ফুটবলারের মৃত্যুর ঘটনায় গোলকিপারের বিচার হবে কি?

মাঠের একটি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন এক ফুটবলার। সেই ঘটনায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেছেন প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক। মৃত্যুর পর শুরু হয়েছে পুলিশের তদন্তও। স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ফুটবলার জেসুস দে মিগুয়েলের মৃত্যুকে ঘিরে এবার বড় প্রশ্ন উঠেছে, বিচারের মুখোমুখি হতে হবে কি না এফসি আন্দোরার গোলরক্ষক জেসুস ওওনোকে।
স্প্যানিশ আইনে অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার সুযোগ থাকলেও সান্তা ক্রুস দে টেনেরিফের প্রধান কৌঁসুলি মনে করছেন, ফৌজদারি বিচার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে ফুটবলের শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১২ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারেন এই গোলরক্ষক।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) স্পেনের জাতীয় পুলিশ মিগুয়েলের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সম্ভাব্য অবহেলাজনিত হত্যার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে তদন্ত শুরু হওয়া মানেই যে ওওনোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে, এমন নয়।
গত সোমবার (২ নভেম্বর) স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ম্যাচে টেনেরিফের মুখোমুখি হয়েছিল এফসি আন্দোরা। টেনেরিফের হেলিওদোরো রদ্রিগেজ লোপেজ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচের যোগ করা সময়ে মাঝমাঠের কাছে বল দখলের লড়াইয়ে গোলরক্ষক ওওনোর হাঁটুর আঘাত লাগে মিগুয়েলের বুকে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ৩০ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
মাঠেই হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয় তাকে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলেও মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে টেনেরিফে। ওই সংঘর্ষের জন্য ওওনোকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন রেফারি। ম্যাচটিও ২-২ গোলে সমতায় থাকা অবস্থায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর স্পেনের জাতীয় পুলিশের হোমিসাইড বিভাগ তদন্ত শুরু করে। বিষয়টি আদালতের তত্ত্বাবধানেও নেওয়া হয়েছে। তবে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উচ্চ আদালত জানিয়েছে, দুর্ঘটনাসহ স্বাভাবিক নয় এমন যেকোনো মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিচারিক তদন্ত শুরু করা নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ।
ফলে পুলিশের তদন্তকে এখনই ওওনোর অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এমনকি মিগুয়েলের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণও প্রাথমিক প্রতিবেদনের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
স্প্যানিশ বার্তা সংস্থা ইএফইকে সান্তা ক্রুস দে টেনেরিফের প্রধান কৌঁসুলি হোসে লুইস সানচেজ-হাউরেগি জানিয়েছেন, এই ঘটনায় ফৌজদারি মামলা শুরু হওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে। কারণ সংঘর্ষটি ঘটেছে ম্যাচ চলাকালে, বল দখলের লড়াইয়ের মধ্যে।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘদিনের বিচারিক নীতিতে খেলাধুলার স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সংঘটিত আঘাতকে সাধারণত ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তবে খেলা বন্ধ থাকা অবস্থায় কোনো ফুটবলার অন্যজনকে ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণ করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
সেই কারণে ওওনোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, রেফারির ম্যাচ রিপোর্টে সংঘর্ষের বর্ণনা কীভাবে দেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। এরপর স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ওওনোর চ্যালেঞ্জটি কতটা বিপজ্জনক ছিল এবং প্রতিপক্ষকে আঘাত করার উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি ফুটবলের স্বাভাবিক ঝুঁকির বাইরে গিয়ে তিনি অপরাধমূলক অবহেলা করেছেন কি না, সেটিও বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে ফৌজদারি বিচারের সম্ভাবনা কম হলেও ক্রীড়াক্ষেত্রে শাস্তির ঝুঁকি রয়েছে ওওনোর। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের (আরএফইএফ) শৃঙ্খলাবিধির ১০২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, খেলার মধ্যে সহিংস আচরণের ফলে প্রতিপক্ষ গুরুতর আঘাত পেলে চার থেকে ১২ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেফারি মানুয়েল আনহেল পেরেস এরনান্দেস তাঁর ম্যাচ রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন, বল দখলের লড়াইয়ের সময় পা উঁচু করে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে আঘাত করেছেন ওওনো।
এই বিবরণের ভিত্তিতে শৃঙ্খলা কমিটি ১০২ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১২ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ওই অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে কি না কিংবা কত ম্যাচের শাস্তি দেওয়া হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এদিকে স্পেনের দণ্ডবিধির ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে অবহেলাজনিত হত্যার বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে। গুরুতর অবহেলার কারণে কারও মৃত্যু হলে এক থেকে চার বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার অবহেলার কারণে মৃত্যু হলে তিন থেকে ১৮ মাসের হিসাব অনুযায়ী আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে।
তবে এই দুই ধরনের অপরাধের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। গুরুতর অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ডের প্রশ্ন আসতে পারে। অন্যদিকে কম মাত্রার অবহেলার ক্ষেত্রে আইনে কারাদণ্ডের পরিবর্তে আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
মিগুয়েলের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র সমালোচনা ও আক্রমণের মুখে পড়েছেন ওওনো। ঘটনার পর নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করেছেন ইকুয়েটোরিয়াল গিনির এই আন্তর্জাতিক গোলরক্ষক।
তার সঙ্গে নামের মিল থাকায় স্পেনের আরেক ফুটবলার মিচেল ওওনোকেও ভুলবশত বর্ণবাদী আক্রমণ ও হুমকির শিকার হতে হয়েছে। স্পেনের নিম্ন বিভাগের ক্লাব এফসি কান ভিদালেতের এই ডিফেন্ডার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু পদবি এক হওয়ায় তাকে আক্রমণ করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে দুই ক্লাবই। টেনেরিফের ফুটবলারদের পাশাপাশি শোক জানিয়েছেন লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তারকারাও। মিগুয়েলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্পেনের একাধিক ম্যাচ স্থগিত করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার ম্যাচগুলোতে নীরবতা পালনের ঘোষণাও দিয়েছে উয়েফা।


