logo

বিশ্বকাপের মাঝপথে কোচ বদলের যত ঘটনা

বিশ্বকাপের মাঝপথে কোচ বদলের যত ঘটনা
তিউনিসিয়ার সাবেক কোচ সাবরি লামুশি। ছবি: সংগৃহীত

সুইডেনের কাছে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর তিউনিসিয়া কোচ সাবরি লামুশিকে সরিয়ে দিয়েছে। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব পেয়েছেন হার্ভে রেনার। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এক ম্যাচের পরই কোচ বদল বিরল ঘটনা। তবে একেবারে নতুন নয়।

বিশ্বকাপে হার অনেক দলই দেখে। বড় হারও অচেনা নয়। কিন্তু প্রথম ম্যাচের পরই কোচের চাকরি চলে যাওয়া আলাদা ঘটনা। কারণ বিশ্বকাপের আগে মাসের পর মাস পরিকল্পনা, দল বাছাই, প্রস্তুতি, কৌশল, প্রতিপক্ষ বিশ্লেষণ—সবকিছুই সাধারণত প্রধান কোচকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়। সেই কোচকেই টুর্নামেন্টের মাঝপথে সরিয়ে দেওয়া মানে শুধু একজন মানুষের বিদায় নয়, পুরো পরিকল্পনার ওপর অনাস্থা প্রকাশ।

তিউনিসিয়ার ক্ষেত্রে সেটিই ঘটল। গ্রুপ ‘এফ’-এ নিজেদের প্রথম ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি তারা। রক্ষণ ছিল অগোছালো, মাঝমাঠ চাপ সামলাতে পারেনি, আক্রমণও ছিল বিচ্ছিন্ন। সুইডেনের গতিময় ফুটবলের সামনে উত্তর আফ্রিকার দলটি বারবার ভুল করেছে। ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে ৫-১। বিশ্বকাপের শুরুতেই এমন হার তিউনিসিয়ার ড্রেসিংরুমে বড় ধাক্কা হয়ে আসে।

সেই ধাক্কার জেরেই লামুশির বিদায়। জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া সাবেক ফ্রান্স মিডফিল্ডারের জন্য সময়টা খুব বেশি ছিল না। তবে তাঁর অধীনে সাম্প্রতিক ফলও আশাব্যঞ্জক ছিল না। বিশ্বকাপের আগে বেলজিয়ামের কাছে ৫-০ হারও সতর্কবার্তা দিয়েছিল। সুইডেনের বিপক্ষে ৫-১ হারের পর তিউনিসিয়া ফুটবল ফেডারেশন আর অপেক্ষা করেনি।

নতুন কোচ হার্ভে রেনার ফুটবল বিশ্বে পরিচিত নাম। আফ্রিকান ফুটবলে তাঁর সাফল্য বড়। জাম্বিয়া ও আইভরি কোস্টকে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জিতিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপেও তাঁর স্মরণীয় অধ্যায় আছে। ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কোচ হিসেবে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিলেন রেনার। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই তিউনিসিয়া এখন ক্ষত মেরামতের চেষ্টা করছে।

তবে রেনারের কাজ সহজ নয়। সামনে জাপান ও নেদারল্যান্ডস। এক ম্যাচেই গোল ব্যবধানে বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। ৪৮ দলের নতুন বিশ্বকাপে সেরা তৃতীয় দলগুলোরও নকআউটে ওঠার সুযোগ আছে বলে তিউনিসিয়ার আশা শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু আশা টিকিয়ে রাখতে হলে রেনারকে খুব দ্রুত দলকে মানসিকভাবে ফেরাতে হবে। রক্ষণে শৃঙ্খলা আনতে হবে, খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে হবে, আর সবচেয়ে বড় কথা, সুইডেন ম্যাচের ভয়াবহতা যেন পরের ম্যাচেও না টানে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

তিউনিসিয়ার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপ ইতিহাসের কিছু অস্বস্তিকর অধ্যায়ও ফিরিয়ে এনেছে। বিশ্বকাপের মাঝপথে কোচ বদল খুব বেশি দেখা যায় না। কিন্তু যখন ঘটে, তখন তা সাধারণত বড় ব্যর্থতা, ড্রেসিংরুম সংকট বা ফুটবল প্রশাসনের তীব্র চাপের ফল।

এই তালিকায় তিউনিসিয়া আগেও ছিল। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সে ইংল্যান্ড ও কলম্বিয়ার কাছে হারের পর হেনরিক ক্যাসপারচাককে সরিয়ে দেয় তারা। শেষ ম্যাচে দায়িত্ব নেন আলি সেলমি। তাঁর অধীনে তিউনিসিয়া রোমানিয়ার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে। তবে তাতে বিদায় ঠেকেনি। প্রায় তিন দশক পর আবার বিশ্বকাপের মাঝপথে একই পথে হাঁটল তিউনিসিয়া।

