logo

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ: কখনো উৎসব, কখনো অঘটন

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ: কখনো উৎসব, কখনো অঘটন
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ কখনো শুধু একটি ম্যাচ নয়। এটি এক মাসের বেশি সময়ের আবেগের দরজা খোলার শব্দ। প্রথম বাঁশি বাজতেই পৃথিবী যেন নিজের দৈনন্দিন ক্লান্তি সরিয়ে রেখে আরেক বাস্তবতায় ঢুকে পড়ে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ সব সময় রোমাঞ্চকর হয়নি। কখনো গোলহীন, কখনো একপেশে, কখনো অবিশ্বাস্য অঘটনে ভরা, কখনো আবার এমন এক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে, যা টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার বহু বছর পরও ফুটবল স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।

আজ মেক্সিকো সিটিতে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে আরেকটি বিশ্বকাপের শুরু। এই ম্যাচে আছে বর্তমানের উত্তেজনা, আবার ইতিহাসের ছায়াও। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকো নাম দুটির সঙ্গে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের এক বিখ্যাত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ২০১০ সালে জোহানেসবার্গের সকার সিটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোই ছিল প্রথম প্রতিপক্ষ। সেদিন সিফিওয়ে তশাবালালার বাঁ পায়ের সেই গোল শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই অন্যতম সুন্দর উদ্বোধনী মুহূর্ত হয়ে আছে।

তবে বিশ্বকাপের প্রথম গল্পটা শুরু হয়েছিল আরও অদ্ভুতভাবে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপে আজকের মতো কোনো একক উদ্বোধনী ম্যাচ ছিল না। একই দিনে, একই সময়ে দুটি ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছিল টুর্নামেন্ট। ফ্রান্স খেলেছিল মেক্সিকোর বিপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্র খেলেছিল বেলজিয়ামের বিপক্ষে। তীব্র ঠান্ডা, ছোট মাঠ, আধুনিক বিশ্বকাপের ঝলকানি ছাড়াই জন্ম নিয়েছিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর।

সেদিন ফ্রান্স মেক্সিকোকে ৪-১ গোলে হারায়। সেই ম্যাচেই লুসিয়েন লরাঁ করেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোল। গোলটি তখন শুধু একটি গোল ছিল, ভবিষ্যতের কোনো মহাকাব্যের প্রথম বাক্য বলে কেউ হয়তো ভাবেননি। লরাঁও পরে খুব বেশি কথা বলতেন না নিজের সেই গোল নিয়ে। অথচ প্রায় এক শতাব্দী পর তাঁর নাম উচ্চারিত হয় বিশ্বকাপের শুরুর সঙ্গে।

শুরুর কয়েকটি বিশ্বকাপ ছিল আজকের মতো সংগঠিত, টেলিভিশন-কেন্দ্রিক বা অনুষ্ঠানমুখর নয়। ১৯৩৪ সালে ইতালিতে প্রথম রাউন্ডের আটটি ম্যাচ একই দিনে হয়েছিল। আয়োজক ইতালি যুক্তরাষ্ট্রকে ৭-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের অভিযান শুরু করেছিল। সেই ইতালিই শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়। তখনো উদ্বোধনী ম্যাচ মানে আলাদা করে মঞ্চ, আলো, সংগীত, বৈশ্বিক সম্প্রচার নয়। বিশ্বকাপ তখন গড়ে উঠছে, নিজের রীতি খুঁজছে।

১৯৬৬ সালে এসে বদল আসে। ইংল্যান্ডে প্রথমবারের মতো একটি ম্যাচকে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী ম্যাচের মর্যাদা দেওয়া হয়। ওয়েম্বলিতে মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড ও উরুগুয়ে। প্রত্যাশা ছিল বড়, কারণ স্বাগতিক ইংল্যান্ড, বিশ্বকাপের উদ্বোধন, ইতিহাসের মঞ্চ। কিন্তু মাঠে আসে গোলশূন্য ড্র। সেই ০-০ যেন এক অদ্ভুত ধারার শুরু। ১৯৭০ সালে মেক্সিকো-সোভিয়েত ইউনিয়ন, ১৯৭৪ সালে ব্রাজিল-যুগোস্লাভিয়া, ১৯৭৮ সালে পশ্চিম জার্মানি-পোল্যান্ড—টানা কয়েকটি উদ্বোধনী ম্যাচ গোলহীনতায় আটকে থাকে।

2010 wc
2010 wc

এই গোলশূন্য উদ্বোধনী ম্যাচগুলো ফুটবলের এক আলাদা সত্য দেখায়। প্রথম ম্যাচে অনেক সময় দলগুলো সাহসী নয়, সতর্ক থাকে। পুরো টুর্নামেন্ট সামনে, ভুলের জায়গা কম, চাপ বেশি। উদ্বোধনী ম্যাচ তাই কখনো কখনো উৎসবের মঞ্চ হয়েও কৌশলের কারাগার হয়ে যায়।

