বাবার উদ্দেশে দীর্ঘ বার্তায় যা লিখলেন মেসি

বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর প্রথমবার প্রকাশ্যে নিজের অনুভূতি জানিয়েছেন লিওনেল মেসি। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া দীর্ঘ এক বার্তায় বাবাকে হারানোর যন্ত্রণা, বিশ্বকাপ চলাকালে তার অসুস্থতা এবং নিজের ফুটবল ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ের কথা তুলে ধরেছেন আর্জেন্টাইন তারকা।
মেসি এখনই অবসরের সিদ্ধান্ত জানাননি। তবে বাবা পাশে না থাকায় আর কত দিন ফুটবল চালিয়ে যেতে পারবেন, সেটি নিয়ে তার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মেসির আবেগঘন বক্তব্যটির বাংলা রূপ এশিয়া পোস্টের পাঠকদের জন্য নিচে তুলে ধরা হলো:
‘বাবা, তুমি আর নেই, এটি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। বরং বলতে হয়, আমি বিশ্বাস করতে চাইছি না। তোমাকে আর কখনো দেখতে পাব না, তোমার সঙ্গে আর কথা হবে না, এটি কল্পনা করাও আমার জন্য ভীষণ কঠিন।
আমি জানি তুমি অনেক কষ্ট পাচ্ছিলে এবং হয়তো এভাবেই তোমার জন্য ভালো হয়েছে। কিন্তু তুমি অনেক আগেই চলে গেলে। আমাদের একসঙ্গে উপভোগ করার মতো আরও কত কিছু বাকি ছিল।
তুমি আমাকে কতবার বলেছিলে, যেন শেষ বিশ্বকাপটিতে খেলি। অথচ টুর্নামেন্ট শুরুর কয়েক দিন আগেই তোমার শারীরিক অবস্থার সবচেয়ে বেশি অবনতি হলো। কোনো বড় প্রতিযোগিতায় এবারই প্রথম তুমি আমার পাশে থাকতে পারনি।
মা আমাকে বলেছিল, তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে এবং পরে ভ্রমণ করতে পারবে। আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমরা ফাইনালে উঠব, যাতে তুমি সেখানে আসতে পারো।
প্রতিটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আমি তোমার বার্তার অপেক্ষা করতাম। বার্তাগুলো না পেয়ে তোমাকে আরও বেশি মনে পড়ত। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, পরিস্থিতি সত্যিই কতটা খারাপ।
এরপরও আমি যতটা সম্ভব এগিয়ে যাওয়ার কথাই ভাবছিলাম। চেয়েছিলাম তোমাকে আরও কিছুটা সময় দিতে, যাতে সুস্থ হয়ে অন্তত আমাদের একটি ম্যাচ দেখতে আসতে পারো।
আমরা ফাইনালে উঠেছিলাম, কিন্তু তুমি সেখানে থাকতে পারনি। আমি বিশ্বকাপটি জিততে চেয়েছিলাম, যেন ট্রফিটি তোমার কাছে নিয়ে গিয়ে আরেকবার দেখাতে পারি। কিন্তু পারিনি। আমার পা আর চলছিল না।
এবার আমি নিজের শরীরের বিরুদ্ধে গিয়েও চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারিনি। পুরো প্রতিযোগিতায় কখনোই নিজেকে পুরোপুরি ভালো মনে হয়নি।
বিশ্বকাপ শেষে যখন তোমার কাছে ফিরলাম, তুমি ভেবেছিলে আমরা ফাইনালটি টাইব্রেকারে হেরেছি। টুর্নামেন্টে কী হয়েছিল, সেসব নিয়ে আমাদের আর কথা বলা হয়নি। তুমি কিছুই উপভোগ করতে পারনি।
শেষ পর্যন্ত আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি। তবে প্রতিটি ম্যাচ আমরা কতটা উপভোগ করেছি, সেটি তুমি জানো না। আরও একবার তুমি ঠিকই বলেছিলে, আমার সেখানে থাকা এবং বিশ্বকাপে খেলা উচিত ছিল।
আমি এসব বলছি, কারণ শুধু এই বিষয়টি নিয়েই তোমার সঙ্গে আর কথা বলা হয়নি। বাকি সবকিছু তো তুমি আগেই জানতে। আমরা প্রতিদিন কথা বলতাম। আমার ব্যস্ততার ফাঁকে যখনই সম্ভব হতো, তোমার সঙ্গে দেখা করতাম।
তোমাকে ছাড়া এখন আমি কী করব, সেটি জানি না। জানি না কীভাবে সামনে এগিয়ে যাব। আমি তো শুধু ফুটবলই খেলেছি। কিন্তু এখন আর কত দিন সেটি চালিয়ে যাব, তা নিয়েও আমার মনে অনেক সংশয় তৈরি হয়েছে।
শুরু থেকেই তুমি আমার পাশে ছিলে। আমরা একসঙ্গে পথের শেষ প্রান্তের এতটা কাছে চলে এসেছিলাম। আর কিছুটা সময় কেন থাকতে পারলে না, যাতে আমরা একসঙ্গেই এই পথটা শেষ করতে পারতাম?
আমি জানি, নিজের পরিবারকে ভালো থাকতে দেখাই তোমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিত। তোমার স্ত্রী ও সন্তানদের সুখী দেখার পাশাপাশি তুমি চুপচাপ সবচেয়ে বেশি উপভোগ করতে আমার খেলা দেখা।
ছোটবেলা থেকেই এমনটি হয়ে এসেছে। কাজ শেষে বাড়ি ফিরেই তুমি আমাকে প্রতিটি অনুশীলনে নিয়ে যেতে। অবশ্য তুমি কাজে ব্যস্ত থাকায় মা-ও আমাকে অনেক দিন অনুশীলনে নিয়ে গেছে।
তবে আমার কোনো ম্যাচই তুমি বাদ দিতে না। আমাকে খেলতে দেখে তুমি কতটা দুশ্চিন্তা করতে, আবার কতটা আনন্দ পেতে। যদিও ভালো খেললেও খুব বেশি প্রশংসা কখনো করতে না।
তুমি ছিলে আমার বাবা, আমার বন্ধু এবং আমার প্রতিনিধি। প্রতিটি পরিস্থিতিতে ঠিক যে মানুষটি হওয়া প্রয়োজন ছিল, তুমি সেটিই হতে। কোনো কিছু নিয়ে তুমি কখনো ভুল বলতে না।
আমাদের মধ্যে কখনো অভিযোগ, তর্ক কিংবা মতবিরোধ হয়েছে। তারপরও শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, তুমিই ঠিক ছিলে। সবকিছু শেষ পর্যন্ত ঠিক সেভাবেই ঘটেছে, যেভাবে তুমি বলেছিলে।
তোমাকে ভীষণ মনে পড়বে। তবে তুমি সব সময় আমাদের মধ্যে থাকবে। বিশেষ করে আমি যেভাবে নিজের সন্তানদের বড় করছি, তার মধ্যেও তুমি থাকবে। কারণ তুমি ও মা আমাকে যেভাবে মানুষ করেছ, আমিও আমার সন্তানদের সেভাবেই শিক্ষা দিচ্ছি।
শান্তিতে ঘুমাও, বাবা। এখানে যেভাবে আমাদের আগলে রেখেছিলে, ওপর থেকেও সেভাবেই রেখো। সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।
আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবা।’
.png)