১৯৯৮ বিশ্বকাপেই আরেক বড় ঘটনা ঘটেছিল সৌদি আরব শিবিরে। দুই ম্যাচের পর তারা বরখাস্ত করে কার্লোস আলবার্তো পেরেইরাকে। নামটা শুধু একজন কোচের নাম নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই বড় নাম। ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন পেরেইরা। অথচ চার বছর পর সৌদি আরবের দায়িত্বে থেকে টুর্নামেন্টের মাঝপথেই চাকরি হারান তিনি। বিশ্বকাপের মঞ্চ কত দ্রুত একজন সফল কোচকেও বিপরীত প্রান্তে ঠেলে দিতে পারে, পেরেইরার ঘটনা তার বড় উদাহরণ।

সেই একই আসরে দক্ষিণ কোরিয়াও কোচ বদলের পথে হাঁটে। নেদারল্যান্ডসের কাছে ৫-০ গোলে হারের পর চা বুম-কুনকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়ান ফুটবলের কিংবদন্তি হয়েও বিশ্বকাপের ব্যর্থতা তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি। ঘরের সমর্থন, অতীত মর্যাদা, ব্যক্তিগত কীর্তি—সবই তখন ফলের কাছে হার মেনেছিল।

আরও পেছনে গেলে ১৯৫৪ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের ঘটনাও আছে। অস্ট্রিয়ার কাছে বড় হারের পর ম্যানেজার অ্যান্ডি বিটি পদত্যাগ করেন। সেটি সরাসরি বরখাস্ত ছিল না, কিন্তু বিশ্বকাপের মাঝপথে কোচের বিদায়ের তালিকায় ঘটনাটি আলাদা গুরুত্ব পায়। কারণ বিশ্বকাপের মতো আসরে প্রথম ম্যাচের পরই নেতৃত্ব বদলে যাওয়া তখনও বিরল ছিল।

সব ঘটনা অবশ্য সরাসরি বরখাস্ত নয়। ২০১০ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কোচ রেমোঁ দোমেনেক টুর্নামেন্ট চলাকালে চাকরি হারাননি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার আসরে ফরাসি দলে খেলোয়াড় বিদ্রোহ দেখা দেয়। ড্রেসিংরুমের ভাঙন এতটাই প্রকাশ্যে চলে আসে যে শেষ ম্যাচে দোমেনেক কার্যত কর্তৃত্ব হারানো এক কোচে পরিণত হন। তিনি টাচলাইনে ছিলেন, কিন্তু দল তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল কি না, সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছিল।

২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের ঘটনা আবার ভিন্ন ধরনের। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র দুই দিন আগে হুলেন লোপেতেগিকে বরখাস্ত করে স্পেন। কারণ জানা যায়, বিশ্বকাপের পর রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে তিনি আলোচনা সেরে ফেলেছেন। এটি টুর্নামেন্ট চলার সময় নয়, তবে বিশ্বকাপের ঠিক মুখে কোচ বদলের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। স্পেন শেষ পর্যন্ত সেই অস্থিরতার মূল্যও দেয়।

বিশ্বকাপের বাইরে বড় টুর্নামেন্টে মাঝপথে কোচ বদলের সবচেয়ে নাটকীয় সাম্প্রতিক উদাহরণ আইভরি কোস্ট। ২০২৩ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস, যা ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে নিজেদের মাঠে প্রথম রাউন্ডে বিপর্যয়ের পর জঁ-লুই গাসেকে সরিয়ে দেয় তারা। সহকারী কোচ এমের্স ফায়ে দায়িত্ব নেন। আশ্চর্যজনকভাবে সেই আইভরি কোস্টই পরে ঘুরে দাঁড়িয়ে শিরোপা জেতে। ফুটবলের রূপকথা বলা হলে এই গল্প সামনে আসবেই।

তবে তিউনিসিয়ার সামনে সেই রূপকথার পথ অনেক কঠিন। রেনার অভিজ্ঞ, আফ্রিকান ফুটবল বোঝেন, বিশ্বকাপের চাপও চেনেন। কিন্তু সময় তাঁর পক্ষে নেই। টুর্নামেন্টের মাঝপথে নতুন কোচ সাধারণত নতুন কৌশল শেখানোর সুযোগ পান না। তিনি মূলত ক্ষত সারান, মনস্তত্ত্ব সামলান, ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাস জোড়া লাগান।

লামুশির বিদায় তাই শুধু একজন কোচের চাকরি হারানোর খবর নয়। এটি বিশ্বকাপের নির্মমতারও গল্প। এখানে প্রস্তুতির দীর্ঘ মাস, অতীত সাফল্য বা কোচের পরিচিতি কখনো কখনো এক রাতেই মুছে যায়। স্কোরলাইন বড় হলে চাপও বড় হয়। আর ফুটবল প্রশাসন যখন মনে করে পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাচ্ছে, তখন সিদ্ধান্ত আসে দ্রুত, কখনো খুব দ্রুত।