১৯৮২ সালে সেই গোলের খরা ভাঙে অঘটনের মাধ্যমে। বার্সেলোনায় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১-০ গোলে জেতে বেলজিয়াম। দলে ছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা, আর্জেন্টিনা ছিল নাম ও মর্যাদায় বড়। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ আবার মনে করিয়ে দেয়, পুরোনো শিরোপা নতুন টুর্নামেন্টে কোনো নিরাপত্তা দেয় না। এরউইন ভানডেনবার্গের গোল শুধু বেলজিয়ামের জয় এনে দেয়নি, উদ্বোধনী ম্যাচের দীর্ঘ গোলখরাও শেষ করেছিল।

চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেয় ক্যামেরুন
চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেয় ক্যামেরুন

এরপর ১৯৯০। মিলানের সান সিরো। আর্জেন্টিনা তখনও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। আবার ম্যারাডোনা। প্রতিপক্ষ ক্যামেরুন। ফুটবল বিশ্ব ধরে নিয়েছিল, এটি হবে আর্জেন্টিনার সহজ শুরু। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি সেদিনই আসে। ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িকের হেডে ক্যামেরুন ১-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনাকে। ম্যাচে ক্যামেরুনের দুই খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেন, তবু জয় ধরে রাখে আফ্রিকান দলটি। উদ্বোধনী ম্যাচ সেই দিন শুধু টুর্নামেন্ট শুরু করেনি, আফ্রিকান ফুটবলের আত্মবিশ্বাসও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিল।

২০০২ সালে সেই গল্পের আরেক সংস্করণ দেখা যায় সিউলে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, দলে জিদান প্রজন্মের গৌরব, ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের তারকা ভরা স্কোয়াড। প্রতিপক্ষ সেনেগাল, প্রথমবার বিশ্বকাপে। অনেকেই ভাবেননি ম্যাচটি কঠিন হবে। কিন্তু পাপা বুবা দিওপের গোলে সেনেগাল জিতে যায় ১-০ ব্যবধানে। ক্যামেরুন ১৯৯০ সালে যা করেছিল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে, সেনেগাল যেন তা-ই করল ফ্রান্সের বিপক্ষে। উদ্বোধনী ম্যাচ আবারও লিখল অঘটনের কবিতা।

২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেও হেরে বসে চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স।
২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেও হেরে বসে চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স।

এই দুই ম্যাচ বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিশেষ জায়গা পায় কারণ তারা একটি ধারণা ভেঙে দেয়। বিশ্বকাপে নামের ওজন আছে, কিন্তু প্রথম ম্যাচে শরীরের গতি, মাথার স্থিরতা এবং মুহূর্তের সাহস অনেক সময় ইতিহাস বদলে দেয়। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মতো চ্যাম্পিয়ন দলও প্রথম দিনের চাপের কাছে ধরা পড়েছে। আবার ক্যামেরুন ও সেনেগালের মতো দল সেই চাপকে সুযোগে বদলে দিয়েছে।

২০০৬ সালে উদ্বোধনী ম্যাচের চরিত্র বদলে যায়। জার্মানি-কোস্টারিকা ম্যাচ ছিল এক গোলউৎসব। মিউনিখে জার্মানি জেতে ৪-২ গোলে। ফিলিপ লামের দূরপাল্লার গোল, মিরোস্লাভ ক্লোসের গোল, পাওলো ওয়ানচোপের জবাব—সব মিলিয়ে সেটি হয়ে ওঠে আধুনিক যুগের সবচেয়ে বিনোদনমূলক উদ্বোধনী ম্যাচগুলোর একটি। অনেক গোল, দ্রুত গতি, স্বাগতিকের উচ্ছ্বাস। ফুটবল বিশ্ব যেন গোলহীন সতর্কতার যুগ থেকে বেরিয়ে আসে।

২০০৬ সালের উদ্বোধনী ম্যাচে হয় ৬ গোল।
২০০৬ সালের উদ্বোধনী ম্যাচে হয় ৬ গোল।

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বিশ্বকাপের শুরু ছিল আবেগের। ভুভুজেলার শব্দ, মহাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ, স্বাগতিক দেশের উন্মাদনা। মেক্সিকোর বিপক্ষে তশাবালালার গোলটি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, প্রতীকের জন্যও বড়। বল জালে যেতেই মনে হয়েছিল, পুরো আফ্রিকা একসঙ্গে চিৎকার করছে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ ১-১ ড্র হলেও সেই গোল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মুহূর্তগুলোর চিরস্থায়ী ছবি হয়ে আছে।

