয়ে ফেদেরিকো ভালভার্দে। মরক্কোর হয়ে ব্রাহিম দিয়াজেরও বিশ্বকাপে থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

স্পেন দলে এবার বার্সেলোনার ৮ খেলোয়াড়। এর মধ্যে লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা পাউ কুবারসি, গাভি ও লামিন ইয়ামাল যেমন আছেন, তেমনি অন্য ক্লাব থেকে আসা পেদ্রি, জোয়ান গার্সিয়া ও ফেরান তোরেসও আছেন। ২০১০ সালে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের মেরুদণ্ড ছিল পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনা, যেখানে ছিলেন জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, সের্হিও বুসকেতস, জেরার্দ পিকে ও কার্লেস পুয়োল। তবে সেই দলে রিয়ালের অবদানও ছিল বড়, বিশেষ করে ক্যাসিয়াস, রামোস, আলোনসো ও আরবেলোয়ার মাধ্যমে।

দে লা ফুয়েন্তে অবশ্য ক্লাব পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে চান না। দল ঘোষণার পর তিনি বলেছেন, খেলোয়াড় কোন ক্লাব থেকে এসেছে, সেটি তিনি দেখেন না। তার কাছে তারা জাতীয় দলের খেলোয়াড়। সমর্থকের মতো কোনো ক্লাবভিত্তিক পক্ষপাত তার নেই। তার চাওয়া, খেলোয়াড়রা যেন স্পেনের প্রতিনিধিত্ব করতে গর্ববোধ করে।

তবু বিতর্ক থামছে না। রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের চ্যালেঞ্জার এনরিক রিকেলমে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও সামনে এনেছেন। তার দাবি, রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবের উচিত আবার স্পেন দলে গর্ব করার মতো বড় প্রতিনিধি তৈরি করা।

রিয়াল সমর্থকদের জন্য মৌসুমটি এমনিতেই হতাশার। বড় কোনো শিরোপা ছাড়া টানা দুই মৌসুম শেষ করার পর এবার স্পেনের বিশ্বকাপ দলেও নিজেদের ক্লাবের কাউকে না দেখা, বার্নাব্যুর জন্য সেটি আরেকটি অস্বস্তির গল্প হয়ে থাকল।