কাতারের শিক্ষা নিয়ে এবার ভিন্ন প্রস্তুতিতে আর্জেন্টিনা

চার বছর আগে বিশ্বকাপে শেষ হাসি হেসেছিল আর্জেন্টিনাই। কাতারে লিওনেল মেসির হাতে উঠেছিল বিশ্বকাপ ট্রফি। কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনের প্রস্তুতি ছিল মোটেও মসৃণ নয়। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে চোট, ফিটনেস সমস্যা এবং শেষ মুহূর্তের স্কোয়াড পরিবর্তন লিওনেল স্কালোনির পরিকল্পনাকে নড়িয়ে দিয়েছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিয়েছে আর্জেন্টিনা।
২০২৬ বিশ্বকাপের আগে তাই প্রস্তুতির ধরন বদলে দিয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আগের মতো শেষ মুহূর্তে দল জড়ো করে সরাসরি ম্যাচে নামার পথে হাঁটেননি স্কালোনি। বরং এবার আগেভাগে ক্যাম্প শুরু করে খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থা, ফিটনেস ও ম্যাচের প্রস্তুতি কাছ থেকে যাচাই করতে চাইছেন তিনি।
২০২২ বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনা দল একসঙ্গে হয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচের মাত্র দুই দিন আগে। সেই সময়ই স্কালোনি বুঝতে পারেন, দলের কয়েকজন ফুটবলার পুরোপুরি ফিট অবস্থায় নেই। এরপর বিশ্বকাপ শুরুর আগেই স্কোয়াডে পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। সফলতা শেষ পর্যন্ত এসেছিল ঠিকই, কিন্তু প্রস্তুতির সেই অস্থিরতা কোচিং স্টাফকে বড় শিক্ষা দিয়ে যায়।
এবার সেই ঝুঁকি নিতে চাননি স্কালোনি। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হবে ১১ জুন। তার আগে আর্জেন্টিনা প্রস্তুতি শুরু করেছে অনেক বেশি সময় হাতে রেখে। প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচের পাঁচ দিন আগেই দল একসঙ্গে কাজ শুরু করেছে। শনিবার রাত ৯টায় টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাইল ফিল্ডে হন্ডুরাসের বিপক্ষে খেলবে আর্জেন্টিনা। তার আগে কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন সেশন হাতে পাচ্ছেন স্কালোনি।
এই পরিবর্তনের পেছনে উদ্দেশ্য পরিষ্কার। বিশ্বকাপের ঠিক আগে কোচ সাধারণত জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের এত দিন একসঙ্গে পান না। ক্লাব ফুটবলের ব্যস্ত সূচির কারণে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রস্তুতির সময় খুব সীমিত থাকে। তাই কানসাস সিটিতে এক সপ্তাহের মতো সময় পাওয়া স্কালোনির জন্য বড় সুযোগ। এই সময়েই তিনি বুঝে নিতে চান, কার শরীর কতটা প্রস্তুত, কার ওপর কতটা চাপ দেওয়া যাবে, কে ম্যাচের জন্য কতটা তৈরি।
আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক অনুশীলনগুলোও সাধারণ অনুশীলনের মতো নয়। সেশনগুলো দীর্ঘ হচ্ছে, প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত। মাঠের কাজের সঙ্গে জিম সেশনও যুক্ত থাকছে। সাধারণ সময়ে একটি অনুশীলন দুই ঘণ্টার মতো হলেও বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতির ধরন আলাদা। এখানে শুধু বল নিয়ে কাজ নয়, শরীরের অবস্থা, পুনরুদ্ধার, ম্যাচ-লোড এবং সম্ভাব্য চোটের ঝুঁকি সবকিছুই বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
বিশ্বকাপের সময় অনুশীলনের তীব্রতা সাধারণত কম থাকে। কারণ তখন ম্যাচের চাপ, ভ্রমণ, পুনরুদ্ধার এবং ট্যাকটিক্যাল প্রস্তুতি একসঙ্গে সামলাতে হয়। তাই টুর্নামেন্ট শুরুর আগের এই সময়টা স্কালোনির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই তিনি দলকে শারীরিক ও মানসিকভাবে টুর্নামেন্টের জন্য তৈরি করতে চান।
নিকো পাজের চোট নিয়েও আর্জেন্টিনা শিবিরে নজর আছে। বিশ্বকাপের ঠিক আগে কোনো ফুটবলারকে নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সেটি দলীয় পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২২ সালের অভিজ্ঞতার পর আর্জেন্টিনা এবার এমন কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে পড়তে চায় না। তাই প্রতিটি ফুটবলারের ফিটনেস ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
স্কালোনির পরিকল্পনায় এবার সতর্কতা স্পষ্ট। তিনি চান না প্রস্তুতি ম্যাচের আগে বা পরে হঠাৎ করে বুঝতে হোক, কেউ পুরোপুরি প্রস্তুত নন। বরং আগেভাগেই সমস্যা শনাক্ত করে সমাধান খুঁজে নিতে চান। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে টুর্নামেন্টে নামা আর্জেন্টিনার জন্য এই সতর্কতা আরও জরুরি। কারণ এবার শুধু ভালো খেলার চাপ নয়, শিরোপা ধরে রাখার চাপও আছে।
আর্জেন্টিনার প্রস্তুতির এই পরিবর্তনকে তাই অস্বাভাবিক বলা হলেও এর ভেতরে আছে বাস্তবতা। ২০২২ সালের সাফল্য তাদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু সেই প্রস্তুতির বিশৃঙ্খলা তাদের সাবধানও করেছে। কাতারে শেষ পর্যন্ত ট্রফি জিতেছিল আর্জেন্টিনা, তবে স্কালোনি জানেন, প্রতিবার ভাগ্য একইভাবে পাশে থাকবে না
.png)