২০১৪ সালে ব্রাজিলের শুরু ছিল জয় দিয়ে, কিন্তু নিখুঁত নয়। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আত্মঘাতী গোলে পিছিয়ে পড়ে ব্রাজিল, পরে নেইমারের জোড়া গোলে ৩-১ জয়। স্বাগতিকের ওপর চাপ কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সেই ম্যাচ তার প্রথম ইঙ্গিত দিয়েছিল। ব্রাজিল জিতেছিল, কিন্তু শান্তি পায়নি। টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, সেই চাপ আরও ভারী হয়েছে।

neymar 2014 wc
neymar 2014 wc

২০১৮ সালে রাশিয়া উদ্বোধনী ম্যাচকে পরিণত করে উৎসবে। সৌদি আরবকে ৫-০ গোলে হারায় স্বাগতিকরা। বড় জয়, বদলি খেলোয়াড়দের গোল, গ্যালারির উল্লাস—সব মিলিয়ে এক নিখুঁত আয়োজনের শুরু। উদ্বোধনী ম্যাচে এত বড় জয় বিরল। সেই ম্যাচ দেখিয়েছিল, স্বাগতিক দল যদি প্রথম দিনই সাহস পায়, পুরো দেশের আবহ বদলে যেতে পারে।

তবে ২০২২ সালে কাতার সেই স্বাগতিক-সুবিধার গল্প উল্টে দেয়। ইকুয়েডরের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায় তারা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার আয়োজক দেশ উদ্বোধনী ম্যাচে হার দেখে। এননার ভ্যালেন্সিয়ার গোল, কাতারের স্নায়ুচাপ, গ্যালারির অস্বস্তি—সব মিলিয়ে উদ্বোধনী ম্যাচ আবার প্রমাণ করে, মঞ্চ যত বড় হয়, আলোও তত নির্মম হয়।

এবার ২০২৬। আবার মেক্সিকো, আবার দক্ষিণ আফ্রিকা, আবার উদ্বোধনী ম্যাচ। তবে প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। এটি ৪৮ দলের প্রথম বিশ্বকাপ। তিন দেশ মিলিয়ে আয়োজন। বাণিজ্য, ভ্রমণ, আবহাওয়া, নিরাপত্তা, রাজনীতি—সবকিছু মিলে এবারের বিশ্বকাপ শুধু মাঠের আসর নয়, বিশাল এক বৈশ্বিক পরীক্ষা। তার প্রথম দৃশ্য আজ মেক্সিকো সিটিতে।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাস তাই একরৈখিক নয়। কখনো ফ্রান্সের প্রথম গোল, কখনো ইংল্যান্ডের গোলশূন্যতা, কখনো বেলজিয়ামের চমক, কখনো ক্যামেরুনের বিদ্রোহ, কখনো সেনেগালের অসম্ভব জয়, কখনো জার্মানির গোলবৃষ্টি, কখনো তশাবালালার বজ্রপাত, কখনো কাতারের নীরব পতন।

প্রথম ম্যাচ টুর্নামেন্টের ভবিষ্যৎ সব সময় বলে দেয় না। ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সালে গোলশূন্য ড্র করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। আর্জেন্টিনা ১৯৯০ সালে ক্যামেরুনের কাছে হেরে ফাইনালে উঠেছিল। আবার ফ্রান্স ২০০২ সালে সেনেগালের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। তাই উদ্বোধনী ম্যাচ ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং সতর্কবার্তা। এটি বলে দেয়, বিশ্বকাপে কোনো স্ক্রিপ্ট স্থায়ী নয়।

আজ যখন প্রথম বাঁশি বাজবে, মাঠে থাকবে ২২ জন ফুটবলার। কিন্তু তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবে ৯৬ বছরের ইতিহাস। লুসিয়েন লরাঁর প্রথম গোল, ওয়েম্বলির নীরবতা, সান সিরোর অঘটন, সিউলের বিস্ময়, জোহানেসবার্গের ভুভুজেলা, মস্কোর গোলবন্যা, দোহার ধাক্কা—সবকিছু যেন অদৃশ্যভাবে মিশে থাকবে সেই মুহূর্তে।

বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই। শুরুটা হয় একটি ম্যাচ দিয়ে, কিন্তু সেই ম্যাচ কখনো কখনো পুরো পৃথিবীর স্মৃতিতে থেকে যায়। আজকের ম্যাচও হয়তো কেবল সূচির প্রথম লাইন হয়ে থাকবে। আবার হয়তো জন্ম দেবে নতুন কোনো তশাবালালা, নতুন কোনো লরাঁ, নতুন কোনো অঘটন।

প্রথম বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কেউ জানে না, ইতিহাস কোন দিকে যাবে।